বিধবা নারী মাতুয়ারা বেগমের জীবন সংগ্রাম

প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে মানুষের জন্ম এবং মৃত্যু অনিবার্য। তবে সে জন্ম যদি হয় কোনো দরিদ্র পরিবারে এবং সে মানুষের মৃত্যু যদি হয় অকাল মৃত্যু তাহলে সে পরিবারে কি সুখ শান্তি থাকে ? থাকে না। দুস্থ দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে সেই পরিবারকে যন্ত্রণাদায়ক জীবন কাটাতে হয়। এমনি এক পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার রাজরামপুর মহল্লার মাতুয়ারা বেগমের পরিবার।
প্রায় ১০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন মাতুয়ারা বেগম। তখন তার ছেলেমেয়েরা ছোট ছিল। স্বামীকে হারিয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দিতে হিমসিম খান তিনি। তাঁর চার ছেলে মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েটির বিয়ে হয় স্বামীর মৃত্যুর আগেই। তিন নাবালক ছেলে মেয়ে নিয়ে পড়েন বিপাকে। তবে গ্রামের লোকেরা তার পাশে দাঁড়ায় এবং তারা তাকে নানা ভাবে সাহায্য করতে থাকে।
মাতুয়ারা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাবার ২ দু বছর আগে তার বড় মেয়ে খাতিজার বিয়ে হয়। গ্রামের লোকেরা অনেক সাহায্য সহযোগিতা করে বড়মেয়ে বিয়েতে। তিনি বলেন-তার মেয়েরও পারিবারিক অবস্থা ভালো নয়, কোনোরকমে দিন কাটে। জামাই রাজমিস্ত্রির কাজ করে। কাজ থাকলে খাবার জোটে আর কাজ না থাকলে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। সে জন্য তার বড় মেয়েও মাকে কোনো ধরনের সাহয্য করতে পারে না।
মাতুয়ারা বলেন-তখন মেজ মেয়ের বয়স ছিল প্রায় ৬ বছর এবং যমজ ছেলে মেয়ের বয়স ছিল ৩ বছর। এবার তার মেজ মেয়ে শারমিন এস.এস.সি পরীক্ষা দিবে এবং ছোট মেয়ে সলেহিন ৮ম শ্রেণীতে দুজনে হরিপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে। অন্যদিকে একমাত্র পুত্র সন্তান মারুফ পড়ে নামোরাজরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে।
মাতুয়ারা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরে বিদ্যুৎ নেই, প্রদীপের আলোয় লেখাপড়া করে তারা। আর কখনো অন্যের বড়িতে ছেলেমেয়েকে নিয়ে তিনি নিজে বসে থেকে পড়িয়ে নিয়ে আসেন। যখন তার ছেলেমেয়েদের খাতা কলমের দরকার হয়, তখন গ্রামের লোকদের কাছ থেকে ছেলে মেয়ের খাতা-কলম এমন কি ফিস টাকাও জোগাড় করতে হয় মাতুয়ারাকে। তবে মানুষের কাছে চায়তে গিয়ে অনেক সময় মানুষের কাছ থেকে অনেক কথাও শুনতে হয়। তারপরও হাল ছাড়েন নি মাতুয়ারা, সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, জমিজায়গা নেই, আছে আধাকাঠা ভিটা মাটি, সে মাটিতে আছে একটি মাত্র ঘর। কিন্তু বর্ষার সময় চাল ফুটো হয়ে জল পড়ে ফলে শান্তিতে ঘুমাতেও পারে না।
প্রতিবেশি অঙ্গরি দেবী ও সাবিত্রী দেবী বলেন, মাতুয়ারা বেগমের স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত তার গ্রামের লোকেরা তাকে সাহায্য করে। তারা যতক্ষণে দুমুঠো চাল ডাল দেয়, ততক্ষণে তিনি তার সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেন। গ্রামের লোকেরা তাদের পুরাতন জামাকাপড় দেয়, কারো দয়া হলে ঈদে নতুন জামাকাপড় দেয়। এভাবেই মেটে তাদের পোশাকের চাহিদা।
মাতুয়ার বেগমের সাথে আলাপকালে তিনি জানান,স্বামীর মৃত্যু প্রায় ১০ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত তিনি বিধবা ভাতার কার্ড পান নি। কার্ডের জন্য কাউন্সিলর, মহিলা কাউন্সিলরসহ অনেকের কাছে গিয়েছেন কিন্তু পান নি। তিনি আজও অপেক্ষা করে বসে আছেন হয়তো তাকে কেউ করে দিবে বিধবা ভাতার কার্ড। সে কার্ড থেকে যে ভাতা পাবেন তা দিয়ে তার সংসারের পূরো খরচ হয়ত চলবে না, কিন্তু তার সংসারের বোঝা কিছুটা হলেও হালকা হবে। এমনটাই মনে করেন তিনি।
এ-বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আহ্সান হাবিবের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিধবা ভাতা পাওয়ার জন্য কোনো বয়স লাগে না। তবে চাহিদার তুলনায় ভূক্তভোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় সবাইকে দিতে পারি না। মাত্র ২টি বিধবা ভাতার কার্ড পেয়েছিলাম এবং ২জনকে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৫০ জন বিধবাভাতার জন্য আবেদন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন-এরপর আসলে যতো দ্রুত সম্ভব মাতুয়ারা বেগমকে ভাতার আওতায় আনার চেষ্টা করবো।

SHARE