স্মৃতিকথা রক্তের জন্য

11

<মোহা. জোনাব আলী>
সহজ সরল সুন্দর ছেলেটি। নাম তার সমির। বয়স প্রায় ষোল সতের। কয়েক মাস থেকে জ্বরে ভুগছে। বগুড়ায় কাজের কাছে তার জ্বর হয়েছিল। বাড়ি এসে ঔষুধ খেয়ে সেরে যায়। সুস্থ হয়ে আবার কাজে চলে যায়। গরীবের ছেলে কাজ না করলে তো আর চলবে না।
আজ প্রায় ছয় সাত বছর আগে আমাদের গ্রামে আসে। তার বাবার দেহটা বিরাটকায় গাছের মতো লম্বা। কিন্তু তিনি পঙ্গু। তার এক হাত সম্পূর্ণ অবশ। দেহের সাথে হাতটা জামার হাতের মতো এমনি ঝুলে থাকে মাত্র।
সমিরের বাবার জমিজমাও ছিল। কিন্তু তার বাবার হাত পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় তিনটি ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে সব বিক্রি করতে হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ভিটেমাটি বিক্রি করে আমাদের গ্রামে সপরিবারে শশুর বাড়িতে আশ্রয় নেন সমিরের বাবা।
পরে সেই পঙ্গু লোকটি কোনো এক চেয়ারম্যানের দয়ায় বারঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চুক্তি ভিত্তিক ঝাড়ুদারের চাকরী নেন। বলা বাহুল্য, তৎকালীন চেয়ারম্যান দয়াপরবশ হয়েই তাকে এই চাকরীটা দিয়েছিলেন। সমিরের বাবা সেই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যা পেতেন তাতে তার সর্বোচ্চ চা খরচটা জুটতো। তিনি আবার খুব চা’এ নেশাসক্ত ছিলেন। কাজেই সংসারে দেয়ার মতো তার কোনো অতিরিক্ত সম্বল থাকত না। তার তেমন চেষ্টাও ছিল না।
সংসারের টানাপোড়েনের কারণে সমিরও দশ বারো বছর বয়স থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করে।
এই সমির নামের ছেলেটি আমাদের গ্রামে আসার পরই সবার মন কেড়ে নেয়। অশিক্ষিত হলেও মিষ্টিভাষী, কর্তব্য পরায়ণ। মামার গ্রামের সবার প্রতিই তার শ্রদ্ধাবোধ।
গ্রামের দিক দিয়ে সে আমাকে মামা বলে ডাকে। আমাকে মামার মতই সম্মান করে। কোন কথা-ই অমান্য করে না। আমি গ্রামের আর সব ছেলেদের চেয়ে তার প্রতি বেশি দুর্বলও ছিলাম। ওকে আমার খুব ভাল লাগতো। অশিক্ষিত হলেও ওকে আমি জ্ঞান গরীমায় শিক্ষিত ভাবতাম। আমার পড়ার বৈঠকে তার অবাধ বিচরণ। রাজমিস্ত্রির কাজ থেকে এসে যতদিন বাড়িতে থাকতো, আমার বৈঠকেই তার চলাফেরা। কখনো আমার কাছে রাতে শুয়েও পড়তো। আসলে আমার বৈঠক ঘরটা ছিল গ্রামের সব ছেলেদের ২৪ ঘন্টার এক আড্ডাখানা।
সেবার বগুড়ায় গিয়ে কিছুদিন কাজ করার পর আবার জ্বর গায়ে বাড়ি ফিরে আসে সমির। এবার তার চেহারার অনেক বিকৃতি ঘটেছে। শরীরটাও ফোলা ফোলা ভাব। বাড়িতে এসে দু’একদিন থাকতেই তার শরীরের আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। প্রচন্ড রক্ত শুন্যতা। ওকে নিয়ে আমি শহরের সেবা ক্লিনিকে ডা. ময়েজ ভাইয়ের কাছে যাই। তিনি তার রক্ত পরীক্ষা করেন এবং অন্যান্য কিছু উপসর্গ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন-ওর দেহের লোহিত কণিকাগুলোর ষাট সত্তর ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচুর পরিমাণে রক্ত দিলে ও হয়তো বাঁচতে পারে। ডাক্তার ভাই খুব টেনে টেনে কথাগুলো বললেন।
সমিরের এ অশনি সংকেতের কথা শুনে ক্ষণিকেই আমার মনটা ভেঙে গেল। গরীবের ছেলে রক্ত কিনতে এত টাকা পাবে কোথায়? তবু তার চিকিৎসার জন্য আমি অস্থির হয়ে উঠলাম।
তার দু’একজন আত্মীয়ের সাথে আলাপের মাধ্যমে পরদিন তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত হলো। আর এ মর্মে তার রক্ত কেনা ও চিকিৎসার জন্য কিছু টাকাও সংগ্রহ করা হলো।
সকল দুঃশ্চিন্তার রাত পেরিয়ে সকাল হয়। কিন্তু নীরব রাতের সুযোগে তার দেহের অসুখটা আরো খারাপ অবস্থানে চলে যায়। রাজশাহী নিয়ে যাবার মত অবস্থা মনে হলোনা। ডাঃ ময়েজ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলো। তিনি আপাতত রক্ত এনে পুশ করতে পরামর্শ দিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেহেতু রক্ত পাওয়া যাবেনা, সেহেতু রাজশাহী যেতেই হবে রক্তের জন্য।
একজন সঙ্গী নিয়ে আমি সকাল ৯টার দিকে নবাবগঞ্জ স্ট্যান্ড গিয়ে বাসে উঠলাম। বাস তার স্বাভাবিক গতিতে চলছে।
১৯৯১ সালের কথা। আমি তখন বিএ ফাইনালের ছাত্র। আমি ছেলেটির কথা ভাবতে লাগলাম। ও কি বাঁচবে? ও না বাঁচলে ওদের সংসারের কি হবে? ওর মুখের কিছু মিষ্টি কথাও বার বার আমার মনের তন্ত্রীতে সুর তুলতে লাগলো। ও বলতো মামা-আমাদের ভাগ্যের দোষ। নইলে বাবা কেন পঙ্গু হবে, আর জমিজমা বিক্রি করে কেন খাবো? মামাদের বাড়িতেই কেন আশ্রয় নিতে হবে?
আমি মুচকি হেসে বলতাম-তোর বাবা গরীব হয়েছে বলেই আমাদের গ্রামে এসেছিস, নইলে তোর মত এমন ভাল ছেলে কি আমরা এ গ্রামে পেতাম? ও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতো-মামা, বাবা ঝাড়ুদারী করে যা পায় তা খরচ করে দেয়। ছোট ভাই দু’টো আর মাকে আমাকে একাই চালাতে হয়। আমার দ্বারা কি সম্ভব? আর রাজমিস্ত্রির কাজে পয়সাও তো তেমন নেই। আমি যেন চোখে কেমন আঁধার দেখি মামা।
তাকে সান্ত¡না দিতাম-তোর ছোট ভাই দু’টো বড় হলে সব দুঃখ কেটে যাবে। হতাশার স্বরে ও বলতো-আমাদের আর দুঃখ কাটবে? গরীবের সংসারে দুঃখ কখনো ঘোঁচেনা মামা।
বাসের আসনে বসে এ সব কথা ভাবছি, এমন সময় সামনের আসনের সাথে প্রচন্ডবেগে একটি ধাক্কা খেলাম। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখলাম বাস থেমে গেছে। দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে ঘটতে যাচ্ছিল। ড্রাইভার প্রাণ পণ চেষ্টা করে ব্রেক ধরায় ধাক্কাটা লেগেছে। আর সামনের প্রাণীটা বেঁচে গেছে। মনের ভেতর খটকা লাগলো। কিন্তু পেছনে ফেরার বা খবর নেয়ার পথ নেই। তখন বাজে প্রায় সাড়ে ১০টা। ১২টা নাগাদ রাজশাহী হাসপাতালে পৌছলাম।
আজকাল তো হাসপাতালে অনিয়মটাই বেশি। দালাল না ধরলে সুফল হয়না। দালাল ধরে ডাক্তারের কাছে পৌছাতে অনেক রোগীর দফারফাই হয়ে যায়। ভাগ্যিস, ময়েজ ভাইয়ের একটা চিঠি ছিল। তারপরও কিছুটা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যাই।
দুপুর ১টার দিকে ডাক্তারের দেখা পেলাম। বি পজিটিভ গ্রুপের রক্ত লাগবে। ২ ব্যাগ রক্ত নেয়ার ইচ্ছেয় যাওয়া। কিন্তু ডাক্তার দাম যা শোনালেন তাতে আমাদের পুঁজির চেয়ে অনেক বেশি। শেষে ১টি ব্যাগই হলো রক্ত বাক্সের আশ্রয়। ভাবলাম অন্ততঃ ১ ব্যাগ নিয়ে যাই। এটা পুশ করেই আর কিছু টাকা যোগাড় করে আবার এসে রক্ত নিয়ে যাবো।
প্রায় ৩৬ মাইলের পথ। বাস স্ট্যান্ড নামলাম প্রায় ৪টার দিকে। তারপর সদরঘাট। নৌকা করে নদী পার হয়ে বারঘরিয়ায় নেমে মহারাজপুর বালুবাগান আসছি, যেখানে রক্তের জন্য চেয়ে আছে সমির।
রক্ত নিয়ে যখন গ্রামে ফিরলাম তখন বিকেল প্রায় ৫টা। গ্রামে প্রবেশ করতেই কেমন যেন থমে থমে ভাব অনুভব করলাম। কেউ কোন কথা বলছেনা। আমাদের বুঝতে আর দেরী হলোনা যে, সমির আর নেই।
যখন তাদের বাড়ির কাছে পৌছলাম, তখন সমিরের মা পাগলের মত ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। আমার চোখ মানলোনা। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। ওর মা বলতে লাগলো-আমার সমিরের জীবন আনতে গিয়েছিলে ভাই? ঐ বাক্সের মধ্যে আমার সমিরের জীবন আছে? দাও রক্ত দাও, রক্ত দিয়ে ওকে তাড়াতাড়ি ভাল করে পাঠিয়ে দাও। আমার বুকের মানিক, আমার ধন, আমার সমির যে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তুমি ওকে এনে দাও ভাই। তোমার বৈঠকে আমি রোজ তাকে ডাকতে যাবো। তুমি ওকে ভাত খেতে পাঠিয়ে দিও………..।
আমি মুখে কিছুই বলতে পারলামনা। ছুটে গেলাম কবরের দিকে। ওকে তখন কবরে নামিয়েছে। আমাদের চলে আসার খবর পেয়েই কবরের পাটাতন দেয়া বন্ধ রেখে মুরুব্বীরা সবাই অপেক্ষা করছেন। কবরের কাছে পৌছলাম। মুখ থেকে কাফনের কাপড় সরানো হলো। নীরব-নিথর দেহ নিয়ে শুয়ে থাকা সমিরের মুখটা একটু দেখলাম। অমনি মনে হলো সমির যেন বলছে-মামা, আমার জন্য রক্ত এনেছ? দাও, আমাকে রক্ত দাও। আমি যে বাঁচতে চাই মামা, আমি যে বাঁচতে চাই। আমি বেঁচে আবার তোমার বৈঠক ঘরে গিয়ে আবার আড্ডা দিতে চাই। তাড়াতাড়ি রক্তটা দাও মামা। রক্তটা দেয়া হলো। কিন্তু ওকে নয়, ওর কবরের পাটাতনের উপর মাটির নিচে।
লেখক ঃ ছোট গল্প, প্রবন্ধ ও নাটক লেখক।