দেশে প্রতিদিন পানিতে ডুবে ৩০ শিশুর মৃত্যু

0

বাংলাদেশে ৫ বছরের নিচে সবচেয়ে বেশি শিশু মারা যায় পানিতে ডুবে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন ৩০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি। পানিতে ডুবে মৃত্যুর ৪০ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। যার মধ্যে ৫-বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর কমপক্ষে ৩ লাখ ২২ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান, যার ৯০ শতাংশেরও বেশি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। বুধবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু হার বিষয়ক এক গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের লক্ষ্যে জন হপকিন্স ইন্টারন্যাশনাল ইনজুরি রিসার্চ ইউনিট, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইপিআরবি) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর’বি) সঙ্গে অংশীদার ভিত্তিতে কাজ করছে। সেমিনারে বক্তারা বলেন, ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু। এ ধরনের মৃত্যুর ৭৫ ভাগ শিশু বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে ডুবে মারা যায়। এভাবে মোট যে পরিমাণ শিশু মারা যায় তার ৪০ ভাগ ৫ বছর বয়সোর্ধ্ব এবং বাকি ১ থেকে ৫ বছর বয়সী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৬ সালের রিপোর্ট অনুসারে দেশে প্রায় ১৯ হাজারের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছে, যার মধ্যে ১০ হাজার ছিল ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। ৭০ হাজারেরও বেশি শিশু সিআইপিআরবি এবং আইসিডিডিআর,বি’র সমাজভিত্তিক শিশু যতœকেন্দ্রের আওতায় রয়েছে, যার মাধ্যমে এসব শিশুদের বাবা-মা যখন বাইরে বা অন্য কাজে থাকেন, তখন তাদের দেখাশোনা করা হয়। যেখানে ওই এলাকার একজন মা ও আমাদের একজন ভলান্টিয়ার থাকেন বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে। ঘরটিও এলাকারই কোনো একজন বাড়ির একটি রুম, যা সর্বসম্মতিক্রমে নির্ধারণ করা হয়। মোট ৩ হাজারটি কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার সারাদেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত রয়েছে। এর ফলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ কমে গেছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো খোলা থাকে। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৫৮ হাজার শিশু এইসব ডে-কেয়ার সেন্টারে সেবা নিয়ে থাকে। আবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এ মৃত্যুহার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এই সমস্যা সমাধান করতে না পারলে এসডিজি অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই সরকারকে আমরা বিষয়টি অবগত করেছি। সরকারও আশ্বাস দিয়েছে। অবাক করা বিষয় হলো সরকার এ বিষয়ে সেভাবে অবগত ছিল না। আমাদের গবেষণার ফলাফল দেখে বিস্মিত তারা। তাছাড়া আমরা বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর প্রক্রিয়া ২০০৬ সাল থেকে শুরু করেছি। গ্রামে ১০ বছরের বেশি বয়সের শিশুরা সাঁতার পারে। এর নিচে না। আমরা এ পর্যন্ত ৫ বছর বয়সের বেশি বয়সী ৫ লাখ শিশুকে সাঁতার শিখিয়েছি। এ ক্ষেত্রে গ্রামের পুকুরগুলোই ব্যবহার করেছি। সেমিনারে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের বেকি বেভিঙ্গারের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জন হপকিন্স ইন্টারন্যাশনাল ইনজুরি রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক ডা. আবদুল গফুর, ভিয়েতনাম সরকারের শিশু বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. ভু থি কিম হোয়া, সিনার্গোস নামক প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্টটির প্রধান এশা হুসাইন, ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ প্রোগ্রামের পরিচালক কেলি লারসন, সিআইপিআরবি’র পরিচালক ডা. আমিনুর রহমান, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএইচও) নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বিভাগের ডা. ডেভিড মেডিংস প্রমুখ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উগান্ডার ম্যাকেরার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক, ভিয়েতনাম সরকারের শ্রম, প্ৰতিবন্ধী ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদলের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস চলতি সপ্তাহে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে এক যৌথসভার আয়োজন করেছে। অংশগ্রহণকারীরা পরস্পরের অভিজ্ঞতা ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্তগুলো এবং ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। ভিয়েতনামের সরকারি প্রতিনিধি দল, যারা ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের সহযোগিতায় নিজেদের দেশে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করছেন, তারা বাংলাদেশে ব্লুমবার্গের অংশীদারী সংগঠনের নিরাপদ সাঁতার শিক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন পরামর্শক সিনার্গোস বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট অংশীদার ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে সফল ও টেকসই মডেল নির্ধারণ এবং পাঁচ বছরের নিচে সব শিশুকে শিশু যত কেন্দ্রে অবস্থান কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।