আসুন সমানভাবে চিন্তা করি

30

শেফালী খাতুন

চলছে পুষ্পারতির ফুলের পরম মত্ত। যে ঋতু স্বপ্নরাজ্যে নিয়ে চলে যায় প্রত্যেকটা পথিককে অন্তিম রূপ ও লাবণ্যে। সকাল ও সন্ধ্যা জানান দেয়, আমি শীত চলে যাচ্ছি তোমাদের ছেড়ে আর লেপ মুড়ি দিও না। মৃদু-মন্দ দখিনা বাতাসের জাদু স্পর্শে বর্ণ-বিরল পৃথিবীর সর্বাঙ্গে লাগে অপূর্ব পুলক-প্রবাহ বন- বীথির রিক্ত শাখায় জেগে উঠছে কচি কচি কিশলয়ের অফুরন্ত উল্লাস। শুকনো পাতার মরমর ধ্বনি শেষে পথে আর পথিককে সেটা মাড়িয়ে যেতে হয় না, দূর বনান্তর থেকে ভেসে আসে কুহুতান, যা পৃথিবীকে বা গোটা বিশ্বকে রঙিন করে দেয় এক অপরূপ মায়া নিকেতন। শিমুল ও কাঞ্চনজঙ্ঘা গাছের দিকে তাকালে মনে তার প্রতিটা শাখা-প্রশাখা কি যেন হারিয়ে ফেলেছে আর নতুন সম্ভাবনা কোষগুলো বলে, কেঁদ না আমরা আছি তোমার সাথে। আজ আমরা এমন এক বছরে পা রেখেছি, যা হয়ত আর পাবো কিনা জানি না ‘মুজিববর্ষ’। আজ জাতির জনককে হত্যা করলেও হত্যা করতে পারেনি তার আদর্শ, মূল্যবোধ, ভালোবাসা, চিন্তা ও চেতনাকে। আজ গোটা বিশ্বের কাছে একটি প্রিয় নাম বাংলাদেশ, যা শেখ মুজিবুর রহমান।
আমার হাতের পানসে চলছে ‘মার্চ’কে নিয়ে। আমরা স্বাধীন বাংলার মানুষ, আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। বাঁচাতে চাই- এটাই আমাদের প্রতিটি মানুষের মনপ্রাণে ইচ্ছা। স্বাধীনতা পেয়েছি অনেক পূর্বে, তারপর কোথায় যেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গুহাবাসী মানুষ যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সকল বাধার প্রাচীর ভেঙে এ বিশ্বকে এত সুন্দর করে তুলেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশ-জাতি তথা একটি সুখী সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে নারী সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে প্রায় আটশ কোটি মানুষের অর্ধেক নারী সুতরাং এ সমাজ ও সভ্যতাকে উন্নয়নের জন্য নারীর কর্মক্ষেত্র আবির্ভূত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। কেউ কোনো দিন কাউকে অধিকার হোক আর কাজের জায়গায় হোক হাতে তুলে দেয় না। এটা আমাদেরকে অর্জন করে নিতে হবে। আর এজন্য অনেক খড়কুঁটো পোড়াতে হয় সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য। আমাদের সমাজে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে, নারী মানে তাকে ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া; কিন্তু এটা কেন? কেন নারীরা বৃহৎ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পাবে না? আমরাকে তথা নারী সমাজকে মূল ধারায় আনতে হবে। অনেক কাজে নারীদের বড় দায়িত্ব দেয়া যাবে না, এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারী কী শুধু গৃহিণী, না এই বিশ্বের প্রতিটি নারী এক একটা গবেষক। নারী চাকরি করে, ঝাড় দেয়, থালাবাসন মাজে, রান্না করে, বাটনা বাঁটে, বাচ্চা ও সংসার দেখভাল করে। আবার বাসায় মুরুব্বি থাকলে তাদের টেককেয়ার করে। তবে কেন নারীকে এখনো করুণা-অবহেলা করে অনেকেই ভ্রু কুঁচকায়!
আমরা মানুষ আমাদের পরিচয় হোক মানুষ হিসেবে। অপর পক্ষ যদি নিজেকে মানুষ হিসেবে দাবি করে তবে কেন পারি না বা কেন পারব না। তাই সবার উচিত নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবা ও সম্মান করা। সমাজে কিছু মানুষ নারীদের মিথ্যে স্বপ্নের জাল বুনতে শেখায়- তুমি মেয়ে তোমাকে গুনে গুনে ধাপ ফেলতে হবে। একটা মিথ্যে কল্পনার ধাঁধায় পরিণত করে তার জীবনের সমস্ত ডালপালাগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বলতে চাই, ভাবতে চাই, ভাবাতে চাই তা হয়ে উঠুক অগ্নিশিখার ন্যায়। জন্ম থেকে একটা বড় শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়- তুমি মেয়ে মানুষ, এভাবে চলতে, বলতে নেই, শুনতে নেই ও শোনাতে নেই। শুধু নেই নেই নেই। কারো আঘাতে হাজার হাজার ¯œায়ু ছিঁড়ে গেলেও রা কাড়তে নেই। আমাদের সমাজে প্রত্যেকে অর্থবিত্ত আর সুন্দরের পূজারি। সৌন্দর্য কোথায় থাকে, মেধা কী, বিনয়ী কী, আধুনিকীকরণ কী সেটা তো আমরা আর দেখি না। দেখি বাহ্যিক রূপ ও লাবণ্য। বাইরের কাচ দেখেই নির্ণয় করে নিই।
একজন সফল ও আত্মনির্ভরশীল মানুষই সুন্দর ও অর্থশালী একজন পরিচ্ছন্ন চিন্তার মানুষই আধুনিক মানুষ। নারী নিজেই কেবল শক্তি নয়, পুরুষের শক্তি ও প্রেরণার উৎসও বটে। সেকেলে থেকে আজ অবধি সন্তান, বন্ধু ও পরিবারকে জীবন সংগ্রাম করে সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করতে সহযোগিতা করছে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত পুরুষকে সেবা ও আশ্বাসের ছোঁয়ায় সঞ্জীবনী শক্তি এনে দিয়েছে। ব্যর্থতায় দিয়েছে পুনর্বার সংগ্রাম করার আত্মশক্তি। নারীর প্রেরণা ব্যতীত পুরুষের পক্ষে কোনো কিছু সম্ভব হতো না। তাই তো বিদ্রোহী কবি বলেছেন, “কোন এককালে হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি / প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।”
সমাজ, শহর, নগর, বিভাগ, দেশের উন্নতি সাধনে নারী শিক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমাদের নারী শিক্ষা প্রসারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি।
* সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি নারীর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ।
* শিক্ষা গ্রহণে নারীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার যে উপবৃত্তি চালু করেছে তা যেন যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়, সেজন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
* সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্কুল-কলেজ ও খেলাধুলার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ।
* কর্মক্ষেত্রে নারী মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ। সকল কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশাধিকার অবারিত করা। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা।
* উচ্চতর ডিগ্রি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। সামাজিক কুসংস্কার, আর্থিক দরিদ্রতা, অশিক্ষা কুশিক্ষা ইত্যাদির অন্তরায় কাটিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নারী শিক্ষাকে আরো জোরদার করা।
* পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করা।
* বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কাজে প্রাথমিক লেভেল থেকে উৎসাহিত করা।
পরিশেষে বলা যায় যে, পৃথিবীর যেহেতু অর্ধেক সংখ্যক নারী তাই এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে মুক্তি আলোকিত পথ, উজ্জ্বল সম্ভাবনা দিতে পারে। মেধাবী জাতি গঠন করতে পারে একমাত্র নারী সমাজ। সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ আবশ্যক। একটা জীবন হাত রেখে এগিয়ে যাবার জন্য সমান মানসিকতা, সমান চিন্তা-ভাবনা এবং সমান অংশগ্রহণই পারে পরিবার ও বিশ্বকে এগিয়ে নিতে একমাত্র নারী সমাজ।

শেফালী খাতুন : শিক্ষক, বালিয়াডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ