স্বাবলম্বী মানুষ গড়ে তুলতে উজ্জীবিতের মাধ্যমে কাজ করছে প্রয়াস

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ইউপিপি উজ্জীবিত সদস্যদের মাঝে উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। বুধবার সকালে প্রয়াসের নকীব হোসেন মিলনায়তনে এসব উপকরণ প্রধান অতিথি হিসেবে বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক এ জেড এম নূরুল হক। প্রয়াসের নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেনের সভাপতিত্বে বিতরণ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. এসএফএম খাইরুল আতাতুর্ক।
ইউপিপি উজ্জীবিত প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকি তহবিলের সহায়তায় সদস্যদের মাঝে দুটি করে ছাগল ও নগদ দুই হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এ প্রকল্পের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরসহ মোট ৫টি উপজেলায় ২০টি কিশোরী ক্লাবের মধ্যে সেরা ১০টি ক্লাব নির্বাচন করা হয়। সেরা ১০টি ক্লাবের প্রত্যেককে বুক সেলফ, ৩০টি বই, ৩টি সিল, স্ট্যাম্প প্যাড, খেলার উপকরণ হিসেবে হ্যান্ডবল, স্কিপিং রোপ ৫টি এবং টেনিস বল, বসার জন্য মাদুর ৩টি, সাইনবোর্ড ও ৪টি রেজিস্ট্রার খাতা প্রদান করা হয়।
সফল ইলেকট্রিশিয়ানদের মধ্যে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা মূল্যের উপকরণ তুলে দেয়া হয়। উপকরণের মধ্যে রয়েছে- একটি করে ড্রিল মেশিন, গ্রিন্ডার মেশিন, অ্যাভো মিটার, টুলবক্স, কম্বাইন প্লাস, কটিং প্লাস, নোজ প্লাস, হাতুড়, হ্যাকসো ফ্রেম ও ব্লেড, মেজারমেন্ট টেপ, রিপিট গান, আয়রন, ওয়ার স্টাপলার, স্লাই রেঞ্জ, স্ক্রু ড্রাইভার সেট, ফাইল, টেবিল ভাইস, টেস্টার, ক্লিপ অন মিটার, সফ্ট হ্যামার, সেফটি হেলমেট, অ্যাপ্রোন, ক্লু হ্যামার, স্টিল টুলবক্স এবং অ্যালুমিনিয়াম মই। সেলাইমেশিন প্রশিক্ষাণার্থীদের সিট কাপড় এবং ডিজাইন বুক উপকরণ হিসেবে প্রদান করা হয়।
উল্লেখ্য, ইউপিপি ও আরইআরএমপি-২ সদস্যদের দক্ষতা ও সামর্থ্য উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর ফুড সিকিউরিটি-২০১২ বাংলাদেশ ইউপিপি উজ্জীবিত প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে প্রয়াস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউ-েশন (পিকেএসএফ)’র সহযোগিতায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তাবায়ন করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।
প্রকল্পের কার্যত্রমের মধ্যে ছিল ইউপিপির আওতায় ৪২ ও আরইআরএমপির আওতায় ৮ জন সদস্যকে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন, ৪২৫ জনকে কেঁচো সার উৎপাদন, ৪ জনকে আদর্শ উজ্জীবিত বাড়ি, ২ জনকে গরু মোটাতাজাকরণ, ২ জনকে লেয়ার পালন, ২ জনকে নার্সারি স্থাপন, একজনকে জমি বন্ধক ও বছরব্যাপী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চাষ, ৬ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ৩৭৫ জনকে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে মডেল আইজিএ স্থাপনের আওতায় আনা।
এছাড়া অতিদরিদ্র সদস্যদের মধ্যে ৫২৫ জনকে ২ দিনব্যাপী মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন, ১৫০ জনকে ২ দিনব্যাপী বসতবাড়িতে সবজি চাষ, ২৫০ জনকে ২ দিনব্যাপী কেঁচো সার উৎপাদন ও এর ব্যবহার, ৩০০ জনকে ২ দিনব্যাপী গরু মোটাতাজাকরণ, ২৫ জনকে ২ দিনব্যাপী গাভী পালন, ২৫ জনকে ২ দিনব্যাপী সোনালি মুরগি পালন, ২৫ জনকে ২ দিনব্যাপী মৎস্য চাষ, ১৭৫ জনকে এক মাসব্যাপী সেলাই প্রশিক্ষণ ও সেলাইমেশিন প্রদান, ১৫০ জন সদস্যকে ১২ দিনব্যাপী হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ ও উপকরণ ব্লক-বাটিক, বাঁশ-বেত ইত্যাদি প্রদান, ৩০ জন সদস্যকে তিন মাস মেয়াদি ইলেকট্রিক্যাল হাউজ ওয়ারিং / ইলেকট্রিশিয়ান এবং ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিজারভেশন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
আরইআরএমপি-২ সদস্যদের ৩৭৫ জনকে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন, ২৭৫ জনকে বসতবাড়িতে সবজি চাষ, ২৫ জনকে গাভী পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। অতিদরিদ্র সদস্যদের ১৮ হাজার ১১১ প্যাকেট (বিভিন্ন মৌসুমে- রবি, লাউ ও সিম, খরিপ-১-মিষ্টি কুমড়া ও কলমী শাক এবং খরিপ-২- চালকুমড়া ও পুঁই শাক) বীজ বিতরণ এবং ১৯ হাজার ৯৩৮টি গবাদি প্রাণী (গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি)কে কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানো এবং টিকা প্রদান করা হয়।
কারিগরি, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মধ্যে (অতিদরিদ্র সদস্য এবং আরইআরএমপি-২ সদস্য) ৮ হাজার ৯৯৮টি পুষ্টি কারিগরি সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনা, ৮ হাজার ৬৩৯টি স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সেশন পরিচালনা, গর্ভবতী মা, দুগ্ধদানকারী মা ও ০-৫ বছর বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি।
এছাড়াও বিশেষায়িত কার্যক্রমের মধ্যে ছিল কিশোরী ক্লাব গঠন। ২০টি কিশোরী ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৫০০ জন। ২৫ জন সদস্য নিয়ে একটি কিশোর ক্লাব। প্রাথমিক স্কুল ফোরাম ১০টি ও মাধ্যমিক স্কুল ফোরাম ১৩টি গঠন এবং বিভিন্ন বিষয়ে সেশন পরিচালনা করা হয়। ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় স্কুলমুখীকরণ কার্যক্রম-৪৩ জনকে চিহ্নিত করা হয়। তার মধ্যে ২০ জনকে পুনরায় ভর্তি করা হয়। কমিউনিটি ইভেন্টস (বিভিন্ন দিবস উদযাপন / স্বাস্থ্য ক্যাম্প / ব্লাড গ্রুপিং) ২৩টি, ইনফরমেশন শেয়ারিং ওয়ার্কশপ (স্বাস্থ্য ক্যাম্প ও ব্লাড গ্রুপিং) ৩টি, ঝুঁকি তহবিল সহায়তা প্রদান (মূল উপার্জনকারীর মৃত্যু, দুর্ঘটনাজনিত কারণে অঙ্গহানি এবং দীর্ঘ সময় ধরে জটিল রোগাক্রান্ত- যেমন স্ট্রোক, ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক, গুরুতর পোড়া, অন্ধত্ব, কিডনি আক্রান্ত, বধির, বোবা, প্যারালাইসিস ইত্যাদি) ১০৩ জন। তার মধ্যে ৫৮ জনই প্রতিবন্ধী। পুষ্টিগ্রাম / আইজিএ গ্রাম / কেঁচো ক্লাস্টার- ৬টি (পুষ্টিগ্রাম ৩টি এবং কেঁচো ক্লাষ্টার-৩টি)।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ইউপিপি উজ্জীবিত প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী ফারুক আহমেদ প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকি তহবিল সহায়তা প্রদান করা হয়েছে মোট ১০৩ জনকে। তার মধ্যে ৫৮ জন প্রতিবন্ধী, ২৮ জন সিজারিয়ান ডেলিভারি, ১০ জন প্যারালাইসিস, ৩ জন স্ট্রোক, একজন ক্যান্সার এবং ৩ জন মৃত্যুজনিত। ঝুঁকি তহবিল সহায়তা পাওয়ায় প্রতিবন্ধীরা পরিবারের বোঝা নয় সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সিজারিয়ানসহ অন্যান্য জটিল রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ অনেক সহজতর হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় জেলার পাঁচটি উপজেলায় ২০টি কিশোরী ক্লাব এবং একটি কিশোর ক্লাব রয়েছে। প্রতিটি ক্লাবে সদস্য সংখ্যা ২৫ জন। ক্লাবের সদস্যরা মূলত স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা নিয়ে কাজ করে। স্বাস্থ্য পুষ্টি বিষয়ক কার্যক্রম যেমন- সচেতনতা সেশন, ডায়াবেটিস চেকআপ, বিএমআই চেকআপ, জ্বর পরিমাপ, ওজন পরিমাপ, রক্তচাপ পরিমাপ, ট্রিপিট্যাপ পদ্ধতির ব্যবহার ইত্যাদি। সামাজিক কার্যক্রম যেমন- বাল্যবিয়ে, যৌতুক, যৌন হয়রানি ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ। এছাড়া ক্লাবের সদস্যরা খেলাধুলা, বইপড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। ক্লাবে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। যেমন- বিপি মেশিন, ওয়েট মেশিন, থার্মোমিটার, উচ্চতা পরিমাপক ফিতা, বিএমআই চার্ট, খাদ্য তালিকা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি লুডু, দাবার বোর্ড ইত্যাদি।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্পের আওতায় মোট ১৫ জনকে ইলেকট্রিক্যাল হাউজ ওয়ারিং (ইলেকট্রিশিয়ান) ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ পাওয়ায় প্রত্যেকে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে এবং পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখছে। প্রকল্পের আওতায় ১৭৫ জনকে এক মাসব্যাপী সেলাই প্রশিক্ষণসহ সেলাইমেশিন প্রদান করা হয়েছে। তার মধ্যে ৫ জন প্রতিবন্ধী। সেলাই প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে সক্ষম হয়েছে, নিজের কাজ করার পাশাপাশি অন্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, অতিদরিদ্র পরিবারের মেয়ে সচ্ছল পরিবারে বিয়ে হয়েছে, ছেলেমেয়েদের ভাল স্কুলে লেখাপড়া করাচ্ছে। প্রতিবন্ধী হয়েও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর জীবন-যাপন করছে।
ফারুক আহমেদ বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় শতভাগ সদস্যই অতিদরিদ্র। প্রকল্পটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে পিকেএসএফের সহযোগিতায় ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে শুরু হয়েছে এবং চলতি এপ্রিল মাসের ৩০ তারিখ শেষ হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রেখেছে, বেকারত্ব দূর হয়েছে, দক্ষতার উন্নয়ন ঘটেছে, স্বাস্থ্য-পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সমাজে বাল্যবিয়ে হ্রাস পেয়েছে, নারী নেতৃত্বের উন্নয়ন হয়েছে, স্কুল থেকে শিশু ঝরে পড়া রোধ হয়েছে, কমিউনিটি পর্যায়ে একটি চমৎকার প্লাটফর্ম হিসেবে কিশোরী ক্লাব গড়ে উঠেছে। যা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে মহারাজপুর আকন্দবাড়িয়া উজ্জীবিত কিশোরী ক্লাবের সদস্য নুশরাত জাহান বর্ষা বলেন, একটা মেয়ে কিভাবে বাল্যবিয়ে হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে, তা এই কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে আমরা তাদের সচেতন করছি। বাল্যবিয়ে একটা কুসংস্কার। বাল্যবিয়ে হলে নারীরা নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়ে। আমার মতে, নারীরাও দেশের উন্নয়ন ও মানচিত্র পাল্টে দিতে পারে।
উপকরণ পাওয়া মহারাজপুরের ঢুলঢুলিপাড়া গ্রামের ইলেকট্রিশিয়ান মনিমুল হক বলেন, ইলেকট্রিক কাজ করার জন্য যেসব উপকরণ লাগে সেগুলো আমাদের দেয়া হয়েছে। এগুলো পেয়ে আমরা খুব আনন্দিত। আমরা এসব উপকরণ দিয়ে ভালোভাবে কাজ করে অনেক উন্নতি করতে পারব।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ১৫টি ইউনিট অফিসের আওতাধীন অতিদরিদ্র সদস্যদের মাঝে অগ্রাধিকারভিত্তিক আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রম প্রদর্শনী, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইউনিট অফিসের কর্ম এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত আরইআরএমপি সদস্যদের মাঝে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, বীজ বিতরণ ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
উল্লিখিত কার্যক্রমগুলি প্রোগ্রাম অফিসার টেকনিক্যাল ও প্রোগ্রাম অফিসার সোস্যালগণ সরাসরি বাস্তবায়ন করে থাকে। সর্বোপরি বাস্তবায়িত কার্যক্রমসমূহ প্রয়াসের উচ্চ ব্যবস্থাপনা পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের অফিসার (কার্যক্রম) কর্তৃক নিয়মিত মনিটরিং করছে।