বাঙালির বৈশাখ

গোলাম রাব্বানী তোতা

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ হচ্ছে ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি জেলা। এ জেলায় নদী, আমবাগান, দিগন্তজোড়া বিস্তৃত ফসলি জমি এবং নতুনভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকলকারখানা আধুনিক স্থাপত্যে ও সৌন্দর্যে ভরপুর। অলি-আওলিয়া, পীর, মুর্শেদ, কবি-বাউল, ধান-গান, গরদ কাঁসা, আম-চমচম আর পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা, পাগলা নদীদ্বারা পরিবেষ্টিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা; যার ভৌগোলিক ও প্রকৃতিতে রয়েছে বিপুল বৈচিত্র্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বছরজুড়ে যতগুলো অনুষ্ঠানাদি পালিত হয় তার মধ্যে বাংলা নববর্ষ অন্যতম। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতোই এ জেলাতেও বর্ষবরণ মহাসমারোহে পালিত হয়। সরকারি, বেসরকারি, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দিনভর আনন্দ উল্লাসে পালিত হয় বষর্ষবরণ উৎসব। সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় হলো বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। জেলা প্রশাসন আয়োজিত শোভাযাত্রায় জনস্রোত পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন কারুকাজ সম্বলিত ব্যানার ফেস্টুন এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য গরুরগাড়ির বহর নিয়ে যে শোভাযাত্রা এবং ছোট শিশুদের বর-বধূ, কৃষাণ-কৃষাণি রূপে সাজিয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে তা অসাধারণ ও চমকপ্রদ। রাস্তার দুই পাশে হাজারো লোক করতালিতে মুখরিত করে তোলে এবং তাদের সম্ভাষণ জানাই। নববর্ষকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন রাস্তার পাশে মেলা বসে যা উৎসবকে আরো আর্কষণীয় ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বাঙালির প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব বাংলা নববর্ষ। বর্তমানে ঘটা করে উদ্যাপন করা হচ্ছে। পাকিস্তানি শাসকের তেইশ বছর শাসনকালে তত জাঁকজমক ও অনাড়ম্বরভাবে বৈশাখী অনুষ্ঠান করা হতো না বা করতে দেয়া হতো না। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাঙালির বাংলাদেশ শত্রু ও রাহুমুক্ত করার পর বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখী বা পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে মহসমারোহে। বাঙালি, বাংলা নববর্ষ, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। বাঙালির সকলপ্রকার সত্তা জড়িয়ে আছে নববর্ষে। বাঙালির নতুন বছর শুরু হয় বৈশাখ মাস দিয়ে। বৈশাখ মাসটি নেয়া হয়েছে বিশাখা তারার নামানুসারে। ঠিক তেমনই বাংলা বারোটি মাস বিভিন্ন নক্ষত্রের নামানুসারে নেয়া হয়েছে। যেমন- বৈশাখ বিশাখা নক্ষত্রের নামে, জ্যৈষ্ঠ জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, আষাঢ় উত্তর ও পূর্ব আষাঢ় নক্ষত্রের নামে, শ্রাবণ শ্রাবণা নক্ষত্রের নামে, ভাদ্র উত্তর ও পূর্ব ভাদ্র নক্ষত্রের নামে, আশ্বিন আশ্বিনী নক্ষত্রের নামে, কার্তিক কৃত্তিকা নক্ষত্রের নামে, অগ্রহায়ণ মুগশিরা নক্ষত্রের নামে, পৌষ পুষ্যা নক্ষত্রের নামে, মাঘ মঘা নক্ষত্রের নামে, ফাল্গুন উত্তর-পূর্ব ফাল্গনী নক্ষত্রের নামে, চৈত্র চিত্রা নক্ষত্রের নামে।
চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসর থেকে এগারো দিন কম। সৌর বৎসর তিনশত পঁয়ষট্টি দিন আর চান্দ্র বৎসর তিনশত চুয়ান্ন দিন। আর এ কারণে চান্দ্র বৎসরের ঋতুগুলো ঠিক থাকে না। এতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে খাজনা আদায়ে সমস্যা দেখা দিত। আর এ সমস্যা সমাধানে মোঘল স¤্রাট আকবরের নির্দেশক্রমে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজী চান্দ্র সন ও সৌর সনের উপর ভিত্তি করে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। এ হলো প্রায় পাঁচশত বছর আগের ইতিহাস, যা আজো বাংলা সনকে অমলিন করে রেখেছে। বাংলা সনের প্রবর্তক মোঘল স¤্রাট আকবর ও জোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজী আজো স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে রয়েছেন বাঙালির মানসপটে, বাংলার ইতিহাসে।
নববর্ষের মূল্যবোধকে জনতার মাঝে জাগিয়ে তুলতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় হস্তশিল্প, কারুশিল্প, রকমারী পণ্যে সাজানো হয় বিভিন্ন স্টল। মেলার আরো আকর্ষণ যাত্রাপালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকজঅনুষ্ঠান জনপ্রিয় গম্ভীরা গান এবং কবিগান, বাউল গান, লালনগীতির জমজমাট আসর বসে। থাকে ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য চোখ ধাঁধানো বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা। মেলায় বেত, বাঁশের বাঁশি, মাটির তৈরি পণ্য, লোহার সামগ্রী, ইমিটেশন নিয়ে পশরা সাজানো স্টলগুলো দেখতে বেশ ভালোই লাগে। মেলার মাঠে বেশি বিক্রি হয় গজা, খাজা, তিলুয়া, পাঁপড়, আচার, মোয়া, চিনাবাদাম, চিনির ঝুরি ও গুড়ের ঝুরি, মশলা মেশানো ঝাল চানাচুর এবং বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি ইত্যাদি।
পহেলা বৈশাখে বা বৈশাখী উৎসবে বা শুভ নববর্ষে সেই প্রাচীন কাল থেকে একটি রেওয়াজ চলে আসছে তা হলো শুভ হালখাতা। বছরজুড়ে পুরানো হিসেব-নিকেশ চুকিয়ে নতুন খাতা খোলা। বিগত দিনের ধার-বাকি পরিশোধ দেয়ার রীতি আজো মহাউৎসাহে পালিত হয়। বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহলে এই রেওয়াজ আজো প্রচলিত। তবে হালখাতার অনুষ্ঠান ব্যবসায়ীরা সুবিধামত সময়েও করে থাকেন।
স্বাধীনতাপূর্ব চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বৈশাখের আগমনে বাজার থেকে একরঙ্গা পাতলা ছাপানো কার্ড খরিদ করে পাওনাদারের নাম ঠিকানা ও পাওনা কত তা উল্লেখ করে পাওনাদারের কাছে পৌঁছে দিতেন এবং বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দিতেন, যেন পুরানো হিসেব পরিশোধ করে মিষ্টিমুখ করে আসেন। পাওনাদার কার্ডের মূল্য দিতেন এবং উৎসবের দেনাপাওনা পরিশোধ করলেই ব্যবসায়ী খুশি হয়ে ঠোঙাভর্তি মতিচুরের লাড়– হাতে ধরিয়ে দিতেন। সে সময় মতিচুরের লাড়–র বাজারদর ছিল দেড় থেকে দুই টাকা সের। তখন কিন্তু কেজি বাটখারা বাজারে প্রচলন ছিল না।
স্বাধীনতাউত্তর বর্তমান সময়ে হালখাতা বা ব্যবসার লালখাতা হালনাগাদ করার রেওয়াজ, পদ্ধতি আধুনিক পর্যায়ে গেছে। যাদের ব্যবসা ঊর্ধ্বগামী তাদের হালখাতার ধরন-ধারণ বেশ চোখে পড়ার মতো। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা নিজ বাড়ির ছাদে সামিয়ানা টাঙিয়ে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে জাঁকজমকভাবে পাওনাদারদের বিরিয়ানি, পোলাও মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করেন। যাদের ব্যবসা আরো বড়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বা বাড়িতে জায়গা সংকুলান না হলে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। পুরানো হিসাব শেষে নতুন হিসাবের খাতা খোলা। ব্যবসায়ীর পাঠানো হরেক রকম চমকপ্রদ রঙ্গিন কার্ড পাওনাদার হাতে পেলেই কার্ডের মর্যাদা দেয় মর্যাদা সহকারে।
বৈশাখ উৎসবে বাঙালির ঘরে ঘরে তো বটে প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান পান্তা ও ইলিশ মাছের স্বাদ গ্রহণ করেন অত্যন্ত ঘটা করে। বর্তমান বাজারে চড়া দামে ইলিশ মাছ বিক্রি হয় যেটা অনেকের পক্ষেই ক্রয় করা সম্ভব হয় না। তাতে কিন্তু সামর্থ্যহীন ব্যক্তি বা সংগঠন দমে যান না। তারা পান্তা ভাতের সাথে সজিনার ডাঁটা ব্যবহার করে উৎসব পালন করেন। পান্তা ইলিশ অথবা পান্তা সজিনা যায় হোক তার সাথে অনেকেই কাঁচা মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ভর্তার স্বাদ গ্রহণ করেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে চিঁড়া, রসগোল্লা, দৈ, খই, বাতাসা, মুড়ি, গুড়ের ঝুড়ি, চিনির ঝুরি, লাড়–, খাজা ইত্যাদি দিয়ে শুভ হালখাতার মহরত করে থাকেন। পহেলা বৈশাখ বর্তমান সময়ে যে আনন্দঘন ও অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান হয় এটা কিন্তু অর্ধশতাব্দী আগে এমনতর ছিল না। আমি যখন ছোট তখন দেখতাম শুধুমাত্র কাপড় ব্যবসায়ী, জুতা ব্যবসায়ী, মুদি ব্যবসায়ী আর জুয়েলারি শপে নতুন খাতা খোলার প্রচলন ছিল। তবে তত ঘটা করে নয়। হিন্দু পরিবারগুলো শাঁখ বাজিয়ে দিনের সূচনা করতেন। বাড়িঘর পরিষ্কার করা, নদী পুকুরে স্নান করতে যেয়ে স্নান সেরে গলায় ভেজা কাপড় জড়িয়ে দুই হাত জোড় করে উঁচিয়ে ভগবানের উদ্দেশ্যে সামনের দিনগুলো যেন ভালো চলে তা কামনা করতেন। বাড়িতে বাড়িতে মন্ত্রপাঠ হতো।
আমাদের বাড়ির পাশে এক হিন্দু ভদ্রলোকের বাড়িতে দেখতাম বৈশাখের সকালে গৃহবধূ চকপাওডার গুলে নিয়ে ঘরের প্রবেশ পথে লক্ষ্মীদেবীর পায়ের পাতা আঁকতেন পাকা মেঝেতে এবং বাহির উঠানে নিপণ হাতে আঁকতেন বিভিন্ন প্রকারের আল্পনা। তারা নিজের মতো করে সাজতেন এবং ছেলেমেয়েদের সাজাতেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে পহেলা বৈশাখের কার্যক্রম আগের দিন চৈত্রসংক্রান্তি থেকেই শুরু হয়। পুরাতনকে বিদায় নতুনকে বরণ করতে শুকনো খাদ্য গ্রহণ করা, ছাতুয়াপরব, মন্ত্রপাঠ, ব্রাহ্মণ খাওয়ানো (সামর্থ্যবান পরিবারে)। বৈশাখের উৎসবে উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় আমের পল্লব, ঘট, খই, সুপারি, তিল, সিঁদুর, নাড়–, পান, কলা, পদ্মফুল এবং সামর্থ্যানুযায়ী হরেকরকমের মিষ্টান্ন দিয়ে আসন সাজানো হয়। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখ মাস অতীব পুণ্যের মাস। হিন্দু সম্প্রদায় অবশ্যই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ দিবসটিকে বরণ ও পূজনীয়জ্ঞান মনে করেন। এই একটি মাস তারা নিয়মিত ধর্ম আলোচনা, হরিনাম সংকীর্তন, যাগ-যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন এবং তাদের বিশ্বাস, এতেই মনে-প্রাণে প্রশান্তি আসে, ঈশ্বরের উপর শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠে।
অর্ধশতাব্দী আগেও মুসলিম সমাজে বৈশাখের তেমন প্রচলন ছিল না। মুসলমান সমাজ মনে করতেন এটা হিন্দুয়ানী প্রথা, হিন্দুদের নিজস্ব উৎসব, হিন্দুরাই একমাত্র একচ্ছত্র দাবিদার। মুসলমান ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা শুধুমাত্র লালখাতার স্বার্থে বাকি দেয়া অর্থ উঠানোর জন্য চিঠির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানাতেন। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসার ছাত্রদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করিয়ে ব্যবসার সফলতার জন্য দোয়া করাতেন। এই রেওয়াজটা আজো ধরে রেখেছেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বৈশাখ, বৈশাখী উৎসব, হালখাতা, লালখাতা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি, মেলা, শোভাযাত্রা সবকিছু বাঙালির নিজস্ব অনুষ্ঠান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন করাকে সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং উক্ত মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অধরা বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাসায় অনুষ্ঠিত ২৮ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পর্ষদ (Intergovernmental Committee For The Safeguarding of The Intangible Cultural Heritage) বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাবটি Nomination File no 01091 হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলা একাডেমি এই প্রস্তাবটি প্রণয়ন করে। পরবর্তীকালে ইউনেস্কোর চাহিদা অনুযায়ী এই প্রস্তাবনাকে গ্রহণযোগ্যরূপে পুনঃপ্রণয়ন করা হয়। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শহিদুল ইসলাম এই প্রণীত প্রস্তাবনাটি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পুনরায় ইউনেস্কোর নিকট দাখিল করেন।
২০০৫-২০০৬ অর্থবৎসরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি তালিকা প্রণয়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং এশিয়াটিক সোসাইটিকে এর দায়িত্ব দেয়া হয়। ১২ খ-ে প্রকাশিত এই তালিকা তথা সমীক্ষা প্রতিবেদনের ১১শ খ-ে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। এরই ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সর্বপ্রথম ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কোর প্যারিসে অবস্থিত সদর দপ্তরে আবেদন করেছিল যে, পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হউক। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শান্তি, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বৎসরের প্রথম দিনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে অপশক্তির অবসান এবং বাংলাদেশের মানুষ কল্যাণময় ভবিষ্যতের আশা ব্যক্ত করে চলেছে।
বর্তমানে বৈশাখ উৎসব সবার- সকল বাংলা ভাষাভাষীর। মুসলমানের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ, হিন্দুর প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন পূজাপার্বণ, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব যিশুর জন্মোৎসবসহ ক্রিসমাস ডে, ইস্টার সানডে প্রভৃতি; কিন্তু বাংলা ভাষাভাষীর প্রধান উৎসব বংলা নববর্ষ উদযাপন যা দলমত নির্বিশেষে সকল বাঙালি উৎসবে মুখর হয়। এই উৎসব বাঙালির কাছে অতি প্রিয়। একটানা নয় মাস যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল যে নরপশুদের পরাস্ত করে সেই নরপশুরাই বাঙালি উৎসবকে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল বিগত বছরগুলোতে।
আমরা বাঙালি, বাংলাদেশ বাঙালির, বাংলা নববর্ষ বাঙালির, উৎসব করবে বাঙালি এবং এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, ভালোবাসা গড়ে উঠবে সবার মাঝে, অতীতের সমস্ত জরা জীর্ণতা ও সংকীর্ণতা পরিত্যাগ করে। আর উদার মন নিয়ে নতুনকে গ্রহণ করতে হবে ভেতরের সব গ্লানি মুছে একে অপরকে আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে।

গোলাম রাব্বানী তোতা : লেখক ও সম্পাদক