মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস : ২৫ মার্চ কালরাতের ভয়াবহতা থেকে, শিক্ষা নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে

19

মোহা. মোস্তাক হোসেন

স্বাধীনতার স্বাদ পেতে বাংলাদেশের জনগণকে দিতে হয়েছে অনেক আত্মত্যাগ। এই দিনে শোষকগোষ্ঠীরা বাঙালিদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে ছিল। এতে বঙ্গজননীকে হারাতে হয়েছে ত্রিশ লাখ সন্তান। যার কষ্টের দাগ মুছে যায়নি। সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আটকিয়ে রেখে বাংলার সংস্কৃতিকে নষ্টের অপচেষ্টায় লিপ্ত পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি ও তাদের দোসররা। ধর্মীয় মোড়কের প্যাঁচে ফেলে বাঙালি ও বাংলাকে শোষণ করে চলেছিল ছাব্বিশ বছর। বাংলার উদ্যোমী দামাল সন্তানরা বুঝে ওঠার সাথে সাথেই শোষকশ্রেণি কাল ছোবল মারে এই বাংলায়। আর বাঙালি জাতিকে সহ্য করতে হয়েছে অবর্ণনীয় নির্যাতন।
বাংলাদেশের ওপর ঘটে যাওয়া কলঙ্কজনক ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালার কারণ হলো সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করলে তাদের সকল কর্তৃত্ব হারিয়ে যাবে। এই ধারণা থেকে তাদের মনে উদিত চিন্তা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে পাকিস্তানের ভার দিতে নারাজ ছিল। কারণ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৭টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। যার ফলে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠন করতে পারবে। ছয় দফার মাধ্যমে শাসনতন্ত্র গঠনের বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায় পাকিস্তানের সামরিক সরকার ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভীত হয়ে পড়ে। এতে করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার চক্রান্ত করতে থাকল (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, পৃষ্ঠা ৪-৫)।
উনিশশো একাত্তরের মার্চ মাস ছিল উত্তাল ঘটনাবহুল মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা, পল্টনে ছাত্রলীগের জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা…’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, জয়দেবপুরে বাঙালি সেনাদের বিদ্রোহ, পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন না করা ইত্যাদি ঘটনা নিয়েই গোটা মাসজুড়ে উত্তাল ছিল। একে তো সত্তরের নির্বাচনে বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়, তার ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিব্রত অবস্থা। এ অবস্থায় পাকিস্তানি সামরিক সরকার তাদের ক্ষমতা গণতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দের কাছে না দেয়ার জন্য বাঙালি জাতি চাপ দিয়ে দমিয়ে রাখার ফন্দি আটতে থাকল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে হুঁশিয়ারি করে দিয়েছিল দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা না করতে।
২৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের নিরস্ত্র করাসহ সকল বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তান ছাড়ার ঘোষণা, তাদের এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনার অংশ। তাদের ভাবনায় আসে বাঙালিদের আকস্মিক হামলা করলেই ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আন্দোলন বা দাবি-দাওয়া করতে পারবে না বা করবে না। সেই উদ্দেশ্যে ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর সামরিক অভিযান চালায়। এই অভিযানের প্রথম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহর। তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে বিদ্রোহী দমনের অজুহাত দেখিয়ে গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ করে ঢাকায় সেইদিন ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সাত হাজার মানুষকে হত্যা করে। তারা এই কলঙ্কিত সামরিক অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। পক্ষান্তরে বাঙালিদের অন্তরে বেদনাভরা ২৫ মার্চ মধ্যরাতটিকে বাংলাদেশীরা ‘কালরাত’ নামে স্মরণ করে (স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, মুনতাসীর মামুন-মো. মাহবুবুর রহমান, পৃষ্ঠা ২১২)।
অপারেশন সার্চলাইট নামে বাঙালিদের ওপর যে এক জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে তার কোনো সাক্ষী না রাখার জন্য সকল বিদেশী সাংবাদিকের দেশ ছাড়তে বলেছিল। কিন্তু দুঃসাহসিক সাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থেকে গিয়েছিলেন। ঢাকা শহরে লুকিয়ে থেকে এই ভয়াবহ জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের ছবি তুলেন। পরবর্তীতে ওয়াশিংটন পোস্টে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে সারা বিশ্ব জানতে পারে ইয়াহিয়া খানের গণহত্যার খবর।
সেই রাতের ভয়াবহতা পুঁজি করে সত্তরের পাকিস্তানি জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত বাঙালি প্রতিনিধিরা একটি সরকার গঠন করে। বাঙালির রক্তঝরা ভয়াল দুর্দশা দূরীকরণের প্রত্যয় নিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে মেহেরপুরের মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে নয় মাস যুদ্ধ করে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশিত ২৫ মার্চের কালরাতের জবাব দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।
স্বাধীনতা দিবসে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা ২৫ মার্চের সেই ভয়াল কালরাতে বাঙালির করুণ আর্তনাদের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সুখী ও সমৃদ্ধি দেশ গঠনে আত্মপ্রত্যয়ী হবে।

মোহা. মোস্তাক হোসেন : শিক্ষক, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ