নববর্ষের ভাবনা

কনকরঞ্জন দাস

সব শুরুরই শেষ আছে, সব শেষেরই শুরু। বর্ষচক্রের পরিক্রমায় আবার পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন। গানে, কবিতায়, আলোচনায়, মেলায় নানা বর্ণের ব্যঞ্জনে আর নানা স্বাদের মিষ্টির হালখাতায় বৈশাখের বরণডালা সাজানোর আয়োজন। সব বাঙালির সাজ সাজ রব।
বাঙালি জাতির প্রাচীন সংস্কৃতির দর্পণ পহেলা বৈশাখ। এই দর্পণে প্রতিফলিত হয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সত্তা। বাংলা নববর্ষ মহাআড়ম্বরে উদযাপনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় সব বাঙালির মিলনমেলায় অংশগ্রহণের একাত্মতা। এই নববর্ষের কথা আসলেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয় সনজীদা খাতুন, ছায়ানট আর রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ পালনের অবিস্মরণীয় স্মৃতির কথা। সনজীদা খাতুনই সব বাঙালির হৃদয়ে-মননে চারিয়ে দিয়েছেন পহেলা বৈশাখ আর নববর্ষের আত্মিক-ঐতিহ্য।
বাংলা নববর্ষের ইতিহাসের সাথে ফতেউল্লাহ সিরাজি আর স¤্রাট আকবরের নাম জড়িয়ে আছে। স¤্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন ১৫৫৫ সালের ১০ মার্চ, কিন্তু যেটা কার্যকর হয় ১৫৫৬ সালের ১৬ মার্চ তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে। বাংলা সনের ভিত্তি হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন। বাংলা সনের শুরুর সাথে কৃষকের খাজনা আদায়ের বিষয়টিও জড়িত। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে জড়িয়ে আছে নানা অনুষঙ্গ- যার কিছু বিলুপ্ত। যেমন জমিদারি প্রথা চালু থাকার সময় চালু ছিল পুণ্যাহ। হালখাতা এখনো তার ঐতিহ্য নিয়ে মহাসমারোহে অটুট। ব্যবসায়ী মহলে জাঁকজমকভাবেই পালন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা পুরানো দিনের সব হিসেব-নিকেশ চুকিয়ে নতুন লাল খাতায় চালু করে নতুন দিনের হিসেব-নিকেশ। এই লাল খাতাকে ব্যবসায়ীরা আবার খেরো খাতাও বলে। এই দিনে দোকানপাট ধুয়েমুছে নানা বর্ণে ও রঙে দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হয়। ক্রেতাদের নানা জাতের সুস্বাদু মিষ্টি দোকানে বসিয়ে খাওয়ানো হয়, আবার মিষ্টির প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। শুধু দোকানে নয়, বাড়িতেও আয়োজন করা হয় নানা জাতের সুস্বাদু সব ব্যঞ্জন- আর মিষ্টির বাহার। কোথাও কোথাও চলে ঘুড়ি উড়ানো, নানা জাতের সব লোকখেলা আর লোকমেলা। মাটির তৈরি নানা রঙের হাঁড়িপাতিল, পুতুল। জমে উঠে পহেলা বৈশাখ। নতুন নতুন জামাকাপড় তো আছেই। সরকারি বেসরকারিভাবে চলে অনুষ্ঠান। ভোরের শুরুতেই শুরু হয় নান্দনিক মঙ্গল শোভাযাত্রা। সব গ্লানি, পুরান জীর্ণ-দীর্নতাকে ধুয়েমুছে শুরু হয় বৈশাখ বরণ। এখানে ওখানে চারিদিক থেকে মধুর সুরে ভেসে আসে “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।” এ সুর একেবারে কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে নতুন দিনের ভোরে নতুন সাজে নতুন করে চলার অদম্য প্রেরণায় উৎসাহিত হয়। এ এক অসাধারণ আনন্দানুভূতি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকেই শুরু হয়েছিল মঙ্গলমেলা। এই মেলা এখন দেশের সর্বত্র। অসাম্প্রদায়িক এই মিলনমেলায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে পরস্পরের সাথে মিলিত হয়। প্রাত্যহিক জীবনের দৈনন্দিন জীর্ণতাকে জয় করে আনন্দের মিলনমেলায় নেচে গেয়ে দেখেশুনে সারাবেলা কাটিয়ে আনন্দের রেশ নিয়ে ঘরে ফেরে।
আইয়ুবের স্বৈরাচারী আমলে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হেনে রবীন্দ্রসঙ্গীত বন্ধের ঘৃণ্য পাঁয়তারা শুরু হয়। আর তখনই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্য ছায়ানট পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালন উপলক্ষে রমনার বটমূলে আয়োজন করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এ ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। ছায়ানটের এই প্রশংসিত প্রচেষ্টা ক্রমেই দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং স্বাধিকার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণীর শোষণের প্রতিবাদে ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থেই একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠান বাংলা নববর্ষ। গ্রামবাংলার তৃণমূল থেকে ছোটবড় সবাই শহরের সব পর্যায়েই বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখের উৎসব পালন করে থাকে। নববর্ষের এই উৎসব বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করে। সাম্প্রদায়িক হীনমন্যতা ও ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলিত হয় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আনন্দের মিলনমেলায়। নতুন প্রজন্মও এই উৎসব থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়। এই উৎসব বাঙালির এক ঐতিহ্য ও গৌরবের চেতনায় উদ্দীপ্ত। অতীতের সব গ্লানি ধুয়ে মুছে এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের মননে ও জীবনচর্চার প্রতি পদক্ষেপে জেগে থাকুক এক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ পরিশীলিত সংস্কৃতিবোধ।