প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন জরুরি

সাজিদ তৌহিদ

চলতি বছরে দেশে হঠাৎ করেই যেন ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা বেড়ে গেছে। এসবের শিকার হয়ে অনেকেই আবার চক্ষুলজ্জা আর অপমানের জ্বালায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ পাচ্ছে। বিশেষত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় যৌন নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখানে ছোট্ট একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয় ডট কম ‘পাঁচ বছরে ‘ধর্ষণের’ শিকার ২৩২২ শিশু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে এ বিষয়ক বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৬৩৯ শিশু। এ তো গেল গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এসব ঘটনাও নেহায়েত কম নয়, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়। যাহোক, এর বেশি পরিসংখ্যান তুলে ধরে লেখার পরিধি বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই।

প্রথমে কথা হলো, যৌন নির্যাতন বা যৌন নিপীড়ন কোনগুলো। উইকিপিডিয়া বলছে, ‘একজনের উপর অন্যজনের চাপিয়ে দেয়া অনিচ্ছাকৃত যৌন আচরণকে যৌন নির্যাতন বা উৎপীড়ন বলা হয়। যখন প্রত্যক্ষভাবে স্বল্প সময়ের জন্য অথবা পরোক্ষভাবে জোর করা হয় তখন তাকে যৌন লাঞ্ছনা বলা হয়। অপরাধীকে যৌন নির্যাতক (যদি হানিকরও হয়) বা উৎপীড়ক বলে অভিহিত করা হয়। যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোক বা তরুণ কোনো শিশুকে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা দেয় তাকেও যৌন নির্যাতন বলা হবে। শিশু বা নাবালকের সাথে অনুপ্রেরণা দিয়ে যৌন কাজে লিপ্ত হলে তাকে শিশু যৌন নির্যাতন বা বিশেষ আইনের আওতায় ধর্ষণ বলা হয়।’

যৌন নির্যাতন বা যৌন নিপীড়ন কোনগুলো সে বিষয়েও হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্টে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি বন্ধে দিকনির্দেশনা চেয়ে একটি রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৪ মে যৌন হয়রানি রোধে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি যুগান্তকারী রায় দেন। কোন আচরণগুলো যৌন নিপীড়নমূলক, সেগুলোও আদালত চিহ্নিত করে দেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সর্ব কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি; নারী ও শিশুদের ব্যাপারে কুৎসা রটানো, চরিত্র হননের চেষ্টা, শারীরিক নির্যাতনের চেষ্টা; পথেঘাটে কোনো নারীকে ‘সুন্দরী’ বলা; ই-মেইল, এসএমএস বা টেলিফোনে উত্ত্যক্ত করা; প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জালিয়াতি; উদ্দেশ্যমূলকভাবে শরীরের বিশেষ অংশে স্পর্শ করা; রাস্তাঘাট ও পাবলিক প্লেসে উত্ত্যক্ত করা (ইভটিজিং); নারী ও শিশুদের নগ্ন ছবি ও কার্টুন ইত্যাদি আঁকা বা প্রকাশ ও প্রদর্শন করাকে যৌন নিপীড়ন বলে চিহ্নিত করে আদালত।

আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। দুজন নারী প্রতিনিধিকে বাধ্যতামূলকভাবে সেই কমিটিতে রাখতে হবে। যারা হয়রানির শিকার হবেন, তারা এ কমিটিতে অভিযোগ করবেন। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কারোর নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা যাবে না। প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অভিযোগের মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচার হবে। ওই রায়ে যৌন নিপীড়ন এবং এর শাস্তি সম্পর্কে সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বারোপ করা হয়।

হাইকোর্টের এ যুগান্তকারী রায়ের পর কটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কমিটি গঠিত হয়েছে সে পরিসংখ্যান জানা নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রতিষ্ঠান, বিশেষত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কমিটি গঠনের খবর চোখে পড়েনি [হয়ে থাকলে জানানোর অনুরোধ রইল]। কমিটি হয়ে থাকলে এ ধরনের আচরণ থেকে অনেকেই বিরত থাকত, অন্তত অভিযোগ দায়েরের ভয়ে। তবে এখন দ্রুততর সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন বিষয়ে বিভিন্ন সময় এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আশার আলো ফোটেনি। দেশে বা সমাজে হঠাৎ করেই কী এসব বেড়ে গেছে? উত্তর অবশ্যই না। কেননা এসব অপরাধ সমাজে আগে থেকেই ঘটে আসছে। প্রশ্ন যেটা উঠতে পারে তাহলো এর লাগাম টেনে ধরা কিংবা সমাজে এসব বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন। আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নাকি পুরুষশাসিত সমাজে এসব অপকর্ম পুরুষের অপমানের শামিল, তাই বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য না করা। কোনটি? উত্তর খোঁজার সময় হয়তো চলে এসেছে। কেননা বর্তমানে দেশে উন্নয়নের যে ধারা বহমান, তা অনেকাংশেই ম্লান হয়ে যায়। আর সর্বোপরি পিছিয়ে যাবে সাসটেইনেবল ডেভেলপমন্ট গোল (এসডিজি) অর্জনও। টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সমাজে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা কিন্তু বাধা বা প্রতিবন্ধকতা।

দেশ এগোচ্ছে, উন্নয়নও হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিতেও অবদান রাখছে দেশ। ঠিক এরকম অবস্থায় দেশে এহেন ধরনের ঘটনা ঘটে যাওয়া, সব উন্নয়নকে ম্লান করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কাজেই শুধু উন্নয়ন নয়, নারী ও শিশুর প্রতি যে সহিংসতা ঘটে চলেছে তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়। কেননা নুসরাত হত্যাকা- আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছে। দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

চলতি এপ্রিল মাসেই এ-সংক্রান্ত খবর এত বেশি প্রকাশ পেয়েছে যে, প্রতিটি মানুষ এখন এর উত্তর খোঁজার জন্য ব্যস্ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টার মতো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। থানায় মামলা পর্যন্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হয়েছে অভিযুক্তরা। তারপরও থেমে নেই। এর উত্তর হতে পারে একটিই, তাহলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা বিচার না হওয়া। কেননা মামলা একটি দীর্ঘ পরিক্রমা। সে পরিক্রমার জন্য অনেকেই এ পথ মাড়াতে ভয় পান।

যৌন নিপীড়ন কিংবা নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের চেষ্টাÑ সমাজে এ ধরনের অপরাধের বিস্তার কেনইবা ঘটছে তার জন্য দেশের মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগাতে হবে। এসব অপরাধের মূল জায়গা নির্ধারিত হলে সমাজ থেকে এর মূলোৎপাটন করা সম্ভব হবে। আর যাই হোক এসবকে সামাজিক ব্যাধি বলার সুযোগ নেই। এগুলো অপরাধ। আর অপরাধের যতক্ষণ না সঠিক বিচার হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজ থেকে এর নির্মূল কঠিন হয়ে পড়বে।

সাজিদ তৌহিদ : লেখক ও সাংবাদিক