মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাতেযাব না : প্রধানমন্ত্রী

7

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সকলকে এই ব্যাপারে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আলোচনা করেছি, চুক্তি সম্পাদন করেছি এবং তাদের (মিয়ানমার) সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এদেরকে (রোহিঙ্গা) নিজ দেশে ফেরত পাঠানোটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা এখনো কাজ করে যাচ্ছি। মিয়ানমারের সাথে আমরা ঝগড়া বাঁধাতে যাইনি।’ শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে একথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে রয়েছেন। খবর বাসস।
গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের অংশ হিসেবে এদিন প্রথমবারের মতো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আসেন তিনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ এই নীতিতেই তার সরকার বিশ্বাসী এবং সেই নীতিতেই সরকার পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এটাই বলব, মিয়ানমার যেহেতু আমাদের প্রতিবেশী। আমরা কখনো তাদের সঙ্গে সংঘাতে যাব না।’ ‘বরং তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের তারা যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রচেষ্টাই আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। সে বিষয়ে সবাই যেন সেভাবেই দায়িত্ব পালন করেন, সেজন্যও আমি অনুরোধ করব,’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রাকৃতিক বা মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ, যাই হোক না কেন তাকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা বাংলাদেশ রাখে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়াটাও আজকে বিশ্বের অনেকের কাছেই বিস্ময়।’ কেবল মানবিক কারণেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মানবিক কারণেই এটা করেছি। নিজেদেরও বলতে গেলে রিফিউজি হিসেবে ’৭৫-এর পরে ৬ বছর বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিজের নামটাও আমরা ব্যবহার করতে পারিনি। এরকম দিনও আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীরা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের নিজেদেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, ১৯৭১ সালে আমাদের ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ছিল। তাদেরকে নিয়ে এসে পুনর্বাসন করতে হয়েছে, সেই অভিজ্ঞটাও রয়েছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কারো সাথে যুদ্ধ করব না, আমরা যুদ্ধ করতে চাই না, সবার সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই।’
সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. শামসুল হক, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ এসময় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং পদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার পর এ দেশ সমগ্র বিশ্বে তার মর্যাদা হারিয়েছিল। আর ২১ বছর পর ’৯৬ সালে আমাদের সরকার গঠনের পর তার সরকারের লক্ষ্যই ছিল এই হƒত গৌরব পুনরুদ্ধার করা। প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘এই জায়গাটা আমাদের অনেক স্মৃতিবিজড়িত জায়গা।’ তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখানেই অফিস করেছেন। তখন এটাই ছিল তার অফিস।’
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা শান্তি চাই, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই কিন্তু কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে তার যথাযথ জবাব যেন আমরা দিতে পারি এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যেন রক্ষা করতে পারি সে প্রস্তুতিটা সবসময় আমাদের থাকতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের জন্য নয়, শান্তির জন্যও আমাদের প্রস্তুতি দরকার। আর সেখানেও অবশ্যই আমরা একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে যাতে চলতে পারি সে ব্যবস্থাটাও আমাদের থাকা উচিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় হলো এখন শান্তিরক্ষার জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যাচ্ছে (শান্তিরক্ষা মিশনে), পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যাচ্ছে। আমাদের যারা সেখানে যাবে আমি মনে করি, বিশ্ব পরিবর্তনশীল সেখানে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই এটি পরিবর্তন এবং আধুনিকায়ন হচ্ছে কাজেই আমাদের যারা সেখানে যাবে তারা সববিষয়েই পারদর্শী হবে সেটাই আমরা চাই। তিনি যুগোপযোগী আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সেভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সে ধরনের সরঞ্জামাদি জোগাড় করা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের গড়ে তোলা, কোথায় গিয়ে যেন আমাদের কাউকে কখনো ছোট মনে করতে না হয়, আমরা সেটাই চাই। এমনকি আমাদের পদবির বিষয়ে আধুনিকায়ন করতে হবে।
পরে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সেখানে রক্ষিত পরিদর্শন বইয়েও স্বাক্ষর করেন।