‘আল্পনা’ গ্রামের দেখন বর্মন ৩৮ বছর ধরে মনের আল্পনায় সাজিয়ে তুলছেন বাড়ি

সাজিদ তৌহিদ
টিকইল নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। উপজেলা সদর থেকে গ্রামটির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। নাচোল-আমনুরা সড়কের নেজামপুর বাজার থেকে সোজা পূর্বে হাটবাকইল হয়ে যেতে হয় গ্রামটিতে। একসময় প্রত্যন্ত হলেও এখন টিকইল গ্রামকে তা আর বলার সুযোগ নেই। পাকা রাস্তা হয়েছে, ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে। গ্রামটিতে ৮০-৯০টি পরিবারের বসবাস; যার বেশিরভাগই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। টিকইল গ্রামটি এখন ‘আল্পনা’ গ্রাম নামে পরিচিতি। বেশির ভাগ বাড়িতেই আল্পনার কারুকর্য চোখে পড়বে। গ্রামের আল্পনা দেখতে দেশের মানুষ ছাড়াও বিদেশীরাও আসছেন। টিকইলের পরিচিতি যাকে কেন্দ্র করে তিনি ওই গ্রামেরই সামান্য একজন গৃহবধূ দেখন বর্মন; যার আল্পনার কথা দেশের গ-ি ছাড়িয়ে গেছে।

নেজামপুর ইউনিয়নের কামারজগদইল গ্রামের ভজনের মেয়ে দেখনের বিয়ে হয় টিকইল গ্রামের দাসু বর্মনের সাথে। বিয়ের পরপরই শ্বশুরবাড়িতে এসে শুরু হয় দেখন বর্মনের আল্পনা আঁকা। ৩৮ বছর ধরে তার পুরো মাটির বাড়িতে আল্পনা এঁকে আসছেন তিনি। সারা বছরই শোভা পায় তার আল্পনা। প্রত্যেক বছরই নতুন নতুন আল্পনায় সাজিয়ে তোলেন তার বাড়ি। প্রথম দিকে নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা নিয়ে আল্পনা আঁকলেও এখন আর তা নেই। মনের ভেতর আঁকা আল্পনা আঁকতে শুরু করেন মাটির দেয়ালে। আল্পনাতে স্থান পায় পশুপাখি, নদী, নৌকা, গাছপালা, ফুল, লতাপাতা, প্রভৃতি। আল্পনার রঙ হিসেবে ব্যবহার করেন গুঁড়া রঙকে। ব্যবহার করেন এক প্রকার আঠা। সংসারের কাজের ফাঁকে পুরো বাড়ি আল্পনাতে ভরিয়ে তুলতে প্রথম দিকে ৮-১৫ দিন সময় নিলেও এখন বয়সের কারণে ৫০-৬০ দিন সময় লেগে যায়। দেখন বর্মনের আল্পনার কাজে তার মেয়ে ছাড়াও বর্তমানে নাতনিরা সহযোগিতা করে। আর এ কাজে বরাবরই উৎসাহ যুগিয়ে এসেছেন স্বামী দাসু বর্মন।

বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহাসিক জনপদ নাচোলে একসময় মাটির বাড়ির চল ছিল বেশি। বসবাসও ছিল হিন্দু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের। তারা প্রত্যেকেই তাদের ঘরবাড়ি পরিপাটি করে রাখতেন লেপার মাধ্যমে। এখনো কিছু কিছু দোতলা বাড়ি চোখে পড়ে। তবে কালের বির্বতনে তা হারাতে বসলেও দেখন বর্মনের মাটির বাড়ি যেন সেই ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। টিকইল গ্রামের যে কাউকে ‘সাজানো বাড়ি কোনটি’ জিজ্ঞেস করলেই অনায়াসেই দেখিয়ে দেয় দেখন বর্মনের বাড়ি। কমবেশ বাড়িটির প্রস্থ ২৫-৩০ এবং দৈর্ঘ্য ৪০-৪৫ ফুট। এর মধ্যে দুটি ঘর, বারান্দায় চালা নামিয়ে রান্নাঘর, গোয়ালঘর। ঘরের ভেতর বাদে দেয়ালের পুরো অংশ জুড়েই আল্পনা। বাদ যায়নি গোয়ালঘরের দেয়ালও। পরিপাটি পরিচ্ছন্ন একটি সাজানো বাড়ি। সৌন্দর্য্যরে এক অপরূপ সমাহার। দেখলেই যে কারোর মন জুড়িয়ে যাবার কথা।

দেখনের আল্পনা দেখে ধীরে ধীরে আশপাশের অনেক গৃহবধূই তাদের বাড়িতে আল্পনা আঁকতে শুরু করেন। এখন প্রায় সব বাড়িই আল্পনা দিয়ে সাজানো হয়। এ কারণেই টিকইল গ্রামটি এখন ‘আল্পনা গ্রাম’ নামে পরিচিত। দেখন বর্মনের আল্পনা দিয়ে সাজানো বাড়িকে অনেকেই বৈশাখের উৎসবের অংশ হিসেবে ভেবে থাকেন। কিন্তু তার মুখ থেকেই জানা গেল ভিন্ন কথা। স্থানীয় মন্দিরে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ২২ তারিখ থেকে দুদিনব্যাপী হরিরামবাসর যজ্ঞের আয়োজন হয়। সে যজ্ঞকে কেন্দ্র করেই দেখন বর্মন তার বাড়িটি আল্পনা দিয়ে সাজিয়ে তুলেন। তবে এবারে বাইরের বারান্দার একাংশ বৈশাখকে কেন্দ্র করে আল্পনা দিয়ে সাজিয়েছেন এক কোম্পানির প্রতিনিধির অনুরোধে।

দেখন বর্মনের প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যার জোর নেই, তবে মনের জোর অদম্য; যা তার সঙ্গে কথা বললেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। পঞ্চাশোর্ধ্ব দেখনের তিন মেয়ে অনিতা, বনিতা ও ববিতা। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। বড় মেয়েটি পাশেই থাকে। তার বাড়িও আল্পনায় ভরা। মেজমেয়ে বনিতা, স্বামী পরিত্যক্তা। এক মেয়ে নিয়ে মা-বাবার কাছেই থাকেন তিনি। চাকরি করেন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির নেজামপুর শাখায়, স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে। দেখনের স্বামী দাসু বর্মন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন চোখের জোর কমে যাওয়ায় কাজকর্ম করতে পারেন না। বাড়িতে গবাদিপশু পালন আর বনিতার আয় দিয়েই চলে সংসার।

দেখন বর্মনের চলনে-বলনে, কথাবার্তায় দরিদ্রতা বোঝার উপায় নেই। আল্পনা আঁকতেও কত টাকা গেল সে হিসেবও করেন না তিনি। বাড়িতে বেশির ভাগ সময় নিরামিষ খাওয়া হয়। মাংস বলতে হাঁস আর কবুতর ছাড়া অন্যগুলো উঠে না। তার বক্তব্য, ‘শাড়িটা ক’দিনের জন্য পরা। দামি কিনে লাভ কি? কিন্তু বাড়িটা সাজালে মানুষ দেখবে। এই যে এখন এত মানুষ প্রায় প্রতিদিনই আসছে আমার আল্পনা দেখতে, এতেই শান্তি, এতেই সুখ।’ মানুষের পদচারণায় প্রথম দিকে বিরক্ত লাগলেও, এখন ভালোই লাগে বলে তার সহজ সরল স্বীকারোক্তি। দেখন বর্মন জানালেন, অনেক মানুষই আসে। সবারই নাম মনে রাখতে পারেন না। এজন্য ২০১৬ সাল থেকে একটি খাতা রেখে দিয়েছেন। যারা আসেন, তারা সেখানে কিছু লিখেন।

প্রশংসা পেলেও আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি পান নি দেখন বর্মন। বয়সের কারণে তারও চোখের জোর কমে এসেছে। আল্পনা আঁকার ইতিহাস জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যখন আসি তখন এখানে খুব একটা ফসল হতো না। মাটিও সাদা। আমার শাশুড়িরা সাদা মাটি দিয়ে ঘরবাড়ি লেপতেন। একদিন আমার ইচ্ছে হলো বাড়িতে আল্পনা আঁকার। সাদা মাটি এনে ঘোলা করে কয়েক দিন রেখে দিই। তারপর ঘোলার উপর যে সাদা ফেনাটা জমা হয়, তা দিয়ে আল্পনা আঁকা শুরু করি। এভাবেই শুরু। তিনি বলেন, প্রথম দিকে লাল মাটি দিয়ে আল্পনা এঁকেছি। এখন গুঁড়া রঙ ব্যবহার করি। বিয়ের আগ পর্যন্ত মেয়েরা আমাকে আল্পনা আঁকায় সহায়তা করেছে। এখন নাতনিরা করে। ইচ্ছে আছে, বেঁচে থাকা পর্যন্ত প্রতি বছর বাড়িটা আল্পনা দিয়ে সাজিয়ে রাখতে, বলেন দেখন বর্মন।