ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অতীতে সংবিধান লঙ্ঘনকারীদের কারণে দেশ বারবার পিছিয়ে গেছে। এজন্য ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে আরো শক্তিশালী করা হবে। রোববার সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে এ কথা বলেন তিনি। আগামীতে জেলাভিত্তিক ধারণা নিয়ে মূল বাজেট করা হবে জানিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবকাঠামো উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে তা দ্রুত বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার সকালে আসেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তারা। পরে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তৃণমূলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। এজন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ আর বাজেট প্রণয়নে নতুন চিন্তার কথাও জানান সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে বাজেট করব ঠিকই। কিন্তু এরপর আমরা চাচ্ছি ধীরে ধীরে দায়িত্ব দিয়ে দেব প্রতিটা জেলাকে। নিজেদের বাজেট চাহিদা, কী উন্নয়ন দরকার, কীভাবে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে পারবে, সেখান থেকে আমরা মতামত নেব। যাতে প্রতিটি পয়সা সাধারণ মানুষের উন্নয়নের কাজে লাগে। এজন্য স্থানীয় সরকারকে গুরুত্ব দিই। এ কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে স্থানীয় সরকারকে আরো শক্তিশালী করতে চাই। কারণ, এত বেশি জনসংখ্যা, তাদের সেবা দিতে আমি মনে করি সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না, উন্নয়নও স্থায়ী হবে না। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের এক এক এলাকায় এক এক জিনিসের উৎপাদন হয়। সেটাকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে শিল্প গড়ে তোলা। অর্থাৎ কৃষি প্রক্রিয়াজাত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত এ ধরনের শিল্প যদি করতে পারি, আমার দেশেও লাগবে, বিদেশেও রপ্তানি করতে পারব। তৃণমূল পর্যায়ে পর্যন্ত একটা মাস্টারপ্ল্যান করে যদি এগোই, তাহলে এখনো যেটুকু সময় আছে আমরা দ্রুত উন্নতি করতে পারব। এ সময় মন্ত্রণালয়ের সব কাজ পরিকল্পিতভাবে করারও নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। উন্নত দেশ থেকে ধারণা নিয়ে, নিজেদের বাস্তবতায় উন্নয়ন কাজ করারও তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সবার জন্য সুপেয় পানি, নিরাপদ সড়ক, স্যানিটেশন আর জনস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতেও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। ভূমি ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এনে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ঠেকানোর নির্দেশনা দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যান করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, আগেও আমি একটা নির্দেশনা দিয়েছিলাম।

তবে সেভাবে কার্যকর হয়নি। সেটা হলো- উপজেলায় একটা মাস্টারপ্ল্যান করে দেওয়া। এখন কারো টাকা থাকলেই ধানি জমি নষ্ট করে দালান তুলছে। কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। এখন থেকে আমরা যেনো এটা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করি। বিশেষ করে কোথায় বসতবাড়ি হবে। যেখানে ভিটেবাড়ি আছে সেটা আলাদা কথা। কিন্তু চট করে ফসলি জমি নিয়ে যখন বাড়িঘর করে ফেলে তখনই সমস্যা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেখা যাচ্ছে যে যেখান থেকে দাবি করছে, সেখানে রাস্তা হচ্ছে। সেটা না করে আমরা যদি এটা পরিকল্পিতভাবে করতে পারি, তবে বেশি মানুষ এটার সুবিধা পাবে। যেহেতু প্রচুর রাস্তা হয়ে গেছে, এতেতো আমাদের কিছু করার নেই। সবচেয়ে মুশকিল হচ্ছে রাস্তাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে একসময় সেই রাস্তা আর কাজে লাগে না। এজন্য বলেছি আমরা যদি তৃণমূল পর্যায়ে একটা মাস্টারপ্ল্যান করে দেই, এখনও যেটুকু সময় আছে আমরা অনেক দ্রুত উন্নত করতে পারবো। তিনি বলেন, আমরা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যতটুকু কাজ এগিয়ে ছিলাম, মাঝখানে ৭ বছরে আমরা যখন ছিলাম না এসময়ে অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যায়। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময় হাতে পেয়েছিলাম বলে অনেকগুলো কাজ করতে পেরেছি। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে গেলে আমাদের সমন্ত পরিকল্পনা নিতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে যে মানুষগুলো বাস করে তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা, তাদের জীবনমান উন্নত করা।

এটা করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই আস্তে আস্তে সমস্ত দেশটাই উন্নত হবে। সেদিকে লক্ষ্য করে এই মন্ত্রণালয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাজেটের সবচেয়ে বড় টাকার অংশটাই এই মন্ত্রণালয়ে আসে। তিনি বলেন, অনেকগুলো কাজ রয়ে গেছে। যেগুলো আমাদের করতে হবে। আমি সব সময় চিন্তা করেছি কীভাবে মানুষের কাছে যাওয়া যায়। মানুষের কাজটা করা যায়। এই মন্ত্রণালয়ের কাজ হচ্ছে সুপেয় পানির নিশ্চয়তা দেওয়া। স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে আবার রাস্তাগুলোকেও উন্নত করতে হয়। বহুমুখী কাজ, আবার জনস্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া। আমি মনে করি যতগুলো মন্ত্রণালয় আছে এই মন্ত্রণালয়টা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।

যারা অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে বারবার ক্ষমতায় এসেছিল তাদের মধ্যে দেশগড়ার চেতনটাই ছিল না। এর ফলে দেশটা অনেক পিছিয়ে ছিল। তৃতীয়বারের মতো এসে এটুকু সান্ত¡না পেলাম যে আমরা কিছু কাজ করার সুযোগ পেলাম। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে আমরা মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছাতে পারি। এর আগে সকাল সোয় ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে এলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আরও বেশি বেশি শ্রম দেওয়ারও তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।