টানা বর্ষণে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ৩ হাজার ঘর

36

টানা পাঁচদিনের বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়ার কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় তিনহাজার রোহিঙ্গা তাদের আশ্রয়স্থল হারিয়েছে। মারা গেছে শিশুসহ দুই জন রোহিঙ্গা। এছাড়াও প্রায় সাড়ে তিন হাজার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এক ইমেইল বার্তায় জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম। ক্যাম্প জুড়ে কর্মরত আইওএম’র কর্মকর্তা এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরেজমিনে গিয়ে এ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করেন বলে বার্তায় জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প জুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আবাসস্থলগুলো মেরামত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জরুরি আশ্রয়স্থলে নিতে কাজ করে যাচ্ছে আইওএম। আইওএম’র মুখপাত্র জর্জ ম্যাকলয়েড বলেছেন, বর্ষাকালের মাত্র অর্ধেক সময় পার হয়েছে। এরইমধ্যে গত ৭২ ঘণ্টায় আমরা দুই হাজার মানুষকে সহায়তা করেছি। আমাদের সব সদস্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক পরিমাণ ইতোমধ্যেই ২০১৮ সালের ক্ষয়ক্ষতির থেকেও বেশি হয়েছে। ৩-৫ জুলাই, এই তিনদিনে সবচেয়ে বড় কুতুপালং মেঘা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫১০ মিলিমিটার। আরেকটি বড় ক্যাম্প- ‘ক্যাম্প ১৬’তে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫৩০ মিলিমিটার। আইওএম’র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কর্মকর্তা তারেক মাহমুদ প্রেরিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাঁচদিনের ভারি বর্ষণ এবং ঝড়ো হাওয়ায় উখিয়া-টেকনাফে ভূমিধসে ১ হাজার ১৮৬ টি, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২১৬টি এবং ঝড়ো হাওয়ায় ১ হাজার ৮৪০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ১৫ হাজার ৫৩৪ জন রোহিঙ্গা। এছাড়াও ক্যাম্পগুলোতে ৩৯১টি ভূমি ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে ৫১ বার।
পাঁচদিনে ৩ জনের মৃত্যু: কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরের ২৫ হাজার পরিবারের প্রায় দেড়লাখ রোহিঙ্গা দিন কাটাচ্ছেন পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকি আতংকে। গত পাঁচদিনে মৃত্যু হয়েছে শিশুসহ তিনজনের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজারের বেশি বসতঘর। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এর হিসাব মতে, পাঁচদিনের ভারী বর্ষণ এবং ঝড়ো হাওয়ায় উখিয়া-টেকনাফে ভূমিধসে এক হাজার ১৮৬টি, বন্যায় ২১৬টি এবং ঝড়ো হাওয়ায় এক হাজার ৮৪০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ১৫ হাজার ৫৩৪ জন রোহিঙ্গা। এছাড়াও ক্যাম্পগুলোতে ৩৯১টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে এবং ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে ৫১ বার। ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক পরিমাণ এরইমধ্যে ২০১৮ সালের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়িয়েছে। গত ৩ থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ে ৫১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কুতুপালং মেঘা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। আরেকটি বড় ক্যাম্প, ‘ক্যাম্প ১৬’তে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫৩০ মিলিমিটার।

পাঁচদিনের এই প্রবল বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়ার কারণে প্রায় তিনহাজার রোহিঙ্গা তাদের আশ্রয়স্থল হারিয়েছেন। উখিয়া থানা পুলিশ জানায়, ভূমিধসে নিহতরা হলেন কুতুপালং ২ নম্বর ক্যাম্পের ব্লক ডি এর মৃত আবু বক্করের স্ত্রী মোস্তফা খাতুন (৫০), উখিয়া হাকিমপাড়া ক্যাম্পের মোহাম্মদ হামিম (৮) ও মধুরছড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইব্রাহীম (৭)। তিনজনের মৃত্যু ছাড়াও বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন আরো অন্তত ২০ জন। এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সেক্রেটারি ছৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রায় সবগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পই পাহাড়ি এলাকায়। আর বেশিরভাগ বাড়ি-ঘর করা হয়েছে পাহাড় কেটে। যে কারণে বৃষ্টি শুরু হলেই রোহিঙ্গারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শরণার্থী শিবিরে ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, গত বর্ষায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসরতদের মধ্যে থেকে আমরা এরইমধ্যে ১৫ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছি। আরো প্রায় সাড়ে চার হাজার পরিবার আছে রাস্তাঘাটে চলাচল সমস্যা এবং পাহাড়ধসের অতিমাত্রায় ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের তালিকা তৈরি এবং অন্যত্র সরানোর পরিকল্পনা চলছে। তিনি বলেন, যেহেতু রোহিঙ্গা বসতিগুলো পাহাড়ি এলাকায়, তাই ভারী বর্ষণ হলেই সেখানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। যে কারণে কিছুটা ঝুঁকি থাকেই। এ ধরনের সমস্যা থেকে শতভাগ উত্তরণ আসলেই সম্ভব নয়। তবে এই বর্ষায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সর্বশেষ গত এক সপ্তাহে তিনজনের মৃত্যুসহ রোহিঙ্গারা এখানে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে পাহাড়ধস, মাটিচাপা, গাছ পড়ে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে প্রাণহানি না ঘটে সেজন্য কাজ করছে পুলিশ।
সীমাহীন দুর্ভোগ: উখিয়ার কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের প্রধান মাঝি মো. আবদুর রহিম বলেন, আমার আওতাধীন ৩ হাজার ২০০ পরিবার আছে। টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসে ১০টি ঘর সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। আরো অন্তত একশ’ পরিবার আছে পাহাড়ধস এবং বন্যার ঝুঁকিতে। তারা এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। বাকি সব বাড়িঘরের ত্রিপলের ছাউনি নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই পানিতে ঘর ভিজে যায়। যে কারণে সবাই কম বেশি দুর্ভোগে আছেন। একই ক্যাম্পের সি ব্লকের মাহমুদুল হাসান বলেন, গত রোববার বৃষ্টির সময় পাহাড়ধসে আমার ঘর সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছি। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বলেন, তবলেন, মধুরছড়া, জামতলী, লম্বাশিয়া, বালুখালী, থাইনখালী, হাকিমপাড়া, ময়নারঘোনাসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শুরু থেকে এই পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার ঝুঁপড়ি ঘর তৈরি করা হয়েছে। এসবের মধ্যে ১৭ নম্বর ক্যাম্পের প্রায় সাতশ’ ঘর আছে ছনের ছাউনির। বৃষ্টিতে এগুলোর সবকটির ছাউনি নষ্ট হয়ে গেছে। আর বাকিসব ঘরের তিনভাগের দুইভাগ ঘরের ত্রিপলের ছাউনী নষ্ট হয়ে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন এর বাসিন্দারা।