চাঁপাইনবাবগঞ্জে দলিত ৩৫ হাজার হরিজন প্রায় ১৮০০ জন

বিপাশা রবি দাস

বৈষম্য বিলোপ আইন দ্রুত প্রণয়ন ও দলিত জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্যা সমাধানে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি খাসজমি বরাদ্দের দাবিসহ ৮ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন। গত বৃহস্পতিবার আয়োজিত মানববন্ধনের মাধ্যমে তারা এ দাবি জানান। মানববন্ধনে তারা এ জনগোষ্ঠীর জন্য উপযুক্ত কর্মসূচি প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষিত দলিতদের কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

বাংলাদেশে দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ এখনো সমাজের মূল ¯্রােতের সঙ্গে মিশতে পারেনি। অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাদের। এখনো কলোনিভিত্তিক জীবনযাপন করে যাচ্ছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েও। ঢাকা শহরের একটু বাইরে গেলেই দেখা যাবে দলিত-হরিজনরা যেন অস্পৃশ্য। তারা পানি খেতে দোকানে গেলেও আলাদা করে গ্লাস নিয়ে যেতে হয়। দক্ষিণবঙ্গে হরিজনরা কোনো বাড়িতে খেতে গেলে তাদের কলাপাতায় খাবার পরিবেশন করা হয়। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় অবদানকে অস্বীকার করা হবে। তাই তাদের সমাজের মূলধারায় সংযোজিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা খুব জরুরি। নাহলে তারা শিক্ষিত হলেও এখনো যে অচ্ছুৎ হয়ে রয়েছে, সেই অচ্ছুৎই রয়ে যাবে।

জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার মানুষরা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ করে ঐতিহাসিক বা প-িতদের কাছে ‘দলিত’ নামে পরিচিতি পায়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে দুই ধরনের দলিত জনগোষ্ঠীর দেখা মেলে। একটি বাঙালি দলিত শ্রেণী, অন্যটি অবাঙালি দলিত শ্রেণী। সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৩.৫৮ লাখ দলিত এবং ১২.৮৫ লাখ হরিজন জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে- রিশি, কায়পুত্র, হরিজন, রবিদাস ইত্যাদি।

অবাঙালি দলিত বলতে ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি (১৮৩৮-১৮৫০) বিভিন্ন সময়ে পূর্ববঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী, চা-বাগান শ্রমিক (১৮৫৩-৫৪), জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাচি, মাদ্রাজ ও আসাম থেকে হিন্দি, উড়িষ্যা, দেশওয়ালি ও তেলেগু ভাষাভাষী মানুষের পূর্বপুরুষদের বোঝায়। দরিদ্র এই অভিবাসীরা দেশের সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং সিলেটে চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। ভূমিহীন ও নিজস্ব বসতভিটেহীন এসব সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জমি, রেলস্টেশনসহ সরকারি খাস জমিতে বসবাস করছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- হেলা, মুচি, ডোম, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোমার, ডালু, মালা, মাদিগা, চাকালি, সাচ্চারি, কাপুলু, নায়েক, নুনিয়া, পরাধন, পাহান, বাউরি, বীন, বোনাজ, বাঁশফোর, ভূঁইয়া, ভূমিজ, লালবেগী, জনগোষ্ঠী। এসব জনগোষ্ঠী তেলেগু, ভোজপুরি, জোবালপুরি, হিন্দি, সাচ্চারি ও দেশওয়ালি ভাষায় কথা বলে। এই সম্প্রদায়গুলোই মূলত অবাঙালি দলিত শ্রেণী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর দলিত, বেদে ও হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে আনেক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। যেমন হরিজন শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এ কর্মসূচির আওতায় দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর ১৮ বছর বা তদূর্ধ্বকে আর্থ-সামাজিক প্রশিক্ষণ; মাথাপিছু ৪০০ টাকা হারে ৫০ বছর বা তদূর্ধ্বকে বিশেষ বা বয়স্ক ভাতা প্রদান ছাড়াও এসব জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। সরকার নির্দেশিত সমাজসেবার এ উদ্যোগকে অনেককেই সাধুবাদ জানিয়েছেন।

কথা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নূর মেহাম্মদের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের জেলায় দলিত সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৩৫ হাজার আর হরিজন প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়ের জন্য এ জেলায় বেশকিছু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাতা, প্রশিক্ষণ এবং উপবৃত্তি। আমাদের এখানে মহিলা এবং পুরুষের মধ্যে যারা পঞ্চাশোর্ধ্ব তাদেরকে ভাতার আওতায় আনা হয়। আর যাদের ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে তাদেরকে আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ যেমন সেলাই, কম্পিউটার, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এখন পর্যন্ত জেলায় ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ দেয়ার পর প্রতেককে ১০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়। যারা শিক্ষার্থী তাদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া যারা প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে তাদের জন্য মাসিক ৩০০ টাকা, মাধ্যমিকের জন্য মাসিক ৪৫০ টাকা এবং কলেজে পড়ুয়াদের জন্য মাসিক ৭০০ টাকা মাসিক এবং ¯œাতক পড়–য়াদের জন্য ১ হাজার টাকা মাসিক ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা আছে। জেলায় সর্বমোট ৪৯ জনকে উপবৃত্তি প্রদান করা হয়। আর ভাতা দেয়া হয় ৭২ জনকে (ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ পর্যন্ত) বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় দলিত সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৩৫ হাজার এবং হরিজন সম্প্রদায় সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। দুই সম্প্রদায়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হবে শিক্ষার্থী। অথচ উপবৃত্তি পাচ্ছে মাত্র ৪৯ জন। আর ভাতা পাচ্ছেন ৭২ জন। চাহিদার তুলনায় ভাতাভোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় এই সেবা পাওয়ার সুযোগ পান না অনেকে। লক্ষণীয় যে, যদি কেউ জানেন যে তাদের এই সেবা দেয়া হয়, তাহলে তিনি আর অন্য কাউকে বিষয়টি জানাতে চান না। এর ফলে এখনো অনেকেই আছেন, যারা জানেন না যে তাদের এই ধরনের সেবা দেয়া হয়। আবার অনেকেই আছেন, যারা সেবা পাওয়ার কথা জানলেও কোথায় গেলে এসব সেবা পাবে তা জানা নেই তাদের।

এমনই কয়েকজনের সাথে কথা হয়। যারা জানেন না যে তাদের এই ধরনের সেবা দেয়া হয়। পেশায় নাপিত গোবিন্দ রবি দাশ বলেন, ‘আমাদের এ ধরনের সেবা দেয়া হয় তা আমরা জানি না। আর কোউ আমাদের বলেননিও।’ তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে আর ছোট মেয়ে ৩য় শ্রেণীতে পড়ে। দিন আনি দিন খায়। দুটো টাকা যে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখব তা হয় না।’
অঞ্জলী রবি দাস বলেন, ‘আমার স্বামী এক বছর থেকে প্যারালাইসিস রোগাক্রান্ত। আমার তিন ছেলে তিন মেয়ে। বড়মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। মেজ মেয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে আর ছোটমেয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। দুই ছেলে একটি প্লাস্টিকের দোকানে মার্কেটিংয়ের কাজ করে এবং পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দেয়। বড় ছেলে দশম শ্রেণী, মেজ ছেলে ৪র্থ শ্রেণী এবং ছোট ছেলে ১ম শ্রেণীতে পড়ে।’ অঞ্জলী রবি বলেন, ‘সংসারের খরচ চালানোর জন্য ছেলেদের কাজে লাগিয়েছি। একদিকে স্বামী অসুস্থ, অন্যদিকে ছেলেমেয়েদর লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভিটেমাটিটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। আগের বাড়িতে বিদ্যুৎ, ট্যাপ কল, টিভি, ডিস কানেকশন, ইটের বাড়ি সব ছিল। এখন কিছুই এই টিনের বাড়ি ছাড়া।’ অঞ্জলী কষ্ট নিয়ে বলেন, ‘ছেলেদের আয়ের ৬ হাজার টাকা দিয়ে কোনোরকমে জীবন পার করি। মেয়েরা এত লেখাপড়া করেছে, যদি কাজে লাগতে পারত তবে একটু হলেও কষ্ট লাঘব হতো। কত শুনেছি সবইকে উপবৃত্তি ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। টাকাও দেয় হয়, কিন্তু আমরা কোনো দিন পাইনি।’

ফেলো, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফ.এম।