আলেয়াও আলো হয়

12

মোহা. জোনাব আলী

বিজ্ঞাপন কলামে ‘চাকরি করতে আগ্রহী পাত্র চাই’ বিজ্ঞপ্তি দেখে গোলাপ তৈরি হয়। এবার থেকে পাত্রী ধরার কাজে নামতে হবে। চাকরিও দিবে, পাত্রীও হবে। কি মজা?
৫-৬ বছর থেকে চাকরির অনেক খোঁজ করা গেল, কিন্তু হলো না। বিধাতা ভাগ্যে কখন চাকরি লিখেছে তা জানি না। কিন্তু যৌবনকে তো অনাদারে, অবহেলায় নিঃশেষ করে দেয়া যায় না। তাই চাকরি আর বিয়ের এমন বিজ্ঞাপন ছাড়া যাবে না।
এসব ভেবে গোলাপের সিদ্ধান্ত ‘যেখানে দেখব চাকরি ও পাত্র চাই, সেখানে গিয়ে চাইব ঠাঁই।’ যদি মিলে যায়, ব্যস! চাকরির আর তোয়াক্কা করতে হবে না। তাতে হলো কী? রং-চেহারা যা-ই হোক, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকা একটা নারী হলেই হলো। অবশ্য বেশি বয়সী নারী হলে তা চালানো যাবে না। আর এমন বিয়ের পর স্ত্রীর কথামতো চলতে হবে তো হোক না। বেরোতেই হবে পাত্রীর খোঁজে।
পত্রিকার সেই কলামটা ভালো করে লক্ষ করে নেয় গোলাপ। শিক্ষিত এবং সুঠাম দেহের বেকার যুবক চেয়েছে পাত্রী। প্রায়ই মিলছে। তবে দেহটা সুঠাম থেকে প্রায় কমে গেছে ১ ইঞ্চি, গত ৫-৬ বছরে। তাতে কী? কুচপরোয়া নেই। যা হোক হবে। স্থির সিদ্ধান্ত।
যে পাত্রীটি পাত্রস্থ হতে চেয়েছে তার বাবা-মা নেই। সে যখন ক্লাস সিক্সে পড়ত তখনই একই বছরে বাবা এবং বাবার শোকে মা পটল তুলেছিলেন। বিষয়সম্পত্তি যথেষ্ট ছিল। তাই বিভাগীয় শহরের কলেজে লেখাপড়া করতে চলে যায় বলে বিজ্ঞাপনে বলেছে। বাবা-মা স্বর্গে যাবার পর শহরেই বাসা বাঁধে তার ভাই। অবশ্য পাত্রীর ভাই বোনকে রেখে এখন স্ত্রীসহ বিদেশে অবস্থান করছেন। সে বাসাতেই পাত্রীর একা বাস। পাত্রীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান-গরিমা, কর্মসংস্থান ইত্যাদির কথা আপাতত জানা যায়নি। পত্রিকায় সে তথ্য ছিল না।
গোলাপ তৈরি হয়। নতুন ব্লেড দিয়ে ভালোভাবে সেভ করে নেয়। শার্ট-প্যান্ট দু’টোকে দু’বার ক্যালেন্ডার করে। একবারে কাপড়ে মসৃণতা আসেনি। তাই রুচি হয়নি। তারপর যাবে বিয়ের ইন্টারভিউ বোর্ডে। ত্রুটি থাকা তো চলে না। চুলগুলো ভালো করে আঁচড়ে নেয়। দু’একটা চুল মাথায় খাড়া থাকতে চেয়েছিল, হাত দিয়ে জোর করে কয়েকবার চেপে চেপে চুলগুলো লেবেল করে দেয়। পুরো অবয়বটা দেখে নেয়। ব্যস! চলল রাজকুমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা খুঁজতে।
শহরের উপকণ্ঠে ১০ কাঠা জমির উপর একতলা বাড়ি। ৩টি শোবার ঘর, গেস্ট রুম, বাথরুম সবই আছে ৩/৪ কাঠা মাটির ওপর। বাকি জমির সীমানা ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। প্রধান রাস্তা থেকে বাড়ির সদর বারান্দা যেতে দু’ধারে সীমানার মধ্যে ফুলের বাগান। জুঁই, বেলী, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা ফুলগুলোর সুবাসে দেয়াল ঘেরা বাতাসগুলো এক মোহনীয় আবেশ ও পরশের সৃষ্টি করেছে। গন্ধভরা বাতাসের আবেশে গোলাপের হৃদয় নেচে উঠে। পাত্র হিসেবে মনোনীত না হলেও স্বর্গীয় ফুলের আবির খাওয়াতো হলো।
বারান্দা থেকে বেল বাজার টিপ্পনীতে টিপ দেয়। বৈঠকের দরজা খুলে যায়। একজন পরিচারিকা (সম্ভবত) এসে জিজ্ঞেস করে- ‘জি স্যার, আপনি কি পাত্র?’
-হ্যাঁ, কেন?
-তাহলে এই বৈঠক ঘরে বসুন।
বেশ ছিমছাম বৈঠক ঘর। একটা সিঙ্গেল ছাপরখাট। কাচ বসানো একটা টেবিল। দুটি আলমারিতে অনেক বই থরে থরে সাজানো। দেয়ালের মেঝেগুলোয় বড় বড় কবি সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্যের কিছু ছবি ফ্যানের বাতাসে তালে তালে দোল খাচ্ছে।
গোলাপের দৃষ্টি চারিদিকে ঘুরপাক খায়। অনেক দিনের চাকরি খোঁজা ক্লান্ত আঁখি দুটি জুড়িয়ে যায়, দেহ সজীবতা পায়। মুহূর্তে অতীতের সব কথা বিস্মৃত হয়ে যায়। এমন সময় ডাক পড়ে গোলাপের। দ্রুম করে উঠে হৃদয়-মন। তবু সংযত হয়ে বুকে সাহস আনার চেষ্টা করে। মনে মনে ভাবে, পাত্র হিসেবে কি কেউ এর আগে আসেনি? সংশয়ে শরীর মন কাঁটা দিয়ে উঠে। তাহলে আমিই কি প্রথম, না কি শেষ? কত ভাইভা পরীক্ষা তো দিয়েছি ভয় কিসের…?
পরিচারিকাকে অনুসরণ করে গোলাপ। পাশের ঘরে পাত্রী অপেক্ষা করছে পাত্র দেখার জন্য। ঘরে ঢুকতেই সালাম ঠুকে দেয় গোলাপ। যেমন অন্যান্য ইন্টারভিউ রুমে ঢুকেই সালাম দিয়ে থাকে। অপর প্রান্ত থেকে সালামের উত্তর দিয়েই গোলাপকে বসতে বলা হয়। ততক্ষণে পাত্রীর মুখ টেবিলের কাগজপত্রের দিকেই নিবিষ্ট ছিল। ব্যক্তিগত কাগজপত্র হতে পারে, আর না হয় এখন পর্যন্ত ক’জন পাত্র এসেছিল তার তালিকা বা তার ক্রমিক নম্বরের হিসেব খোঁজা হচ্ছিল হয়তো।
পাত্রী চোখ তুলে নায়ক পাত্রের দিকে তাকায়। বিজলী চমকার মতো চমকে উঠে। মুখে কোনো কথা না বলে পাত্রী পাত্রের দিকে একপলক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই ভিতরে চলে যায়।
গোলাপের মনে খটকা লাগে। অবাকও হয়। ইন্টারভিউয়ে সে তবে প্রথমেই ফেল! তাকে তো ভালো করে দেখলই না। তার যোগ্যতা এত কম হয়ে গেছে? পাত্র হিসেবে সে যোগ্য নয়? তার চেহারা এত খারাপ? তার মনও কি এমন? কিন্তু মন এমন হলে উনি কি করে জানবেন? তবে তিনি কি মনোবিজ্ঞানী? তা হোক, কিন্তু ইন্টারভিউয়ে ডেকে এতবড় অপমান না করে একটা প্রশ্ন তো করতে পারতেন।
তাৎক্ষণিকভাবে গোলাপ অনেক কিছু ভেবে নেয়। মনে মনে বলে, ভাগ্য তার সব ক্ষেত্রেই প্রতিকূল। এতবড় অপমানে যেন তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে। মাটি ফাটলে সে হয়তো এতক্ষণ লজ্জা লুকানোর জন্য ঢুকে পড়ত। সে একেবারে কিংকর্তব্য বিমূঢ়। পাত্রীর কাছে হার? না এটা মানা যায় না। পা দুটো কাঁপতে শুরু করেছে। দ্রুত বেরিয়ে যাবার ইচ্ছে করছে। কিন্তু না, পা দুটো এগোতে অলসতা দেখাচ্ছে। তবু জোর করে এক পা উঠিয়েছে, এমন সময় পরিচারিকা এসে বলে- ‘আপনি যাবেন না কিন্তু… আপা একটু পর…।’
বালাইষাট। মরার উপর আবার খাঁড়ার ঘা? গোলাপের ভিতর দুরু দুরু করে উঠে- ওরে বাবা, কোন পরীক্ষা শুরু হলোরে বাবা? কিয়ামত নয়তো আবার? ভেবে স্থির করতে পারে না সে, কি করবে? বুকে সাহস করে থাকবে নাকি পালাবে? মুহূর্তে ভাবনার থলি ফুরিয়ে যায়। না বাবা আর একদ- নয়, এক্ষুণি পালাতে হবে…।
ততক্ষণে পরিচারিকা এসে আবার বলে- ‘আপনার যাবার পথ বন্ধ, আমি কাজীকে ডাকতে গেলাম।’
গোলাপের মনে সন্দেহ-সমস্যাটা বুঝি ক্ষণে ক্ষণে জটিল হলো। কাজী আবার কোনো পুলিশ-টুলিশের নাম নয়তো? খেয়েছে, মাথার ভিতরটা চনাক করে উঠে। আর কোনো ভাবনা চিন্তা নয়, এবার পালাতেই হবে। নইলে আর রক্ষে নেই। হায়রে পাত্র হওয়ার সাধ? তোর মুখে ছাই। বাইরের দরজার দিকে গোলাপ কয়েক ধাপ ফেলে দেয়। পিছন থেকে ছুটে আসা কণ্ঠে গোলাপ আঁতকে উঠে।
-পালাচ্ছ কোথায় খুনী? খুন করে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যেতে তোমার লজ্জা করে না? জেলের ভয়ে আবার ফেরারী আসামি হতে যাচ্ছ?
এতক্ষণে গোলাপের শেষ বুদ্ধিটুকুও লোপ পেয়েছে। তার শরীরে জীবন নামের কোন সত্তা আছে কি না এ কথা সে বেমালুম ভুলে গেছে।
– এই এদিকে তাকাও, আমি বলছি এদিকে তাকাও, না তাকালে তোমার কিন্তু খবর আছে।
গোলাপ কিছু ঠাহর করতে পারে না। খুনের লাশ বোধ হয় ঘরের মধ্যে চলে এসেছে। তারা বাসায় কাউকে খুন করে লাশ দেখিয়ে এখন আমাকে আসামি করে পুলিশে ধরাবে, কি বেড়াজালরে বাবা?
– কি তাকাবে না?
গোলাপ খুব কষ্টে পেছন ফিরে তাকায়। পাত্রীর চোখে চোখ পড়ে, তবে পলকহীন। মরা মানুষের চোখ যেমন স্থির।
‘তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? ভালো করে আমার দিকে চেয়ে দেখ তো, আমাকে চিনতে পার কি না?’ পাত্রী বলে।
‘মা…নে আপনি…’, অনেকক্ষণ ধরে আমতা আমতা করে মুখে কথা বলে গোলাপ।
– আমি শিউলী।
– শি-উ-লী? কোন্্ শিউলী?
– চকপাড়ার।
– কোন চকপাড়া?
– তুমি কয়টা চকপাড়া চেন?
– একটাই।
– আর চকপাড়ায় কয়টা শিউলী ছিল?
– মানে…?
– হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি সেই শিউলী, যে শিউলী বাল্যজীবনেই এক গাধার প্রেমে পড়েছিল। সেই গাধাকে ভালোবেসে বাবুই পাখির মতো বাসা বুনে যেত প্রতিক্ষণ। কিন্তু সেই গাধা কেন যে তাকে ভুলে গিয়েছিল তা জানি না।
– কি বললেন..?
– আবার বললেন করে বলছ? ‘বলো’ করে বলো না হলে এবার কিন্তু সত্যি পুলিশ ডাকব।
– শিউলী, মানে তুমি…?
– হ্যাঁ, অনেক দিনের ব্যবধানে তুমি হয়তো আমাকে ভুলে গেছ, কিন্তু আমি তোমায় ভুলিনি।
এতক্ষণে দম বন্ধ হয়ে আসা বুক থেকে গোলাপের একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়। ‘তাই বলো শিউলী, আমিও প্রথম দেখেই তোমাকে কেমন চেনা চেনা ভেবেছি। কিন্তু…’
– বসো। জানো যেদিন থেকে গ্রামের বাড়ি এবং স্কুল ছেড়ে এ শহরে এলাম, সেদিন থেকেই প্রতিনিয়ত আমি তোমার কথা ভেবেছি। তোমার কাছে কয়েকটা চিঠিও দিয়েছি।
– কিন্তু… বিশ্বাস করো শিউলী, আমি তোমার কোনো চিঠি পাইনি। জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রামে জীবন চাকাটা ঘুরাতে গিয়ে এতদিন আমার জীবনসত্তাটা পথে পথে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়িয়েছে। কিন্তু জীবনের গভীরে মন সত্তাটা তোমাকে ভোলেনি, ভুলে যেতে পারেনি। তবে তোমার যে এভাবে দেখা পাবো, এটা কখনো কল্পনা করিনি। তুমি আমার শুধু স্মৃতি, এটাই ভেবেছিলাম।
– আর স্মৃতি নয়, এবার সত্যি হোক।
– কেমন?
– ঐ দেখ কাজী এসে গেছে…
– কাজী কোন্ থানার পুলিশ? তুমি আমাকে ভালোবাস তো পুলিশ দিয়ে ধরাবে কেন?
– পুলিশ দিয়ে না ধরালে তুমি যে আবার পালিয়ে যাবে। তখন তোমাকে কোথায় খুঁজে পাবো?
– একি! এ যে পুলিশ নয়, মনে হচ্ছে বিয়ে পড়ার কাজী।
– হ্যাঁ হ্যাঁ, উনি হচ্ছেন কাজী, যারা দুটি বিপরীত মনের জোড়া দেন।
– কিসের জোড়া?
– বিয়ের জোড়া।
– সে কি?
– এক্ষুণি বিয়েটা…
– কিন্তু….
– আর কোনো কিন্তু নয়। তোমাকে ধরার জন্যই আমি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। কারণ তুমি এই শহরেই আছো এবং এখনো চাকরি-বাকরি পাওনি এটা আমি শুনেছিলাম। আর সরকারি হোক বা বেসরকারিই হোক একটা চাকরি না পেলে তুমি বিয়ে করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে এবং এখনো চাকরি পাওনি আমি এটা জেনেছিলাম। অবশ্য পাত্রী চাইলে বিয়ে করবে এটাও জেনেছিলাম।
– তোমাকে এসব কথা কে বলেছিল?
– তোমার সাথে লেখাপড়া করা একটা ছেলের কাছ থেকে আমি সব শুনেছিলাম। তবে সে তোমার আসল ঠিকানা দিতে পারেনি। তাই তোমাকে খোঁজা সম্ভব হয়নি। এজন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম যে, যদি তুমি …। হ্যাঁ, তোমার আগে ৬৩ জন ছেলে আমার ইন্টারভিউ বোর্ডে এসেছিল। আমি তাদের সবাইকে আপ্যায়ন করে যাতায়াত খরচ আর সম্মানজনক সম্মানী দিয়ে বিদায় দিয়েছি। আর এসবই করেছি তোমাকে পাওয়ার জন্য।
– শিউলী তুমি যা বলছো তা কি বাস্তব হতে পারে?
– ভাগ্য সব করতে পারে।
– তাই বলে…
– আর এত ভেবে লাভ কি? ধরা যখন পড়ে গেছ, তখন আর পালাতে পারো স¤্রাট?
– শিউলী, আমি স্বপ্ন দেখছি নাতো?
– নাগো লোভী বর না, এটা স্বপ্ন না, সত্যি। বিধাতার লীলাখেলা শুধু দু’জনকে দু’পারে ঠেলে দিয়ে এতদিন মানুষ করে যৌবনের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
– আমি বেকার, আমার যে ভয় লাগছে…
– তোমার কোনো চিন্তা নেই। আমার চাকরি এবং জমিজমা থেকে সবই চলবে। তবে তুমি চাকরি পেলে করবে এতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।
– কিন্তু…
– তুমি হবে আমার রাজা, শুধু হুকুম দেনেওয়ালা। আর আমি রানী, তোমার স্বপ্নে দেখা সেই রাজকন্যা, বুঝলে হবু প্রাণনাথ?
– অ্যাঁ! আমার ভাগ্য তবে ফলেছে…? আমি এখন চিন্তামুক্ত হতে যাচ্ছি?
– না না তোমার ভাগ্য ফলেনি। ঘরের মধ্যে ঢুকে ফুলে গেছে। মনের দরজা দিয়ে বেরোতে আর পারবে না, মুক্ত নও তুমি, তুমি এখন আমার বন্দী…।
পরিচারিকা তার মনিবের এমন বুদ্ধি ও প্রাপ্তি দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠে- ‘হিফ হিফ হুররে …. কাজী বিয়ে জুড়বে…।’

লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও প্রভাষক