নাচোলের পহেলা বৈশাখ

মো. মজিদুল ইসলাম

কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী, কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সমস্ত মনুষত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।
আজ বাংলা নববর্ষের উৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণে তাই আমরা সমস্ত বাঙালি, সমস্ত নাচোলবাসী বৃহৎ, মহৎ। জীবনের একপর্যায় থেকে অন্যপর্যায়ে উত্তরণের সঙ্গেই নববর্ষের উৎসব জড়িত। এই দিন মনে হয় নাচোল যেন কোনো এক দাগহীন কুমারীর মতো কারুময় ঘুম থেকে সদ্য জেগে ওঠা নারী। বর্ষবরণের নাচোলের ইতিহাসে প্রথম নববর্ষ উদযাপনের খবর পাওয়া যায় স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালে কতিপয় শিক্ষানুরাগী সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি আলোকিত নাচোলের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁদের অনেকেই আজ পরোলোকগামী। তাঁরাই সর্বপ্রথম ‘নাচোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মো. ফরহাদ হোসেন (মাস্টার), আপেল আব্দুল্লাহ, মোজাম্মেল হক (মন্টু) মাস্টার, আজিজুল হক, সীতারাম প্রামানিক, অশোক কুমার ভট্টাচার্য, সেরাজুল হক, বিপদ ভঞ্জন, আলাউদ্দিন বটু, মোজাহার আলী, গিয়াস উদ্দীন, রিয়াজ উদ্দীন, মো. আলাউদ্দীন (হাঁকরইল), সবুজ কুমার ভট্টাচার্য, মুখলেসুর রহমান, সুফল চন্দ্র, আরো অনেকে। এই বিদ্যানুরাগীগণ তৎকালীন নাচোল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (বর্তমানে নাচোল ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) প্রাঙ্গণে ১৯৭২ সালে সর্বপ্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন।
অনুষ্ঠানমালায় ছিল শিশুদের নাচ, কবিতা আবৃত্তি, গান ইত্যাদি। নাচোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর এ তৎপরতা ১৯৮০ সাল অবধি অব্যাহত ছিল। তবে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানটি সংঘটিত হয় নাচোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর আয়োজনে, ১৯৭৮ সালে। এ আয়োজনের পুরো ভাগে ছিলেন নাচোল কলেজের প্রয়াত অধ্যক্ষ ম. আ. মালেক চৌধুরী। বর্ষবরণের দিন নাচোল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর প্রান্তে মঞ্চ করে টিকিটের বিনিময়ে রেডিও টেলিভিশনের শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়। বিপত্তি হয়ে দাঁড়াল কালবৈশাখী। সন্ধ্যাবেলা প্রচ- ঝড়ে মঞ্চ ভেঙে পড়ে। এতে আয়োজকবৃন্দ দমে যাননি। রাত ৯টায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। প্রথিতযশা শিল্পী আব্দুল জব্বার ও এন্ড্রু কিশোর হাজার হাজার দর্শককে সঙ্গীতের মূর্ছনায় মাতিয়ে তোলেন। ১৯৮৫ সালে নিউমার্কেট নির্মাণের কারণে নাচোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ঘর ভেঙে দিলে গোষ্ঠীর কার্যক্রম একরকম বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত নাচোল কলেজ (বর্তমানে নাচোল সরকারি কলেজ) পহেলা বৈশাখ উদযাপনে তৎপর ছিল। নাচোল কলেজের শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। ১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদ গঠিত হলে নাচোলের ইতিহাসে সর্বপ্রথম উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে বর্ষবরণের র‌্যালির আয়োজন করা হয়। ১৯৮৮ সালে নাচোল কলেজ মাঠে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় স্মরণকালের সবচেয়ে বৃহৎ সার্র্কাস। যা অত্যন্ত দর্শকনন্দিত হয়েছিল এবং প্রচুর দর্শক সমাগম হয়েছিল।
নব্বয়ের দশকে বৈশাখের আয়োজনে আসে নতুন মাত্রা। ১৯৯২ সাল হতে সাধারণ পাঠাগারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সুর সংগীত একাডেমি বর্ষবরণে ভিন্নতা আনে। আবৃত্তি, গান, নৃত্যের সাথে যুক্ত হয় গম্ভীরা। সংগঠনের সদস্যবৃন্দের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক রিয়াদ ফারুক, সাংবাদিক আব্দুস সাত্তার, অধ্যাপক আল্লামা আকবর, প্রভাষক আব্দুস সামাদ, আলাউদ্দিন (বটু), প্রভাষক আলাউদ্দিন, ইউসুফ আজাদ, সীতারাম প্রামানিক, কুতুবুল আলম প্রমুখ।
নাচোলে নববর্ষ উৎসব ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করে ‘আমরা ক’জন’ এবং ‘বন্ধন’ নামে দুটি স্বেচ্ছসেবক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। আজ নাচোলকে যে বিস্ময়-বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছি তার সূত্রপাত হয় কতিপয় জ্ঞানপিপাসু মানবিক গুণের অধিকারী ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছেন আমরা ক’জনের অধ্যক্ষ মো. ওবাইদুর রহমান, আসগার আলী, প্রভাষক নূর কামাল, আনেয়ারুল ইসলাম, সারোয়ার জাহান বাবুল, শিক্ষক সাদিকুল ইসলাম, শিক্ষক বদিরুল ইসলাম, সারিফুল ইসলাম, ফারুক ভূঁইয়া, তৌহিদ আলম, গোলাম কিবরিয়া সিটু, রফিকুল ইসলাম জেন্টু, সামরিক কর্মকর্তা আবুল ফজল সানাউল্লাহ, প্রভাষক আব্দুল মালেক, রবিউল ইসলাম, বাজলুর রহমান, মেয়র আব্দুর রশিদ (ঝালু খান), স্বপন কুমার সাহা, ওবাইদুল হক কালু, মশিবুর রহমান, আ. মান্নান লুটু, বদিউজ্জামান লালি, প্রবাসী শাহ আলম, মো. বদরুদ্দোজা, শাহজাহান সিরাজ টুকু, মো. শুকুর আলী। বন্ধনের অন্যতমদের মধ্যে রয়েছেন- প্রভাষক আলাউদ্দিন, বদরুজ্জামান, সহকারী অধ্যাপক আব্দুল হাকিম, সহকারী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির আজম, নিয়াজ মুর্শেদ, আ. আওয়াল, নুরুল হাবিব মেরাজ, প্রয়াত মোয়াজ্জেম, প্রভাষক দুরুল হোদাসহ প্রধান শিক্ষক তৌফিক আহম্মেদ, আব্দুল কাদের জিলানী, বাবু, প্রয়াত মিজানুর রহমান এবং আরো অনেকে।
২০০১ সালে আমরা ক’জন এবং বন্ধন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব আতোয়ার রহমানের সহযোগিতায় উপজেলা পরিষদ মাঠ প্রাঙ্গণে নাচোলে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। সে বছরের সফলতার ২০০২ সালে আবারো বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়; যা অত্যন্ত দর্শকনন্দিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে বন্ধু সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী নামক আরো একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মেলার আয়োজন করে। তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। সংগঠনের অন্যতম সদস্য ছিলেন- শিক্ষক সাদ মনি, সাবেক পৌর প্রশাসক কামরুজ্জামান, শফিকুল, দুলু, এ কে জোহা পলাশ প্রমুখ। পরবর্তীতে বৈশাখী মেলা আয়োজন সম্ভপর হয়ে উঠেনি। ২০০৫ সালে ব্র্যাক গাড়িতে বউ সাজিয়ে বাজার প্রদক্ষিণ করে বর্ষবরণ করে। ২০০৬ সালে সান ডায়াল কোচিং সেন্টারের উদ্যোগে বৈশাখী র‌্যালির আয়োজন করা হয়। ২০০৭ সালে পাঠশালা কোচিং সেন্টার আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে পান্তা খাওয়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বৈশাখী পালন করে। ইলা মিত্র স্মৃতি সংসদ ২০০৯ সালে হাঁড়ি ভাঙ্গা, দই খাওয়া, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে আমানুল্লাহ আল মাসুদের সহযোগিতায় পল্লী জননী সংঘ, ২০০৩ সালে মেধাবী তরুণদের নিয়ে গঠিত ইংলিশ লারনার্স সোসাইটি, জবাবদিহি নাট্যগোষ্ঠী পহেলা বৈশাখে নানামুখী অনুষ্ঠান, সমাজসেবামূলক কাজ করে আসছে।
গ্রামপর্যায়ে মুর্শিদা, হাঁকরইল, মাক্তাপুর, আজিপুর, রাইসমিল পাড়া ইত্যাদি গ্রামে বিবাহিত-অবিবাহিত খেলার আয়োজন করা হয় পহেলা বৈশাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে নাচোল সরকারি কলেজ, ২০০৩ সালে থেকে নাচোল মহিলা ডিগ্রি কলেজ, ২০০৯ সাল হতে নাচোল খুরশেদ মোল্লা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ২০১২ সাল হতে নাচোল উপজেলা স্কুল এবং পাঠশালা স্কুল অ্যান্ড কলেজ বর্ণাঢ্য আয়োজনে আড়ম্বরপূর্ণ পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে আসছে।
আজ বিস্ময়ের ঘোর কিছুতেই কাটতে চায় না নাচোলের বর্ষবরণের ব্যাপকতা এবং আয়োজন দেখে। এ বৈশাখে নাচোল আবারো সাজবে গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, বৌ নিয়ে পালকি, বর্ণাঢ্য র‌্যালিসহ হাজারো রঙে। পরিশেষে কবিগুরুর ভাষায় বলি-
বাসি পচা সব কিছু পুড়ে হোক ছাই
অসভ্য সভ্যতা, যত হোক না বিলীন
এটাই প্রার্থনা আজ, আর কিছু নয়।

মো. মজিদুল ইসলাম : সহকারী শিক্ষক, নাচোল উপজেলা স্কুল