জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই, সচেতন হওয়া ছাড়া উপায় নেই

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। এ কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা, জীবন দক্ষতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করছে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। বয়ঃসন্ধিকালে মানুষের শরীরে ও মনে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে এবং যৌবনে এসব পরিবর্তন পূর্ণতা লাভ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে কৈশোর বলে। এ বয়সে ছেলেদের কিশোর ও মেয়েদের কিশোরী বলা হয়। বয়ঃসন্ধিকালেই কিশোর কিশোরীরা প্রজনন ক্ষমতা লাভ করে, তাই প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারলে সুষ্ঠুভাবে নিজেদের যত নিতে পারবে এবং এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে।
তবে আজ যারা কিশোর-কিশোরী পরবর্তীতে তারাই হবে দম্পতি। তাই পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন তাদের। শুধু তারাই নয়, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সকলের জানা উচিত।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুস সালাম বলেন, কিশোরীরা যদি এখন থেকেই এই বিষয়ে সচেতন হয় তাহলে দাম্পত্য জীবন তাদের সুখের হবে। তিনি আরো বলেন, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে যেমন খাবার বড়ি, কনডম, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট, আইইউডি, ভ্যাসেকটমি (এনএসভি), টিউবেকটমি (লাইগেশন) বাজারে চালু আছে। তবে একেক দম্পতির চাহিদা বা পছন্দ একেক রকমের। সবার চাহিদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ পরামর্শ বা কাউন্সেলিং, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক পরিবার পরিকল্পনা সেবার দরকার, যাতে দম্পতিগণ তাদের নিজের পচ্ছন্দমত পদ্ধতিটি বেছে নিতে পারেন। এ ব্যাপারে অবশ্যই চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে খাবার বড়ি, কনডম এবং ইনজেকশন ব্যবহারকারীর হার বেশি। তারপরও বর্তমানে অনেক দম্পতি ৩ বা ৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণ করছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার মো. আনোয়ারুল আজিম বলেন, যারা নবদম্পতি এবং সন্তান দেরিতে নিতে চান তারা দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি ইমপ্লান্ট নিতে পারেন। মহিলাদের জন্য অস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি হচ্ছে ইমপ্লান্ট, যা একটি বা দুটি নরম চিকন ক্যাপসুল (দিয়াশলাইয়ের কাঠির চেয়ে ছোট) মহিলাদের হাতের কনুইয়ের উপরে ভিতরের দিকে চামড়ার নিচে স্থাপন করা হয়। যে কোনো সক্ষম দম্পতি এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। তিনি বলেন, মাসিকের প্রথম ৫-৭ দিনের মধ্যে ইমপ্লান্ট নিতে হয় এবং শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তারের কাছে ইমপ্লান্ট নেয়া যায়। এই পদ্ধতিটি ৩ অথবা ৫ বছরের জন্য কার্যকর, এতে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে।
মো. আনোয়ারুল আজিম বলেন, এটি প্রসব-পরবর্তী পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সন্তান নেয়ার প্রয়োজন হলে এটি দ্রুত খুলে সন্তান ধারণ করা যায়। তবে এটি ব্যবহারের ফলে কারো কারো ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। এসময় তিনি আরো একটি পদ্ধতি আইইউডি সম্পর্কে বলেন, যারা দশ বছর সন্তান নিতে চান না এ পদ্ধতি তাদের জন্য। সম্পূর্ণ ঝুঁকি ছাড়াই যৌন জীবনযাপন করতে পারবেন, কিন্তু গর্ভধারণ হবে না। মহিলাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, অস্থায়ী ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি হচ্ছে আইইউডি। এটি মহিলাদের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কপার-টি ব্যবহার করা হয়। স্বাভাবিক প্রসবের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অথবা সিজারিয়ান অপারেশনের সময় আইইউডি গ্রহণ করা যায়। তবে আইইউডি প্রয়োগের পর কখনো কখনো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন প্রথম কয়েক মাস তলপেটে ব্যথা হতে পারে। মাসিকের পর নিয়মিত সুতা পরীক্ষা করতে এবং এটি খোলা ও ফলোআপের জন্য ক্লিনিকে যেতে হবে। মো. আনোয়ারুল আজিম বলেন, যারা পরিবার পরিকল্পনার সেবা নিতে চান তারা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্যাটেলাইট ক্লিনিকে নিতে পারেন।
কথা হয় পদ্ধতি গ্রহণ করা এক দম্পতি শারমীন বেগমের সঙ্গে। বাড়ি বারঘরিয়া ইউনিয়নে। তিনি বলেন, ‘৩ বছর মেয়াদি ইমপ্ল্যান্ট পদ্ধতি নিয়েছিলাম। আগে ইনজেকশান নিতাম; কিন্তু রেডিও মহানন্দার মাধ্যমে এবং উঠান বৈঠকে অংশগ্রহণ করার পর দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পেরেছি এবং আমি আমার পছন্দমতো ইমপ্ল্যান্ট পদ্ধতি গ্রহণ করেছি। এটার ফলে এখন আমার কোনো সমস্য হয়না, আমি নিরাপদে আছি।’
এই পদ্ধতি ব্যবহারকারী গৃহিণী রুনা খাতুন বলেন, আমি ৩ বছর মেয়াদি ইমপ্ল্যান্ট পদ্ধতি গ্রহণ করেছি। এখন এক বছর হয়েছে। প্রথমে একটু সমস্যা হচ্ছিল, তবে ম্যাটার্নি থেকে ওষুধ নেবার পর আর কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। আগে পিল খেতাম, তারপর ইনজেকশনও নিতাম; কিন্তু এতে কিছু সমস্যা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা হয় না। তিনি আরো বলেন, এই পদ্ধতিতে প্রতিদিন কনডম বা বড়ি খাওয়ার ঝামেলা থাকে না।
বারঘরিয়া ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক পান্ডব কুমার সিংহ। এ বিষয়ে তার অভিমত, সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো যে, পুরুষরা যদি স্থায়ী পদ্ধতি নেয় তাহলে তাদের ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে সামাজিক ভয় বা কুসংস্কার থেকে পুরুষরা এটা গ্রহণ করে না। এটি একদম ঠিক না। কোনো দম্পতির যদি একের অধিক সন্তান থাকে, তাহলে সেই পুরুষ স্থায়ী পদ্ধতি এনএসবি নিতে পারবে। এনএসবি যৌনমিলনে বাধার সৃষ্টি করে না। তবে এখনো সচেতনতার অভাবে সঠিক সময়ে অনেক দম্পতি সঠিক পদ্ধতি নিতে পারে না বলে নানান জটিলতায় পড়তে হয় বলে পান্ডব মনে করেন। তিনি আরো বলেন, সচেতনতার অভাবে কখনো স্বাস্থ্যহানি আবার কখনো মৃত্যুর মুখেও পড়তে হয় মেয়েদের। বিশেষ করে বাল্যবিয়ে হলে বা ঘন ঘন সন্তান প্রসব করলে এসব সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তাই কিশোরী বয়স থেকেই দরকার সচেতনতা। সেই সাথে পুষ্টিকর খাবার।
বিএনএনআরসির প্রকল্প সমন্বয়কারী বিমল কান্তি কুরী বলেন, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সবার জানা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা থাকতে হবে। আজকের কিশোরী, আগামী দিনের মা। এ সময় কিশোরীদের সঠিক মাত্রায় প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে হবে। একজন সুস্থ মা পারে সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে এবং সুখী পরিবার গড়ে তুলতে।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং গ্রামে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম। এ বিষয়ে রেডিও মহানন্দার সহকারী প্রযোজক (অনুষ্ঠান ও খবর) মৌটুসী চৌধুরী বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করতে রেডিও মহানন্দা গতবছর ৮টি রেডিও টকশো ও ৬টি রেডিও ম্যাগাজিন প্রোগ্রাম আয়োজনের পাশাপাশি ১১টি উঠান বৈঠক করেছে। এরই মধ্যে নতুন করে আবার চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল বারঘরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ‘প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি’ বিষয়ক সামাজিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি জানান, ইউকেএইডের অর্থায়নে, আইপাস বাংলাদেশ এবং বিএনএনআরসির সহযোগিতায় সামাজিক সংলাপের আয়োজন করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একমাত্র কমিউনিটি রেডিও প্রতিষ্ঠান রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম। ওই আয়োজনে ৪০ জন বিভিন্ন বয়সের এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড সদস্য, স্থানীয় স্কুলশিক্ষক, ইমাম, কিশোরী ও নবদম্পত্তিরা অংশ নেন। সামাজিক সংলাপ ছাড়াও রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ওপর পিএসএ ম্যাগাজিন ও আলোচনা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে বলে জানান তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে মৌটুসী চৌধুরীর মূল্যায়ন, নিজের সুস্থতার জন্য, যৌন বাহিত রোগ, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। জন্মনিয়ন্ত্রণে আরো প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। পরিবার সুখে থাকলে সমাজ শান্তিতে থাকবে আর সমাজে শান্তি বিরাজ করলে দেশ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন হবে। উন্নয়নশীল দেশের উন্নতির জন্য অবশ্যই দরকার পরিকল্পিত পরিবার।