আট পেরিয়ে নয়ে রেডিও মহানন্দা

19

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একমাত্র কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম’ এখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক রেডিও স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদন পায়। রেডিও মহানন্দা জেলার উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পরিচালিত স্থানীয় সম্প্রচার ব্যবস্থা, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গণমানুষের কল্যাণে সর্বদা নিবেদিত।
২০১১ সালের ২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৪৩ মিনিটে রেডিও মহানন্দা তার প্রথম সম্প্রচার শুরু করে। প্রথম সম্প্রচারের ব্যাপ্তিকাল ছিল মাত্রা ২৭ মিনিট। এরপর ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর রেডিও মহানন্দা তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্প্রচারের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়। এভাবেই দীর্ঘ ৮ বছর পেরিয়ে আজ ৯ বছরে পদার্পণ করল রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম।
রেডিও মহানন্দা কথা বলে মাটি ও প্রাণের মানুষের। এর মূল লক্ষ্য হলো গণমাধ্যমে স্থানীয় মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে তথ্য বিনিময়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শিক্ষা ও উন্নয়নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করা। রেডিও মহানন্দা তার সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একদিকে সাধারণ জনগণকে যেমন বিনোদন দিচ্ছে, অন্যদিকে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। কৃষক থেকে শুরু করে গৃহিণীদের জন্য রয়েছে বিনোদনমূলক ও শিক্ষণীয় অনুষ্ঠান।
রেডিও মহানন্দার সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘কৃষি ও জীবন’, স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘স্বাস্থ্য কথা’, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘জাগো সবাই’, শিশুদের অংশগ্রহণ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘চাঁদের হাসি’, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম পরিচিতিমূলক আয়োজন ‘হাঁরঘে গেরাম’, মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘স্বপ্নের ঠিকানায়’, স্কুল ও কলেজভিত্তিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘আমাদের ক্যাম্পাস’, সাঁওতাল আদিবাসীদের সংস্কৃতি নিয়ে অনুষ্ঠান ‘বাহা-সান্দীস’, গম্ভীরা গানের অনুষ্ঠান ‘গামছা মাথল’, নারীদের স্বাবলম্বিতা বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘আপন শক্তি’, শ্রোতাদের অংশগ্রহণমূলক অনুষ্ঠান ‘ইচ্ছে দুয়ার’, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘প্রযুক্তি ডট কম’, ইসলামী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘আলোর সন্ধানে’, বিভিন্ন অজানা তথ্য নিয়ে অনুষ্ঠান ‘জানা অজানা’, স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে গানের অনুষ্ঠান ‘ক্যাফে মহানন্দা’, বিশিষ্ট বরেণ্য ব্যক্তিদের জীবনগাঁথা নিয়ে সাজানো অনুষ্ঠান ‘মনীষীদের কথা’, দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে আসা অতিথিদের নিয়ে অনুষ্ঠান ‘কাছে থেকো বন্ধু’, ইংরেজি শেখার অনুষ্ঠান ‘আমার ইংরেজি ক্লাব’, খেলাধুলা বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘মহানন্দা স্পোর্টস’, চরমপন্থা উগ্রপন্থা প্রতিরোধে সমাজে শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখতে অনুষ্ঠান ‘শান্তির দূত’। এছাড়াও স্থানীয় ও দৈনন্দিন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ’।
শুরুতে রেডিও মহানন্দার পথচলা এখনকার মতো মসৃণ ছিল না। এই পর্যন্ত আসতে প্রতিষ্ঠানটিকে মুখোমুখি হতে হয়েছে চ্যালেঞ্জের। তারপরও সব ধরনের প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে আগামীর দিকে। বর্তমানে প্রতিদিন এফএম তরঙ্গে ১০ ঘণ্টা আর অনলাইনে ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো বেশি সময় ধরে এফএম তরঙ্গে সম্প্রচার বা সরাসরি/লাইভ সম্প্রচার সম্ভাবনার ইঙ্গিত সংশ্লিষ্টদের।
রেডিও মহানন্দার সম্প্রচারিত বেশ কিছু অনুষ্ঠান এরই মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে। যেমন বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘জাগো সবাই’। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ ‘১০৯২১’ নম্বরটি জানতে পেরেছে এবং এই নম্বরে ফোন করে এর প্রতিরোধ করতে সক্ষম হচ্ছে। মানবপাচার বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘স্বপ্নের ঠিকানায়’। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী জেলা। এই ধরনের ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং মানবপাচার নিয়ে কাজ করে এ রকম সংস্থার সাথে কথা বলা ও এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার বিষয়গুলো অনুষ্ঠানে আলোচনা করা হয়। এর মাধ্যমে শ্রোতারা কিভাবে পাসপোর্ট করতে হয়, বিদেশে যাবার আগে কি কি করণীয়, কি কৌশলে নারী-শিশু পাচার করা হয় এসব বিষয় জানতে পারে।
জেলার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মকা- নানা-নাতির গম্ভীরা গান। একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিল। রেডিও মহানন্দা হারিয়ে যাওয়া সেই সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে এবং এর দ্বারা জনগণকে বিনোদনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জই নয়, দেশের বাইরেও এই গম্ভীরা গানের বেশ কদর রয়েছে। গম্ভীরা গান অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘লগড়্যা পাঁচফোড়ন’, ‘গামছা মাথল’, ‘মেয়েলী গীত’ অনুষ্ঠানগুলো অনেক বেশ জনপ্রিয়।
এখনো অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় সংবাদপত্র পৌঁছে না। রেডিও মহানন্দার খবরভিত্তিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে সেসব এলাকায়। এতে উঠে আসে স্থানীয় ও দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া সব খবর। প্রতিদিন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট, রাত ৯টা ৩০ মিনিট এবং রাত ১১টা ৩০ মিনিটে সম্প্রচার হয়ে থাকে ‘আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ’। শ্রোতারা সর্বশেষ ঘটে যাওয়া খবর জানতে পারে এর মাধ্যমে। শ্রোতারাও নিজেরাই ফোন দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক বা খেলাধুলার খবর দিয়ে থাকে, যা সম্প্রচার করে থাকে রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম।
গণমাধ্যম সমাজ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। এতে ফুটে ওঠে আমাদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়। যেমন- কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী-অধিকার, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য, জনসচেতনতা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সব ধরনের বিষয়। শহর থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার দ্বার খুলে দিয়েছে রেডিও মহানন্দা। যেখানে ছেলেদের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন বয়সী নারীরা (এ বিষয়ক লেখা পড়–ন ৩য় পৃষ্ঠায়)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলা যথা- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট এবং রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী ও তানোর, নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার আংশিক এলাকাসহ ৮টি উপজেলার ৪২টি ইউনিয়নের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বর্তমানে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক উন্নয়ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার, তথ্য ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান এবং পাবলিক সার্ভিস অ্যানাউন্সমেন্টের মাধ্যমে রেডিও মহানন্দা তথ্য ও বিনোদনের সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
রেডিও মহানন্দার ঝুলিতে এরই মধ্যে অর্জন হয়েছে অনেক পুরস্কারও। এর মধ্যে রয়েছে জেন্ডার ভায়োলেন্স এবং চাইল্ড প্রোটেকশন-২০১৩তে তৃতীয়, মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০১৪তে ১৮ বছরের উপরে রেডিওর সৃজনশীল অনুষ্ঠান ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয়, উপজেলা ডিজিটাল মেলা-২০১৫তে তৃতীয়, সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘন ও মানবাধিকার রক্ষা-২০১৬তে তৃতীয়, মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০১৭তে রেডিও ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে ১৮ বছরের উপরে দ্বিতীয় এবং কমিউনিটি রেডিও তথ্য অধিকার অ্যাওয়ার্ড-২০১৭তে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভাগে ৩য় স্থানের পুরস্কার অর্জন করে রেডিও মহানন্দা।
জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিওটি কিছু নিয়োগকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্বেচ্ছাসেবক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও প্রয়াসের নির্বাহী কমিটি রেডিও মহানন্দা সরাসরি পরিচালনা করলেও সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক রেডিও মহানন্দার উন্নয়ন, স্থায়ীত্ব ও গতিশীলতা নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি হচ্ছেন পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার। কমিটির সদস্যরা একান্তই স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব নিয়ে তাদের মূল্যবান অবদান রাখছেন।
“জীবনের কথা জীবনের সুর” নিয়ে ৮ বছর আগে রেডিও মহানন্দা হাঁটি হাঁটি পা পা করে শুরু করেছিল পথচলা। এই পথচলা হয়তোবা থেমে যেত, যদি না রেডিও মহানন্দার প্রাণপ্রিয় শ্রোতাবন্ধুরা থাকত। শ্রোতাবন্ধুরা সবসময় রেডিও মহানন্দার পাশে থেকেছে হাতে হাত রেখে। স্থান দিয়েছে তাদের মনের মণিকোঠায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কমিউনিটির মানুষের আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম, যার আলোয় বদলেছে অনেকের জীবন; খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার প্রাণ। জয় হোক রেডিও মহানন্দার, ৯ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দৈনিক গৌড় বাংলার এটাই প্রত্যাশা।