সোনার বাংলা গড়তে মাদক নির্মূল করতে হবে : শামসুল হক টুকু

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু বলেছেন, দেশ স্বাধীন হবার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলাম ধর্মের সাথে যায় না এমন কয়েকটি জিনিস নিষিদ্ধ করেছিলেন। তার মধ্যে প্রথমেই তিনি মাদককে নিষিদ্ধ করেন। এছাড়া রেসকোর্স ময়দানে রেস খেলা নিষিদ্ধ করে রেসকোর্স মযদানকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যোন করা হয়। শুধু তাই নয়, মাদকমুক্ত দেশ গঠনের লক্ষেত বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান দেশ স্বাধীনের পর সংবিধানে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ইতিহাসের পটপরিবর্তন করে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসে মদের লাইসেন্স দিয়ে মাদককে হালাল করে দেয়। গতকাল শুক্রবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত মাদক বিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক এ জেড এম নূরুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে শামসুল হক টুকু আরো বলেন- দেশকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে মাদকমুক্ত করতেই হবে। তিনি বলেন- মাদকের বিরুদ্ধে একা আওয়ামী লীগ বললেই হবে না, সকল রাজনৈতিক দলকে কথা বলতে হবে। দলমত নির্বিশেষে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনে কোনো মাদকাসক্তকে নেতা বানানো যাবে না উল্লেখ করে প্রধান অতিথি বলেন- দেশের নাগরিকদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে মাদকবিরোধী চিন্তা করতে হবে এবং মাদক ব্যবসায় জড়িত ও মাদকসেবীদের ভোট দেয়া হতে বিরত থাকতে হবে।
অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে সাবেক এ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাদক বিরোধী সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমেই আগামী প্রজন্মকে মাদক থেকে রক্ষা করা সম্ভব। প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নিলে এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে রাখলে ছেলেমেয়েরা সর্বনাশা মাদক থেকে বিরত থাকবে।
প্রত্যেকটি স্কুল-কলেজে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরলে শিক্ষার্থীরা মাদক থেকে দূরে থাকবে। ঐশীর ঘটনা থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। ধনী পরিবারের সন্তান ঐশী রহমান একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র মাদকের কারণেই অল্প বয়সেই ধ্বংসের পথে পা বাড়ায়। মাদক ব্যবহারে প্ররোচিত হয়ে বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ফাঁসির রায় হয় তার বিরুদ্ধে। যা সারাদেশের সকল অভিভাবকদের চিন্তিত করে তুলে। তিনি জানান, আইন প্রয়োগের চেয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই সমাজ থেকে মাদক দূর করা সম্ভব। মাদকসেবীরা যে কোনোভাবে আমাদেরই কাছের কেউ। তাই তাদেরকে মাদকের বিরুদ্ধে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে তা থেকে দূরে রাখতে হবে।
ইমামদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মাদকমুক্ত দেশ গঠনে আপনাদের ভূমিকা অনেক বেশি। আপনারা জুম্মার দিনে খুৎবায় মাদকের বিরুদ্ধে বয়ান করলে সমাজে অনেক পরিবর্তন আসবে। আপনাদের এলাকার মাদকসেবীর তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে তারাও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দীন আহমেদ শিমুল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ, পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাফরুল্লাহ কাজল, বিজিবি’র রহনপুর ৫৯ ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম সালাহ উদ্দিন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম ঠান্ডু, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বজলুর রহমান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সোহরাব আলী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হালিমা বেগম।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দীন আহমেদ শিমুল বলেন, প্রশাসনের একার পক্ষে এই জেলাকে মাদকমুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সকলের জনসচেতনতা। তবে পূর্বের অবস্থার তুলনায় বর্তমানে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ বলেন, আমরা বীরের জাতি। আমরা ব্রিটিশদের তাড়িয়েছি, পাকিস্তানিদের তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করেছি। এতকিছু ত্যাগ করতে পারলে এখন কেন এদেশকে মাদকমুক্ত করতে পারব না? সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে মাদকমুক্ত, সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হবে আমাদের দেশ।
জেলা পুলিশ গত মাসে প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য আটক করেছে জানিয়ে পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, মাদকদ্রব্যের সিংহভাগই আসছে সীমান্ত দিয়ে। আর এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গরুর বিট খাটালগুলো। সেখানে টাকা আদান-প্রদানের একমাত্র মাধ্যম হুন্ডি হওয়ার কারণে মাদক ও অস্ত্রের জন্য টাকা পরিশোধ করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তিনি আরো জানান, মাদকের সবচেয়ে বড় চালানটি আমরাই ধরেছি এবং মাদক ছাড়া অন্য অপরাধগুলো এই জেলায় অনেক কম।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক এজেডএম নূরুল হক বলেন, মাদক থেকে দেশকে রক্ষা করতে দেশ ও সমাজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জেলা প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একসঙ্গে কাজ করায় এ জেলায় আগের তুলনায় মাদক অনেক কমেছে। সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
লে. কর্নেল এস এম সালাহ উদ্দিন বলেন- এ জেলার মাটিতে শুয়ে আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর শ্রেষ্ঠসহ শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা। এ জেলার মাটি তাই অনেক পবিত্র, এ পবিত্র মাটিতে ফেনসিডিল থাকবে এটা মেনে যায় না।
মাদকবিরোধী সমাবেশে এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেবেন্দ্রনাথ উরাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোখলেশুর রহমান, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলমগীর হোসেন।