বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে : সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তার ভারত সফরের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার এবং ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে যোগদান এবং ভারত সফর শেষে দুটি সফরের কার্যক্রম এবং ফলাফল নিয়ে বুধবার গণভবনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক যান। নিউইয়র্ক থেকে ফেরার একদিন পরই তিনি সরকারি সফরে ভারত গিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘে এবারের অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানসম্মত শিক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এছাড়া, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট তথা এসডিজি ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমি নতুন করে ৪ দফা প্রস্তাব পেশ করেছি। এছাড়া গত ২৩ সেপ্টেম্বর আমি স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘হাই লেভেল প্ল্যানারি অন ইউনিভারসেল হেলথ কভারেজ’ সভার একটি প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করি। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অসামান্য সাফল্য বিশেষ করে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করি। একই দিন আমি ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট শীর্ষক একটি সভায় অংশগ্রহণ করি। এতে আমি জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর আমি গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের আয়োজনে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশগ্রহণ করি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যা এবং করণীয় নিয়ে এই সভায় আলোচনা হয়। তিনি আরো বলেন, এ দিন বাংলাদেশ এবং ওআইসির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস : এ ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের একটি সাইড ইভেন্টেও আমি অংশগ্রহণ করি। এ সভায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবং ওআইসি’র মহাসচিব বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওইদিন সন্ধ্যায় আমি মহাত্মা গান্ধীর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদ্্যাপনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘লিডারশিপ মেটার্স- রিলিভেন্স অব মহাত্মা গান্ধী ইন দ্য কনটেম্পরারি ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে মূল আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করি। তিনি বলেন, গত ২৫ সেপ্টেম্বর আমি ‘লিডারস ডায়লগ ফোর অন লোকালাইজিং দ্য এসডিজি’স’ শীর্ষক সভায় অংশগ্রহণ করি। এই সভায় আমি এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের অঙ্গীকার, চলমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসমূহ তুলে ধরি। একই দিনে আমি কাউন্সিল অন ফরেন রিলিশন্স-সিএফআর’র সদস্যগণের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বক্তব্যে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে অভাবনীয় উন্নয়নের বর্ণনা প্রদানের পাশাপাশি, শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবদান, ডিজিটাল বাংলাদেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন এবং রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করি। এছাড়া, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তিনি জানান, গত ২৬ সেপ্টেম্বর আমি ইউএস চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সূচনা ফাউন্ডেশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় ‘মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ডিজিবিলিটিজ’ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট আয়োজন করে। এই সভায় সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরি। ইভেন্টের দ্বিতীয় পর্বে সূচনা ফাউন্ডেশনের সভাপতি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম বিষয়ক উপদেষ্টা সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের সঞ্চালনায় বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এবারের অধিবেশনকালে বিশ্ব সম্প্রদায় আমাকে দুটি আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত করে। এগুলো হলো- গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (জিএভিআই) প্রবর্তিত ‘ভ্যাকসিন হিরো’ এবং ইউনিসেফের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য স্কিল ডেভেলেপমেন্ট ফর দ্যা ইয়ুথ’ সম্মাননা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এবারের অধিবেশন চলাকালে তিনি বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। তিনি জানান, অধিবেশন চলাকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে একই টেবিলে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেল। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত অভ্যর্থনায়ও অংশগ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছরের মতো এ বছরও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি সংবর্ধনা সভায় যোগ দেন। শেখ হাসিনা জানান, গত ২৫ সেপ্টেম্বর ওয়াল স্টিট জার্নাল, ২৭ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা সার্ভিস তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। এছাড়া, ওইদিন নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে এক সংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন।
ভারত সফর সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) আয়োজনে ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে অংশগ্রহণ করতে তিনি গত ৩ থেকে ৬ অক্টোবর নয়াদিল্লি সফর করেন। তিনি বলেন, গত ৫ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে হায়দরাবাদ হাউজে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত সুরক্ষা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, আন্তঃযোগাযোগ, জনযোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়। এসময় তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের পূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে জানান যে, সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি এ সমস্যার দ্রুত সমাধানে আগ্রহী। বৈঠকে আমি মুহুরি নদীর সীমান্ত নির্ধারণের বিষয়ে প্রস্তাব করলে তিনি জানান যে, এ সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তার সরকার সচেষ্ট। রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনের বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনিষ্পন্ন সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তির অনুরোধ জানালে তিনি এ সমস্যা নিরসনে তার আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের এক রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার ব্যাপারে তার সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আসামের এনআরসির প্রসঙ্গে তিনি জানান, এর আইনগত প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ। সুষ্ঠুভাবে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এনআরসি নিয়ে এখনো কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হয়নি এবং ভবিষ্যতেও এ নিয়ে কোনো ধরনের কিছু ঘটতে দেয়া হবে না। যারা এ তালিকা হতে বাদ পড়েছেন তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। শেখ হাসিনা বলেন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি যৌথভাবে বাংলাদেশে তিনটি প্রকল্পর উদ্বোধন করেন। এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং তার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় এবং বিনিময় করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি আগামী বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্্যাপন উৎসবে যোগদানের জন্য বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করি। তিনি বলেন, একই দিন সন্ধ্যায় ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে আমি সৌজন্য সাক্ষাৎ করি। পুনরায় নির্বাচিত হওয়ায় তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান। ভারতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতিকে আমি বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাই। শেখ হাসিনা বলেন, এর আগে সকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তিনি জানান যে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান সকল অনিষ্পন্ন বিষয়সমূহ সমাধানের জন্য একান্ত আগ্রহী। বৈঠককালে চেন্নাইয়ে বাংলাদেশের নতুন মিশন খোলার বিষয়ে ভারত সরকারের সম্মতি আছে বলে জয়শঙ্কর আমাকে জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এছাড়া, ঢাকা-চেন্নাই, ঢাকা-মুম্বাই রুটে নতুন বিমান চলাচলের বিষয়ে আমি প্রস্তাব দিয়েছি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সফরকালে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি আঞ্চলিক এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য আমাকে ‘ঠাকুর পিস অ্যাওয়ার্ড-২০১৮’ প্রদান করে।
শেখ হাসিনা বলেন, গত ৬ অক্টোবর ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে আমার আলোচনা হয়। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ভারতীয় কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, এর আগে গত ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় আমি যোগদান করি। এ সংবর্ধনা সভায় বাংলাদেশে সমবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতগণ উপস্থিত ছিলেন। খবর বাসস।