আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

আজ সবার সব পথ এসে মিলে গেছে এক অভিন্ন গন্তব্যস্থল শহীদ মিনারে। হাতে হাতে বসন্তে ফোটা ফুলের স্তবক, কণ্ঠে নিয়ে চির অম্লান সেই গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়েছে আবালবৃদ্ধবনিতা। ভাষা শহীদদের প্রতি নিবেদিত শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ঢেকে যায় শহীদ মিনারের বেদি। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আজ থেকে ৬৩ বছর আগে ১৯৫২ সালের এই দিনে বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন ঢাকার রাজপথ। পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য অবদানের অভূতপূর্ব নজির। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির অবদানের এই অনন্য ঘটনা স্বীকৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। একুশ আমাদের চেতনায়, একুশ আমাদের প্রেরণায়, একুশ আমাদের অহংকার। একুশ আমাদের ব্যথায় কাতর চোখের বারিধারা, একুশ আমাদের শূন্য হিয়ায় আকাশ ভরা তারা, একুশ আমাদের রক্ত রঙ্গিন কৃষ্ণ চূড়ার ডাল, একুশ আমাদের ঝাঁজরা হওয়া ছোট্ট ঘরের চাল। একুশ মানে মাথা নত না করা, চিরকালের সেই গান….আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি বুলিতে পারি….গাওয়া আর বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করা।
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আজ বাঙালির সঙ্গে সারা বিশ্বেই দিনটি পালিত হচ্ছে। দেশের সর্বত্রই আজ প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে পু®পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে শহীদদের স্মৃতির প্রতি। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করেও রাখা হয়েছে।
১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জন্ম নেয় ভাষা-বিরোধ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। প্রতিবাদে সোচ্চার হন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভভরে উচ্চারণ করেন, উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য ভাষা নয়। জিন্নাহ্র এই ঘোষণার সাথে সাথে ময়দানে উপস্থিত জনগণ সমবেতভাবে এ ঘোষণার প্রতিবাদ করেন আবার ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে গিয়ে একই রকম ভাষণ দেন। মূলত তখন থেকেই সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিল এক অবিস্মরণীয় গণজাগরণ, গণআন্দোলনের মাস। এই দিনে গোটা বিশ্বকে অবাক করে মায়ের ভাষার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল এদেশের সূর্য সন্তনরা। তাদের এই নিঃস্বার্থ আত্ম্যাগেই আমরা পেয়েছি মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা, গানের ভাষা, আবেগের ভাষা, বাংলা ভাষা। আর তাইতো আজ আমরা ভাষা আন্দোলনের সকল বীর সেনাদের স্মরণ করছি সশ্রদ্ধ চিত্তে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনের বিনিময়ে অর্জিত ভাষা, আমরা কতটুকু হৃদয়ে লালন করি। শুধু কি প্রভাতফেরি বা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা›জলি দিয়ে দায়িত্ব শেষ? আমরা অনেকেই মনে করি একুশে ফেব্রুয়ারি শোকের আবার অনেকেই মনে করি একুশে ফেব্রুয়ারি গর্বের। কিন্তু এই দিনটিকে আগে কিভাবে পালন করা হতো বা এখন কিভাবে পালিত হচ্ছে এই বিষয়ে কি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি? একুশের ভাবনাটা আসলে আমাদের কেমন হওয়া উচিত? এই বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহা: ইব্রাহীম বলেন, একুশ নিয়ে আমার যে ভাবনা তাতো অসীম এবং নিরন্তর, সম্ভাবনাময় একটা স্বপ্ন বা একটা ভবিষ্যতের কথা আমি চিন্তা করি। একুশের অবদার অপরিমেয় অবদান, কারন একুশের চেতনা গোটা বাঙালি জাতিকে একই সূত্রে উপস্থিত করেছিল, একত্রিত করেছিল এবং সংগ্রামী করেছিল। একুশ না থাকলে আমরা এই বাংলাদেশের কথাটা চিন্তাটাই করতে পারতাম না। প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতির জাতিস্বত্ত্বা, যে চেতনা বোধ, এই চেতনাবোধটা জাগ্রত হয়েছিল সর্বপ্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিতে। একুশে ফেব্রুয়ারি একদিক দিয়ে যেমন আনন্দের, অন্যদিক দিয়ে তেমনি বেদনার। যখন আমরা ত্যাগের কথা চিন্তা করি, যখন আমাদের শহীদ ভাই সালাম, বরকত, রফিক, জব্বর, মতিউর তাদের কথা চিন্তা করি, তাদের অমূল্য জীবনের কথা চিন্তা করি, তখন আমরা আবেগ আপ্লুত হই, আবেগ বিধুর হয়। যখন তার অর্জনের কথা চিন্তা করি একুশ আমাদের কি দিয়েছে? একুশ আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে গেছে স্বাধীনতার পথে, একুশ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। আমাদের চেতনা বাস্তব যে রূপ সেটা আমরা পেয়েছ্ িএখান থেকে।
বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার স্থান ৫ম। শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে ২য় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলা ভাষা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। বায়ান্নর শহীদদের স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ লাভ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রবণতার দিকে তাকালে মনে হয়, আমাদের মাতৃভাষা আবার অবহেলার শিকার। এখন একটা কথাই ভাববার বিষয় যে, একুশে ফেব্রুয়ারি অনেক আগে থেকেই পালন করে আসছি, কিন্তু বর্তমানের ২১শে ফেব্রুয়ারির এই চেতনাকে আমরা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি? এখন প্রশ্নটা হল এখনকার তরুণ প্রজন্মের কাছে আজকের এই দিনটির ভাবনা কিরকম?
সুমন হোসেন, বর্তমান প্রজন্মের একজন উচ্ছসিত তরুণ। ভাষা শহীদদের ত্যাগের ইতিহাস আর একুশের মর্মার্থ তারা কিভাবে লালন করছে তাদের মনের মণিকোঠায়, সে সম্পর্কে তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, একুশকে তিনি একইভাবে পুষে রেখেছেন বুকে যেভাবে একটি সদ্য ফোঁটা ফুলের কুঁড়িকে আগলে রাখে একটি গাছ। সুমন আরও বলেন, হ্যাঁ এটা ঠিক যে, মাতৃভাষার জাগরণে তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বের স্থানান্তরিকরণ লক্ষ্যমাত্রা রক্ষায় এবং জ্ঞানের সকল উৎস এবং প্রকাশের সকল রূপ এর জাগরণে উন্নয়নের সকল শক্তিকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। এগুলোই সেই সূতো যা মানবতার কারুকার্য বুনবে। কিন্তু আমাদের সকলেরই এই ইতিহাস জানা যে, যখন তৎকালীন সরকার নুরুল ইসলাম ১৪৪ ধারা জারি করে দিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের ছাত্ররা আম গাছতলায় গোপন বৈঠক করলেন আমাদের এই মাতৃভাষাকে যেভাবেই হোক আমরা ছিনিয়ে আনবোই। কারণ, তিনটি জিনিস-মা, মাটি আর মাতৃভূমি। এই মায়ের শিক্ষা দেয় যে ভাষা সেটা হচ্ছে মাতৃভাষা বাংলা এর দাবিতে তারা একটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন যে, যেভাবেই হোক আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। এই জন্য তারা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে বেড়িয়ে পড়েছিলেন, আর তখন তাদেরকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনি। ইতিহাস থেকে জেনেছি যে ভাষার জন্য শুধুমাত্র একটি দেশ, একটি রাষ্ট্র জীবন দিতে পেরেছে সেটা হল আমাদের এই সবুজ ভূখন্ড বাংলাদেশ।
মাতৃভাষা বিশেষ কোনো ব্যক্তি-মানুষের যেমন অন্যতম পরিচয়-উৎস, তেমনি তা একটি জাতিসত্তার অস্তিত্বেরও শ্রেষ্ঠ স্মারক। মানুষের কাছে যেসব বিষয় তার প্রাণের মতোই প্রিয়, মাতৃভাষা তার অন্যতম। বস্তুত, মাতৃভাষাই একজন মানুষের পরিচয়ের শ্রেষ্ঠতম উৎস। মাতৃভাষার মাধ্যমে বিশেষ কোনো মানুষ নিজেকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে, তুলে ধরে তার জাতিসত্তার পরিচয়। মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে কোনো জাতিই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না, পারে না নিজের পরিচয়কে পৃথিবীতে উজ্জ্বল করে প্রকাশ করতে। যে জাতির মাতৃভাষা যত উন্নত, সে জাতি সব দিক থেকেই তত উন্নত-এমন ধারণা সর্বজনস্বীকৃত। আর আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের ভাষা হল আমাদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান ঐতিহ্য আর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপকরন। মাতৃভাষা বিস্তারের উন্নতিতে সকল প্রকার কর্ম কেবল মাত্র ভাষাগত ডাইভারসিটি এবং বহুভাষাগত শিক্ষার প্রতিই উৎসাহিতক করে না বরং বিশ্ব জুড়ে ভাষাগত সচেতনা ও সাংস্কৃতিক প্রথার প্রতি পূর্ণ সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং বোঝাপড়া, উদারতা ও কথা বার্তা উপর নির্ভর সহমর্মিতার প্রতি উৎসাহিত করে। আর তাইতো একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাঙালির কাছে নয়, বিশ্বময় চির প্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে। হয়ে উঠবে বিশ্ব-মানুষের সংগ্রামের নতুন অস্ত্র।

উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা
সহকারী প্রযোজক
রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম