মৌলভীবাজারে ট্রেন লাইনচ্যূত হয়ে নিহত ৪

সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় পড়ে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন শতাধিক আরোহী। গত রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল এলাকায় এ দুর্ঘটনার পর থেকে সারা দেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। শ্রীমঙ্গলের স্টেশন মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম জানান, আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস রাত ১০টায় সিলেট ছেড়ে এসে মাইজগাঁও স্টেশনে থামে। এরপর ভাটেরা ও বরমচাল স্টেশন পার হয়ে মোটামুটি ২০০ মিটার যাওয়ার পর পাঁচটি বগি লাইন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি বগি বড়ছড়ার কালভার্ট ভেঙে নিচে ছড়ায় পড়ে যায়। আর দুটি বগি উল্টে পড়ে লাইনের পাশের ক্ষেতের মধ্যে। দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার কাজ শুরু করে। ট্রেন থেকে তারা চারজনের লাশ উদ্ধার করেন বলে ফায়ার সার্ভিসের সিলেট বিভাগীয় উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান। কুলাউড়া থানার ওসি ইয়ারদৌস হাসান জানান, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী এবং একজন পুরুষ। তাদের মরদেহ কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। আহতদের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। নিহত চারজনের স্বজনরা এসে তাদের পরিচয় শনাক্ত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সোমবার দুপুরে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক নিহতের পরিচয় শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নিহতরা হলেন -কুলাউড়ার কাদিপুর ইউনিয়নের গুপ্ত গ্রামের বাসিন্দা আবদুল বারীর স্ত্রী মনোয়ারা পারভীন (৪৫), সিলেটের মোগলা বাহার থানার আবদুল্লাহপুর গ্রামের আবদুল বারীর মেয়ে ফাহমিদা ইয়াসমিন ওরফে ইভা (২০), বাগেরহাটের মোল্লারহাট উপজেলার আকরাম মোল্লার মেয়ে সানজিদা আক্তার (২০) ও হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার নুর হোসেনের ছেলে কাওসার হোসেন (২৬)। এদিকে দুপুরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোজাম্মেল হক বলেন, ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ জানতে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (পূর্বাঞ্চল) মো. মিজানুর রহমানকে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিকে আগামি তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। রেল সচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, অতিরিক্ত সচিব মুজিবুর রহমান, রেলের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম, রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল জলিলসহ পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে প্রধান প্রকৌশলী আবদুল জলিল গণমাধ্যমকে বলেন, দুপুর ১২টার দিকে আখাউড়া থেকে রিলিফ ট্রেন এসে কাজ শুরু করেছে। সেতুর সংস্কারকাজ আর বগি উদ্ধারের কাজ শেষ হতে বিকেল হয়ে যাবে। তারপরই হয়তো সিলেটের পথে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করা যাবে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি গত রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে উপজেলার বরমচাল স্টেশন থেকে ২০০ মিটার দূরে ইসলামাবাদ এলাকায় পৌঁছালে পেছন দিকের বগিতে বিকট শব্দ হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে সামনে বড়ছড়া ব্রিজ ভেঙে একটি বগি পড়ে যায়। আরো তিনটি বগি ব্রিজের পাশে উল্টে দুমড়েমুচড়ে যায়।

এ ছাড়া অন্য দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, একে তো সেতুটি অনেক আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তার ওপরে ট্রেনটির গতিও ছিল বেশ। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরাইলের শাহবাজপুরে বেইলি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় ঢাকা-সিলেট সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ রয়েছে। এ কারণে গত রোববার রাতে ট্রেনে যাত্রীসংখ্যা অন্য সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। অন্য সময় ট্রেনটি ১৫টি বগি নিয়ে যাতায়াত করলেও গত রোববার ট্রেনটিতে ১৭টি বগি ছিল। উদ্ধারকাজে আসা রেললাইনের পাশের গ্রাম নন্দনগরের বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৪৫) বলেন, ব্রিজের সাইডে পাত দুইডা লাগানো থাকে, জোড়ার মধ্যে। এর এদিকে একটি নাট, ওদিকে আরেকটি নাট। আর কোনো নাট নাই। গাড়ি যখন যায়, তখন খালি কাঁপে, ঝিলকা মারে। প্রায় সময়ই আমরা রেলের মানুষকে বলছি। এখানে একটা সমস্যা ঘটবে। আপনারা দয়া করে দেখেন, সমস্যাটা কী। এখনো আছে। এখান থেকেই সমস্যাটার শুরু হইছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরাইলের শাহবাজপুরে বেইলি ব্রিজ স্থাপনের কাজ চলায় ঢাকা-সিলেট বাস চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে ট্রেনের উপর চাপ ছিল বেশি। উপবনের ১৭টি বগির সবগুলোই ছিল যাত্রীতে ঠাসা।

আহত এক যাত্রী কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বলেন, যে বগিটি খালে পড়ে গেছে, তিনি এবং তার বাবা ও ভাই ওই বগিতেই ছিলেন। বরমচাল পার হয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর ট্রেন বেশি দুলতে শুরু করে। এরপর কালভার্টে ওঠার পর তাদের বগি একপাশে কাত হয়ে খালে পড়ে যায়। রেলওয়ের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. নুরুল ইসলাম জানান, ট্রেনের যে সাতটি বগি সামনে লাইনের ওপর ছিল, সেগুলোকে রাত সোয়া ৩টার দিকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উদ্ধারকারী একটি ট্রেন এসে সকালে আরও পাঁচটি বগি উদ্ধার করে কুলাউড়া স্টেশনে পাঠিয়ে দেয়। বাকি বগিগুলো খালে বা লাইনের পাশে পড়ে গেছে, দুমড়ে মুচড়ে গেছে। অনেকটা জায়গায় রেললাইন বেঁকে গেছে। বগিগুলো উদ্ধার করে লাইন মেরামত করতে সময় লাগবে। শ্রীমঙ্গলের স্টেশন মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম এবং শমসের নগরের স্টেশন মাস্টার কবির হোসেন জানান, উপবন দুর্ঘটনায় পড়ার পর কালনী এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, সুরমা মেইল, পারাবত এক্সপ্রেস পথে আটকা পড়ে। লাইন কখন চালু হবে সেই নিশ্চয়তা না থাকায় যাত্রীদের অনেকেই নেমে বিকল্পভাবে যাওয়ার চেষ্টা করেন।