স্বামী নিগৃহীতা ভাতা পাচ্ছেন না বেবি খাতুন

যে স্বপ্ন নিয়ে একটি পরিবারের কোনো একজন নারীর বিয়ে হয়, কখনো কখনো বেশিদিন স্থায়ী হয় না। বিয়ের পর সংসার নামক সুখের সে স্বপ্ন ভেঙে যায় নির্যাতন, যৌতুক বা তালাকের কারণে। তখন একটি মেয়ের জীবনে নেমে আসে দুর্বিসহ অধ্যায়। অনেক নারী তখন বাধ্য হয়ে ফিরে আসে মা বাবার সংসারে। তাদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারগুলোর এমন নারীরা পড়েন বিপাকে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান; পরিবার ও সমাজে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি; আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে তাঁদের মনোবল জোরদার করা; চিকিৎসা সহায়তা ও পুষ্টি সরবরাহ বৃদ্ধিতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে চালু করেছে “বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা”।
জানা যায়, জেলায় প্রায় —নারী স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু এখনও ভাতার আওতায় আসে নি অনেক নারী। এমন একজন স্বামী পরিত্যক্ত নারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার উপরাজরামপুর গ্রামের বেবি খাতুন। ১২ বছর আগে তার স্বামী তাকে তালাক দেন। ফিরে আসতে হয় মা বাবার বাড়িতে। কিন্তু পরে সেখানেও ঠাঁই হয় নি। তাই তিনি এখন একটি ঘর ভাড়া নিয়ে ২ শিশু সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। বাড়িবাড়ি গৃহকর্মীর কাজ করে যা আয় হয় তা দিয়েই জীবন চালাতে হয়। এখন স্বামীর ঘর ছাড়া ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত স্বামী নিগৃহীতা ভাতা পান নি বেবি খাতুন।
৪১ বছর বয়সী নারী বেবি খাতুন তার সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার দেবার জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করে দিনাতিপাত করেন। সকাল ৬ টা থেকে দুপুর ১২ টা এবং বিকেল ৩ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ৪ টি বাড়িতে কাজ করে যা আয় হয় তা দিয়ে তার সংসার চলে। তার জীবনের কথা গুলো এভাবেই বলছিলেন বেবি খাতুন-“আমার বিয়ে হয়ে ছিল বালিয়াডাঙ্গায়। স্বামীটা নেশাভান করতো। আর নেশা করে ঘরে এসে গালাগাল দিত, এমনকি শারীরিক নির্যাতন, আত্যাচার করত। এমন অবস্থার মধ্যেই স্বামী তার অন্য এক মেয়ের পাল্লায় পড়ে এবং আমাকে তালাক দিয়ে সেই মেয়েকে বিয়ে করে। খরচ পাতি কিছু দিত না কারো কাছে ধার করে দিন চালাতাম, বলতাম আপা আমাকে আজ একসের (১ কে.জি) চাল দেনতো আপনার ভাই কাজে গেছে, কাজ করে এলে টাকা দিয়ে দিব। সে যখন বাড়ি ফিরত তখন তাকে বলতাম-ধার শোধের জন্য যখন টাকা চাইতাম তখনই মারধর করত। যখন মার ধর করতো তখন সবাই বলত একটা ছেলে (পুত্রসন্তান) নে তাহলে হয়ত আর মারধর করবে না। আল্লাহর রহমতে পরে একটা ছেলে নিলাম তার দুই বছর পরে আরেকটা ছেলে হল কিন্তু ওর স্বভাব পরিবর্তন হল না। শশুর শাশুড়ি আমার স্বামীকে বকাঝকা করত কিন্তু কোনো তাজ হয় নি। উল্টো সে তার মা বাপকেই মারতে উঠত। এই রকম করতে করতে একদিন আমাকে তালাক দিয়ে দিল, তার পর সবাই বলতে লাগলো তোর তো আর এখানে থাকা হবে না। তখন আমাকে চলে আসতে হল মা বামার বাড়ি”।
বেবি খাতনু বলেন-পরে আমার বাবা আবার আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু আমি আমার লেছেদের কথা ভেবে বিয়ে করতে চাই নি। বিয়ে এসছিল কিন্তু যার সাথে বিয়ে হবে তারও দু তিন জন ছেলেমেয়ে ছিল এবং যে বিয়ে করতে চেয়েছিল সে বলেছিল ‘আমার সেবাটা পরে করলেও চলবে, আগে আমার সন্তানদের সেবা করতে হবে’। বেবি বলেন-“আমার নিজের সন্তানদের কথা ভেবে আমি আর বিয়ে করিনি। বাপের ভারোবাসা নাপেতে পারে কিন্তু মায়ের ভালোবাসা টুকু দেব আমি ওদের মানুষ করব”।
তার পরে ৮ বছর মায়ের বাড়িতে ছিলাম একটি খোলাঘরে কোনো রকমে বাস করতাম। তার পরে ৪ বছর থেকে একটা ভাড়া বাড়িতে আছি। বাড়ি ভাড়া দিয়ে ১ হাজার টাকা হাতে থাকে এই এক হাজার টাকা ১ মাসে ছেলে পিলে নিয়ে খাই। খুব কষ্টে দিন য়ায়, একটা দিন যায় তো আকটা বছর যায়।
বেবি খাতুনের প্রতিবেশী নাবিরা খাতুন ও বিশ্বকা রাণী জানান, টাকার অভাবে ছেলেদের লেখাপড় করাতে পরে নি বেবি খাতুন। বর্তমানে ১৬ বছরের বড়ছেলে রাজমিস্ত্রির সাথে কাজ করে এবং ছোটছেলের বয়স ১৩ বছর। তাকে ৮ মাস আগে আকটা মুদিখানার দোকানে লাগিয়েছে। আমরা দেখেছি, ছেলেরা কোনো জিনিস খেতে চায়লে দিতে পারত না, ছেলেরা জিদ করলে মারধর করত এবং পরে নিজে কাঁদত”।
বেবি খাতুনের জন্য স্বামী নিগৃহিতা ভাতা-বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুর মোহাম্মদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “বর্তমানে জন প্রতি ৫০০ টাকা হারে এ ভাতা সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়। তিনি আরও বলেন- বেবি খাতুন এখনো কেন এ ভাতার বাইরে আছে এবিষয়টা আমার বোধগম্য নয়। তবে ভোটার কার্ড পেলে তাকে এই ভাতার আয়ততায় আনার জন্য প্রয়জনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব”।

বিপাশা রবি দাস
রেডিও মহানন্দা,
চাঁপাইনবাবগঞ্জ।