জাতির পিতা

29

<ড. অজিত দাস>

সূচনা
প্রতিটি জাতি তথা জাতি-রাষ্ট্রের (Nation-State) একজন প্রতিষ্ঠাতা থাকেন, যাঁকে বলা হয় জাতির পিতা বা জাতির জনক। এর অর্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র একজন মানুষই একটি জাতি বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। একজন মানুষের একক প্রচেষ্টায় কোনো জাতি মুক্তি লাভ করে না, সৃষ্টি হয় না কোনো রাষ্ট্রের। লক্ষ লক্ষ কোটি মানুষের সম্মিলিত মেধা, মনন, রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে একটি জাতি সৃষ্টি হয়। আর এই জাতি সৃষ্টিতে একজন নেতা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, ত্যাগ সর্বোপরি ‘ক্যারিসমেটিক’ নেতৃত্বের মাধ্যমে সকল শ্র্রেণীর নেতাকর্মী ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি জাতির স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন। এমন নেতার সন্ধান মেলে আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, তুরস্কের কামাল আতাতুর্কে, বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের মধ্যে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা ও ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পাকিস্তানি দুঃশাসন থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করেন, জন্ম দেন স্বাধীন বাংলাদেশের। কিন্তু স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরও দেশের একটি গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করেন না। এই গোষ্ঠীর কেউ কেউ জাতির পিতা (Father of the Nation) শব্দগুচ্ছটির অপব্যাখ্যা দেন আবার কেউ কেউ মওলানা ভাসানী প্রমুখকে জাতির পিতা হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। প্রকৃত অর্থেই এমন অভিপ্রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার শামিল। তাই এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কেন জাতির পিতা তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হবে। কিন্তু তার আগে পাঠকের সুবিধার্থে ও প্রাসঙ্গিক কারণেই ‘জাতি’ (Nation) শব্দটি সম্পর্কে দু’চার কথা বলা দরকার।

‘জাতি’ কাকে বলে?
‘জাতি’(Nation) শব্দটি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে হলে আমাদের ‘জনসমাজ’ (People) এবং ‘জাতীয়তা’(Nationality) শব্দ দুটির সাথে পরিচিত হতে হবে। জনসমাজ (People): যখন কিছু মানুষ কোনো ভূখ-ে একই ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, আচার-আচরণের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয় তখন তাকে জনসমাজ বলে। অবশ্য কোনো কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জনসমাজ গঠনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য ও ভাবাবেগকে প্রাধান্য দেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকেঞ্জি বলেন, “A people is a group individuals, not necessarily living together, but having a certain unity of tradition and sentiment.”জাতীয়তা (Nationality) : আর কোনো জনসমাজ যখন রাজনৈতিক চেতনার (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরেপেক্ষতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ইত্যাদি) দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্য কোনো জনসমাজ থেকে নিজেদের পৃথক ভাবতে শুরু করে তখন তাকে বলে জাতীয়তা। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন সমাজই হলো জাতীয়তা। অর্থাৎ জাতীয়তা হলো জনসমাজের পরবর্তী স্তর। আর এই জাতীয়তা থেকে সৃষ্ট আন্দোলনই হলো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।
জাতি (Nation) :  আর সংক্ষেপে জাতি হলো জাতীয়তার পরবর্তী স্তর। অর্থাৎ যখন কোনো জনসমাজ (Pepole) অন্য কোনো জনসমাজ থেকে নিজেরদের পৃথক ভাবতে শুরু করে এবং নিজেদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় তখনই সূচনা ঘটে একটি জাতির (Nation)| অন্য কথায়, এই আন্দোলন সংগ্রামে জয়ী হয়ে ঐ জনসমাজ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও সরকার গঠন করে বা করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে তখন সেই জনসমাজকে বলা হয় জাতি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
উপরের আলোচনার সূত্র ধরে এবার বঙ্গবন্ধু কেন জাতির পিতা তা আলোচনা করা যাক।
শেখ মুুজিব ও পূর্ববাংলার জনসমাজ : আমরা দেখেছি যখন কিছু মানুষ কোনো ভূখ-ে একই ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, আচার অনুষ্ঠানের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ থাকে তখন তাকে জনসমাজ বলে। মূলত ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই পূর্ব বাংলার জনসমাজ বাঙালি সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বিকশিত হতে শুরু করে। ১৯১৩ সালে কবিগুরুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাঙালি সংস্কৃতির এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, আবুল হাসিম প্রমুখ মুসলিম লীগ নেতা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁরা মূল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির দাবি জানান এবং বাংলা বিভক্তির তীব্র বিরোধিতা করেন। শেখ মুজিব তখন কলকাতায় অধ্যয়নরত। পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে ছাত্রদের নেতৃত্ব প্রদান করলেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সুবিধাবাদী, ধর্মের লেবাশধারী মুসলিম লীগ নেতৃত্ব বাঙালির উপর শাসন ও শোষণ চাপিয়ে দিবে। তাই তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে জনগণের হাতে অর্পণ করতে হবে। দেশ বিভাগের পরপরই বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রভৃতি গঠনের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ এর মার্চ ও সেপ্টেম্বরে দু’বার গ্রেফতার হন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ গঠিত হলে মওলানা ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিব জেলখানা থেকেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারারুদ্ধ থাকলেও এই আন্দোলন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে ভাষা সৈনিক গাজীউল হক বলেন, “১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে তখন শেখ মুজিবুর রহমান জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় নিশ্চুপ ছিলেন না। পরামর্শ দিয়েছেন এবং কারাগারে বন্দী থেকেও আন্দোলনে শরীক হয়েছেন।” ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কারামুক্তির কিছুদিন পরই তিনি আওয়ামী মুসলীম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এভাবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ কালপর্বে বঙ্গবন্ধু একজন দক্ষ সংগঠক, তুখোড় বক্তা ও ত্যাগী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং পূর্ব বাংলার জনসমাজকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্যমূলক আচরণ সম্পর্কে সচেতন ও সংগ্রামী করে তোলেন।

শেখ মুজিব ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন
১৯৫২ সালে জেলখানা থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগবিরোধী একমাত্র সর্ববৃহৎ দল ছিল আওয়ামী লীগ। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত না হলেও মনি সিংহ, খোকা রায়, আব্দুস সালাম প্রমুখ নেতা শাসক দলের নির্যাতন, গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রভৃতি কারণে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। এ সময় আওয়ামী মুসলিম লীগই মুসলিম লীগ সরকারের রক্তচক্ষুর প্রতিবাদে শামিল হয়। তাই এই বৃহৎ সংগঠনটির দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার ফলে শেখ মুজিবের কর্মদক্ষতা আরো বেড়ে যায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রধান নেতা হিসেবে তিনি সারাদেশ চষে বেড়ান এবং জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন লাভ করেন। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে এবং যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়ী হয়। শেখ মুজিব নির্বাচিত হয়ে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুক্তফ্রন্ট অবশ্য ক্ষমতায় বেশি দিন টিকে থাকেনি। মুসলিম লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে চন্দ্রঘোনা পেপার মিলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা বাধিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে রবখাস্ত করে এবং শেখ মুজিবকে কারাগারে প্রেরণ করে।
এরপর ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তানকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ এবং ‘পূর্ব বাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ করা হলে শেখ মুজিব এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং এর প্রতিবাদে পাকিস্তান গণপরিষদ থেকে ওয়াক আউটের পূর্বে বলেন, “…আপনারা যে পূর্ব বাংলার নাম বদলিয়ে পূর্ব পাকিস্তান রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সংগত নয়। কেননা একটি দেশ ও জাতির নাম বদল করার ক্ষমতা গণপরিষদের এখতিয়ারে নেই। এর জন্য প্রয়োজন জনগণের ম্যান্ডেট। তারপরও যদি পূর্ববঙ্গের নাম পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয় তাহলে এমন একদিন আসতে পারে যখন আমরা সে জন্য দায়ী থাকবো না।”
উল্লেখ্য যে, এই সময় (১৯৫৭ সালে) মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের মার্কিন ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের প্রতিবাদে দল থেকে বের হয়ে গিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন এবং পশ্চিমা সামরিক জোটের প্রতিবাদ, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি ও পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন।
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইউব খান সামরিক আইন জারি ও তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রের নামে মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র ধ্বংস করা শুরু করলে শেখ মুজিব উপলব্ধি করতে থাকেন যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাথে থাকা সম্ভব নয়। এ সময় তিনি বিরোধী দলগুলোর সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন এবং ১৯৬১ সালের শেষ দিকে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সাথে আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনাকালে বলেন, “… পাঞ্জাবের বিগ বিজনেস যেভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছিল ও দাবিয়ে রাখছিল তাতে ওদের সাথে আমাদের থাকা চলবে না। তাই এখন থেকেই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, আন্দোলনের প্রোগ্রামে ঐ দাবী রাখতে হবে।”
মোটকথা, ১৯৬১ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার জনগণকে পাকিস্তানি দুঃশাসন থেকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এরপর প্রণয়ন করেন ১৯৬৬ সালের ৬-দফা কর্মসূচি। এই ৬-দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালির প্রাণের দাবি। অথচ মওলানা ভাসানী ৬-দফার বিরোধিতা করে একে সাম্রাজ্যবাদের ‘নীল নকশা’ বলে অভিহিত করেন।” মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ৬-দফা সমর্থন করলেও মোহাম্মদ তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদার প্রমুখ এর তীব্র সমালোচনা করে একে পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্টকারী ও বিদেশী শক্তি দ্বারা প্রণীত বলে প্রচার চালান। তা সত্ত্বেও এই ৬-দফা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে প্রচ-ভাবে আন্দোলিত করে। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা আরো সুসংহত ও ক্ষুরধার হয়। বস্তুত এই ছয় দফার মধ্যেই ছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বীজ।

শেখ মুজিব ও জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যুদয়
অপ্রতিরোধ্য শেখ মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে জেনারেল আইউব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে আটক করে প্রহসনমূলক বিচারের ব্যবস্থা করেন। তার লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় দোষী করে ফাঁসিতে ঝোলানো। কিন্তু দেশের সচেতন ছাত্রসমাজ দেশবাসীকে সাথে নিয়ে আইউবের বিরুদ্ধে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুললে মওলানা ভাসানীও তাতে শামিল হন। ফলে ’৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থানের চাপেই জেনারেল আইউব ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন এবং তিনি জেনারেল ইয়াহিয়ার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগ করেন। ক্ষমতা ছাড়ার আগে জেনারেল আইউব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ সকল বন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানি রাজনীতি থেকে জেনারেল আইউবের প্রস্থান ও শেখ মুজিবের নবতর উত্থান ঘটে। তিনি ছাত্রজনতা কর্তৃক বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালে সারা পাকিস্তান জুড়ে প্রথমবারের মতো এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে জয়ী করিয়ে আনেন। নির্বাচনের এই ফলাফলে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার ও দেশের পশ্চিমাংশের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং জেনারেল ইয়াহিয়া নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। এর প্রতিবাদে জনগণকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে আয়োজিত জনসভায় ঘোষণা করেন, “এদেশের মানুষকে খতম করার চক্রান্ত চলছে- বাঙালিরা বুঝে সুঝে কাজ করবে। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন। এবং আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।” তিনি আরো বলেন যে, “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে বাংলাদেশে কোর্ট কাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।…”
এই জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে বাংলার জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মতো কোর্ট-কাচারি, অফিস, আদালত বর্জন করে। এদিকে পাকহানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু সেই রাতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর নির্দেশে বাংলার দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশকে হানাদার মুক্ত করে।

উপসংহার
উপরের আলোচনায় এটা প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে পূর্ব বাংলায় যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে তার নেতৃত্ব প্রদান করেন শেখ মুজিব। এরপর চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরেপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী যে আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং সেই আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে তারও নেতৃত্ব প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। যদিও মওলানা ভাসানীকে কেউ কেউ জাতির জনক হিসেবে চিহ্নিত করতে চান সে ক্ষেত্রে বলা যায়, মওলানা ভাসানী বাংলার জনগণের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পথপরিক্রমায় তিনি কখনো ইসলাম, কখনো সমাজতন্ত্র, কখনোবা গণতন্ত্রের প্রশ্নে দ্বিধান্বিত হয়েছেন, যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কখনো পরিলক্ষিত হয় না। বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। আদর্শের প্রশ্নে তিনি কখনো আপোস করেননি এবং এই আদর্শের জন্যই নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত গবেষক, সমালোচক, শিক্ষাবিদ প্রফেসর বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর এক নিবন্ধে বলেছেন, “গণতন্ত্রের সমতা ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চরিত্র। বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের সমতার বোধ ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি একত্রে করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ট্র্যাটেজী তৈরী করেছেন। সে জন্য তাঁর প্রণীত স্ট্র্যাটেজী কলোনীয়াল সময়ে রাজনীতির মূল ধারায় পরিণত হয়েছে। মওলানা ভাসানীর স্ট্র্যাটেজীর মধ্যে প্যান-ইসলাম ও সমাজতন্ত্রের আন্তর্জাতিকতা বোধের মিশেল ছিল। তার দরুণ মওলানা প্রণীত স্ট্র্যাটেজীর মধ্যে শোষিত মানুষের পক্ষে মুক্তির অন্বেষণ বিধৃত থাকা সত্ত্বেও, পাকিস্তানের পরিসরে আন্তর্জাতিকতাবাদ থিওরিস্ট এক মনোভাব তৈরী করেছে, যে মনোভাবের সঙ্গে বাস্তবতার দুরত্ব অধিক। তিনি সংগ্রামের পক্ষে থেকেছেন, কিন্তু একটা দোলাচলে আক্রান্ত থেকেছেন সব সময় সত্য।’’ তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই যে বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক সে বিষয়ে কোন বির্তকের অবকাশ নেই।

লেখক : চেয়ারম্যান, বঙ্গবন্ধু তরুণ লেখক পরিষদ