ঈদের আগে ব্যস্ত সময় পার করছেন টাঙ্গাইলের তাঁতিরা

ঈদসহ যে কোনো উৎসবেই বাঙালি নারীদের প্রথম পছন্দই হলো শাড়ি। তাই চাহিদা মেটাতে শাড়ি তৈরিতে ঈদের এই সময়ে দিনরাত তাঁতের মাকুর খটখট শব্দ শোনা যাচ্ছে টাঙ্গাইলের গ্রামগুলোতে। প্রায় বাড়ির উঠোনজুড়ে রোদে রঙিন সুতা শুকানোর দৃশ্য। জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত থাকায় এখানে ঘরে ঘরে তৈরি হয় তাঁতের শাড়ি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলা সদরের করটিয়া, বাজিতপুর, এনায়েতপুর, পোড়াবাড়ী, চাড়াবাড়ী, বেলতা, দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডি, নলশোধা, কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, রায়পুর, কোকডহড়া, কাজিবাড়ী, খুসিলা, মোমিনগর, উত্তর ছাতিহাটি, দক্ষিণ ছাতিহাটি, পশ্চিম ছাতিহাটি, সিঙ্গাইর, দত্তগ্রাম, টেঙ্গগুরা, গোহালিয়াবাড়ী, নাগবাড়ী, বীরবাসিন্দা ও সহদেবপুরের সাত হাজারেরও বেশি তাঁতি শাড়ি উৎপাদন করেন। কাপড় ব্যবসায়ীরা এসব গ্রাম থেকেই শাড়ি কিনেন। পরে তা পাথরাইল হাট, করটিয়া হাট, বাজিতপুর হাট, বাবুরহাট এবং বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব রেলস্টেশন সংলগ্ন জুগারচর হাটে পাইকারি মূল্যে বিক্রি করেন।
কোকডহরা গ্রামে সরেজমিন দেখা যায়, এখানকার প্রায় ১০০ পরিবার তাঁতের সঙ্গে জড়িত। প্রতিটি বাড়ির লোকজন ঈদ সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের চাহিদা মেটাতে এখন ব্যস্তসময় কাটাচ্ছে। এখানে শাড়ি বোনেন পুরুষরা, চরকায় সুতা কেটে সহায়তা করেন নারীরা। শাড়ি বোনার তাঁত কয়েক রকমের রয়েছে। তার মধ্যে চিত্তরঞ্জন, পিটলুম, অটোমেটিক, সেমি অটোমেটিক তাঁত উল্লেখযোগ্য। এসব তাঁতে তৈরি হয় নানা রঙ ও ডিজাইনের নানা নামের শাড়ি।
কোকডহরা গ্রামের বাবা সুজত আলীর হাত ধরে ২০ বছর আগে তাঁতের বুনন শুরু করেন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, বিশেষ ধরনের বুননের সঙ্গে তাঁতের শাড়ি যারা পরেন, তাদের শিল্পবোধ ও প্রয়োজনের সম্মিলন জড়িত। এসব এলাকার অধিকাংশ পরিবারের জীবন-জীবিকা চলে তাঁতের শাড়ি বুনে। ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি চলে বুনন কাজ। খুব অল্প লাভে, এমনকি অনেক সময় মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা লাভেই আড়তদারদের কাছে শাড়ি বিক্রি করেন তারা। সাইফুল জানান, তার তত্ত্বাবধানে ১১ জন কারিগর কাজ করেন। একজন কারিগর দিনে ছয়টি শাড়ি বুনেন। সপ্তাহে ২ হাজার ৫০০টি শাড়ি উৎপাদন হয়। ডিজাইন অনুযায়ী প্রতি পিস শাড়ির দাম ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকা।
বিভিন্ন নকশা ও ডিজাইনের জন্য টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির কদর রয়েছে। এছাড়া দেশের বাইরেও চাহিদা রয়েছে। শাড়ির পাশাপাশি এখানে তৈরি হচ্ছে থ্রি পিস, ওড়না ও পাঞ্জাবির কাপড়। সুতার গুণগতমান ও ডিজাইন ভেদে বিভিন্ন দামের শাড়ি তৈরি হয় টাঙ্গাইলে। তাই দূরদুরান্ত থেকে আসছেন ব্যবসায়ী এবং ক্রেতারা। সর্বনি ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ লাখ টাকা দামের তাঁত শাড়ি তৈরি হয় পাথরাইলের তাঁত পল্লীতে। সুতি জামদানি, হাফসিল্ক, অঙ্কুর কাতান, সুতি পিওর বালুচাড়ি, হাসিখুশি কাতান তৈরি হচ্ছে।
আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের চাহিদার বিষয় বিবেচনা করে ডিজাইনারা শাড়িতে এনেছেন নতুনত্ব ও নানা বৈচিত্র্য। বল্লা বাজারের ফারুক ট্রেডার্সের মালিক ফারুক হোসেন বলেন, রোজার মাস তিনেক আগে থেকেই শুরু হয় ঈদ বাজারের প্রস্তুতি। নতুন নতুন নকশা তৈরি করে শাড়ি বুনন শুরু হয়। শাড়ি কিনতে রোজা শুরুর ১০-১৫ দিন আগে থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীদের আসা শুরু হয়েছে। চলে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। আর খুচরা ক্রেতাদের আসা শুরু হয়েছে ১৫ রোজার পর থেকেই। এখানকার শাড়ি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি দামেও কম। এটিই এ হাটের বিশেষ আকর্ষণ। তিনি জানান, এখানে ৩৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় ভালো শাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া পাওয়া যায় মোটা সুতার জাকাতের শাড়ি। এ শাড়িগুলো যে বিশেষ ধরনের তাঁতে তৈরি হয়, তার নাম চিত্তরঞ্জন তাঁত। চিত্তরঞ্জন তাঁতকে সেমিঅটোমেটিক তাঁতও বলা হয়। সপ্তাহের প্রতি শনিবার সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত চলে বল্লার এ ঐতিহ্যবাহী হাট।
তাঁত বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁতের (হ্যান্ডলুম) সংখ্যা ৪১ হাজার ৭১টি। আর পাওয়ার লুম প্রায় ১০ হাজার। এখানে প্রতি মাসে বস্ত্র উৎপাদন হয় প্রায় ৭২ লাখ গজ। প্রতি মাসে বিক্রি হচ্ছে অন্তত ২৭ কোটি টাকা। সুতা এবং রঙ আমদানি হচ্ছে প্রায় ২৫ কোটি টাকার।
তাঁতের শাড়ি ঘিরে টাঙ্গাইলের তাঁতপ্রধান তিন উপজেলায় রঙ এবং সুতার ব্যবসাও জমে উঠেছে বহু বছর ধরে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির ৯০ ভাগই উৎপাদন হয় বল্লা, রামপুরসহ আশপাশের গ্রামে। বল্লা বাজার সুতা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি আবু আইয়ুব জানান, বল্লা বাজারে প্রায় ৫০টি সুতার দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সরাসরি এখানকার তাঁতিদের কাছ থেকে শাড়ি কিনে নেন। পরে পাথরাইল হয়ে অন্যান্য হাটে ওই শাড়িই পাইকারি দরে বিক্রি করেন।
দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, ঈদে টাঙ্গাইলের শাড়ি সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ডে শাড়ি রফতানি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এবার অনলাইনেও শাড়ি বিক্রি করছেন।