হালখাতার সেকাল একাল

পুরানো দিনের স্মৃতিকথা আলোচনায় আসলেই শাহ আব্দুল করিমের সেই বহুলগীত গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ এর সুললিত সুরটি মনের ভিতরে পরিতৃপ্ত স্রোতধারায় বইতে শুরু করে। সাংবাদিক বন্ধু আজিজুর রহমান শিশির মুঠোফোনে কুশল জানিয়ে পহেলা বৈশাখের কথা মনে করিয়ে দিল। সাথে সাথে আহ্বান জানাল বিগত দিনগুলোতে হালখাতা উৎসব নিয়ে একটা লেখা তৈরি করার জন্য। অমনি স্মৃতির ক্যানভাসে সুখের পরশম-িত সেই দিনগুলি এক এক করে ভেসে উঠতে লাগল। অন্তরে তখনও বেজে চলেছে সেই স্মৃতিময় গান, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক খ্রিষ্টীয় ১৫৮৪ সাল থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। তখন জমির খাজনা নেয়ার সাথে ফসল কাটার সময়ের সঙ্গতি রেখে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। কৃষক ফসল ঘরে তুলে জোদ্দারকে ফসল দেয়। জোদ্দার তথা প্রজা সেই থেকে খাজনা দেয় জমিদারকে। জমিদার তার খাজনা পৌঁছায় সম্রাটকে। এই খাজনা প্রদানের সাথে সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও প্রবর্তিত হয় হালখাতার।
আমাদের এই অঞ্চলে চৈত্রের দিন শেষে হতে না হতেই পহেলা বৈশাখ আর তার সাথে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আয়-ব্যয়ের যে হিসাব সংরক্ষিত হয় তা নতুন বছরে নতুন হিসাবের খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়। পুরানো খাতার বাকি-বকেয়া নতুন খাতায় লেখা হয়। ব্যবসায়ী তার সকল গ্রাহককে হালখাতা উপলক্ষে দাওয়াত দিয়ে থাকে। ষাটের দশকে শহর ছাড়া ছাপাখানার তেমন চল ছিল না। তাই তখন হালখাতার চিঠি হাতে লেখা হতো, লাল কালি দিয়ে। হালখাতার সম্মানে এবং গ্রাহককে সম্মান প্রদর্শনের জন্য লাল কালি ব্যবহার করা হতো। দোকানপাট সাধারণত তখন ছিল খড়ের চালা নির্মিত। সেটাকেই ধোয়ামোছা হতো। খড়িমাটি দিয়ে মেঝেতে আল্পনা আঁকা হতো। হিন্দু সম্প্রদায় তাদের দোকানে সুতোয় আমপাতা গেঁথে দোকানের চারিদিকে সাজিয়ে রাখত। রঙিন কাগজ কেটেও ঝালোর দিয়ে সাজানো হতো। হালখাতার দিন দোকানি গরদের পাঞ্জাবি পরে, কেউবা মটকা-গরদের ধুতি পরে দোকানে বসত। সন্ধ্যেয় ধূপের ধোঁয়া দেয়া হতো। আমন্ত্রিতরা আসতেন নতুন কাপড়চোপড় পরিধান করে। দু-একজন আসতেন তাদের শিশুসন্তানদের হাত ধরে। সামর্থ্য অনুসারে ৫ টাকা-দশ টাকা, একান্ত নিরুপায় খদ্দের দু-এক টাকা দিয়ে হলেও নতুন খাতায় তাদের নাম লেখাতেন, ধার পরিশোধ করতেন। এরপর খদ্দেরকে আপ্যায়ন করা হতো মিষ্টি দিয়ে। মিষ্টির মধ্যে সাধারণত থাকত কচুরি-বুঁদিয়া, ডালপুরি-রসগোল্লা, মিহিদানা, ছানার পোলাও, অমৃতি, মালপোয়া, রাজভোগ। মিষ্টি পরিবেশন করা হতো পদ্মপাতায়। পদ্মপাতায় তখন খাবার পরিবেশন করা ছিল সম্মান ও আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশনা। বিদায়ের সময় পরিবারের সদস্যদের সামান্য কিছু হলেও ঐ পদ্মপাতায় বেঁধে দেয়া হতো। দোকানের হালখাতা ছাড়াও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে হিন্দু বাড়িতে দাওয়াত দেয়া হতো। খাবার দেয়া হতো গরম লুচি-আলুর দম আর বিভিন্ন পদের মিষ্টান্ন। সে দম তৈরি হতো একই সাইজের মাঝারি গোল আলু ছিলে গোটা করে মেথি-সম্বোরাসহ পাঁচ মশলা দিয়ে মাখো মাখো ঝোলসহ সামান্য গাওয়া ঘি দিয়ে রান্না হতো। সাথে থাকত কচি কড়ালি আমের টক, সজনে ডাঁটা, পটল ভাজা।
মুসলমান দোকানেও অল্পবিস্তর হালখাতার আয়োজন হতো। অতিথিদের খাওয়ার জায়গাটিকে লালসালু কাপড় দিয়ে ঘেরা হতো, মাথার উপর লালসালুর চাঁদোয়া টানানো হতো। তখনকার কালে ডেকোরেটর ছিল না ফলে খাওয়ার জায়গায় যৎসামান্য লালসালু বা শাড়ি কাপড় দিয়ে ঘেরা হতো। পুরো জায়গাটি আগরবাতির সুগন্ধে ভরপুর হয়ে থাকত।
মুসলিম পরিবারে পহেলা বৈশাখে মাংস-পোলাও, পায়েস রান্না হতো, তবে এর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম, হাতেগোনা। এ সকল খাবার-দাবারের সাথে ইলিশ মাছ আর পান্তা খাওয়ার এখনকার যে প্রকোপ তা কখনও দেখা যেত না। এই সংস্কৃতি কোথা থেকে যে এসে বাঙালির কাঁধে জেঁকে বসল তা বলা মুশকিল। এতে আবার ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোও আরো হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বাজারে ইলিশের কী পরিমাণ সরবরাহ, কী দর, কে কতটি ইলিশ কিনেছেন, কোন মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণী শত ইচ্ছা থাকলেও অতিমূল্যের জন্য কিনতে পারছেন না তার মনোকষ্টকে ফেনিয়ে পরিবেশন করা। এই সকল মিলে পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতি বাঙালি সংস্কৃতি নামে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলেছে। তবে খুব সম্প্রতিকালে মিডিয়া আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন আবার বলা শুরু করেছে, এই পান্তা-ইলিশ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ কখনই ছিল না। এইভাবে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি এখনও অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন। তা না হলে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে যা হচ্ছে তা নিয়ে অনেক সমাজ বিশ্লেষকগণ কথা তুলেছেন, বিতর্ক করছেন, মিডিয়ায় তুলে ধরছেন তাঁদের সমাজ সংস্কারের মতবাদ; কিন্তু সহজে সমাধান হচ্ছে না। কথা উঠেছে শোভাযাত্রায় মুখোশের ব্যবহার নিয়ে, এটা নাকি এসেছে গ্রিক সভ্যতা থেকে। কথা উঠেছে মুসলমান ছেলেদের দলবেঁধে ধুতি পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে ঢাক বাজিয়ে নাচ প্রদর্শন করা (ঢাক হিন্দু সমাজে পূজা পার্বণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে)। বাঙালি সংস্কৃতি আর হিন্দু সমাজের পূজা পার্বণের অনুষঙ্গকে গুলিয়ে ফেললে নতুন প্রজন্ম বিপাকে পড়ে যাবে।
হালখাতার একটি বিশেষ অনুষঙ্গ হচ্ছে খেরোখাতা। লালসালু দ্বারা মোড়ানো মলাটে হিসাবের খাতাই হচ্ছে খেরোখাতা। এই খাতায় সারা বছর ব্যবসার হিসাব লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। সাধারণত হিসাব লেখার জন্য দুটি খাতা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একটি প্রতিদিনের আয়-ব্যয় লেখার জন্য, যাকে ‘খসড়া খাতা’ বলা হয়। এটির পরিমাপ ৯ ইঞ্চি x ৭ ইঞ্চি। অপরটি ‘খতিয়ান খাতা’, এর পরিমাপ ৯ ইঞ্চি x ২৮ ইঞ্চি। এই খাতায় ব্যবসা পরিচালনার একেকটি বিষয়ে খরচের জন্য একেকটি পাতা নির্ধারিত থাকে। অপরপক্ষে প্রতিটি গ্রাহকের জন্য একেকটি পাতা বরাদ্দ থাকে, যাতে তাদের সারা বছরের নগদ ও ধারের পরিমাণ লিপিবদ্ধ থাকে।
ফিরে আসি হালখাতা প্রসঙ্গে। এখনও সেই হালখাতা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিদ্যমান আছে। মিষ্টি ব্যবসায়ী ছাড়াও হালখাতা অনুষ্ঠান হচ্ছে কাপড়ের দোকান, গার্মেন্টস, বিভিন্ন ফলের আড়ৎ, পিঁয়াজের আড়ৎ, এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ব্যবসা, কীটনাশক ব্যবসা। এই কীটনাশক ব্যবসায়ীরা আম ব্যবসায়ীদের সারা মওসুমের কীটনাশক সরবরাহ করে থাকে প্রায় পুরোটায় ধারে। যা পরিশোধ করা হয় বাগান বা আম বিক্রির পরে, জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ থেকে আষাঢ় মাসের শেষ পর্যন্ত সময়ে। তো এই সকল ব্যবসায়ীরা হালখাতা অনুষ্ঠান করে খুব আড়ম্বরের সাথে। বিয়ে অনুষ্ঠানের মতো করে ডেকোরেটর দিয়ে প্যান্ডেল তৈরি করে। সারিবদ্ধ চেয়ার টেবিল সাজায়। প্যান্ডেলে বড় বক্স স্পিকারে ধামাকা গান বাজে। খাবার পরিবেশন করে পোলাও, খাসির মাংস, টিকিয়া, গোটা ডাল, দই, স্প্রাইট-সেভেনআপ ইত্যাদি। সে এক বিশাল ভুরিভোজের আয়োজন। হালখাতায় সংগৃহীত হয় লক্ষ লক্ষ টাকা। সেদিক থেকে এই আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন মানানসই। কিন্তু সেদিনের সেই হালখাতার মিষ্টান্ন পরিবেশনার সাথে সাথে আন্তরিকতা বিনিময়, গ্রাহক এবং ব্যবসায়ীর মধ্যে যে সারা বছরের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সেতুবন্ধন তার কতটুকু আজকের আড়ম্বরতার সাথে আপেক্ষিকতার সূত্রে মিল পাওয়া যায়। এই আড়ম্বরের সাথে আরো একটি বিষয় আছে যা না লেখা হলেই ভালো হতো। কিন্তু এর অপূর্ণতাকে কোনোভাবেই পূর্ণতা প্রদান করা সম্ভব হতো না যদি না লেখা হয়। এখনকার হালখাতা কার্ড ছাপানো হয় সুদৃশ্য কাগজে স্ক্রিন প্রিন্ট করে সাথে যে এনভেলপে কার্ড দেয়া হয় তাও অতি চমৎকারভাবে ছাপানো হয় এবং তার উপরে গ্রাহক বা খদ্দেরের নামাঙ্কন করা হয়। এখানেও পুরোপুরি আড়ন্বর। তবে দাওয়াতপত্রের ভেতরে এক কোণায় লেখা হয় ‘আপনার পাওনা’ এত এত টাকা। এখানে এসেই দোকানির পাল্লায় বিক্রি হয়ে যায় খদ্দেরের জন্য সকল আড়ন্বর ও ভালোবাসা। দোকানি যখন গুণে নেয় তার পাওনা কচ্কচে টাকা, তখন দোকানির চোখে ভালোবাসার বদলে দৃশ্যমান হয় এক শীতল কচ্কচানি আর খদ্দেরের চোখ হালকা বাষ্পীয় জলে চক্চক্ করে উঠে। না কোনো শব্দ বিনিময় হয় না, সম্মানিত গ্রাহক দাওয়াত খেয়ে যখন বাড়িমুখো হয় তখন হালখাতার প্যান্ডেলে গান বাজতে থাকে, ‘ঢাকের তালে কোমর দোলে, খুশিতে নাচে মন…’। আর গ্রাহকের মনে তখন অনুরণিত হয় অন্য সুর, ‘এই করেছো ভালো নিঠুর হে, এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো।’