মুক্তিযুদ্ধ

<মো. তসলিম উদ্দিন>

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজাহিদগণ বাঙালি ইপিআরদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করে। মুজাহিদদের বলা হতো সেকেন্ড লাইন ফোর্স। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান তৎকালীন প্রতিটি থানায় বর্তমান উপজেলায় একটি করে কোম্পানী গঠন করেন। সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুজাহিদ ছিলো দক্ষ সৈনিক। তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তানে মুজাহিদদের হেড কোয়ার্টার ছিলো রংপুরের ২৩ ব্রিগেড। মেজর বাজুয়া ছিলেন প্রধান। থ্রি-নট, থ্রি-রকেট লাঞ্চার, থার্টি সিক্স এইচ ই হ্যান্ড গ্রেনেড, মেশিনগান, স্টেনগান, টুইঞ্চ মটর প্রভৃতি। মুজাহিদে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিত পাঠান, পাঞ্জাবী, বেলুচ ও বাঙালি ইপিআর। আমরা তাঁদের বলতাম ওস্তাদ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর থানায় মুজাহিদবাহিনী গঠন করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মুজাহিদ বাহিনীর প্রথম ক্যাপ্টেন সাবেক এম,পি এহসান আলী খান। মসজিদপাড়ার কুতুবউদ্দিন, মহারাজপুরের লাল মোহাম্মদ এবং চকঝগড়– গ্রামের আমি তসলিম উদ্দিন ছিলাম মুজাহিদের জেসিও। সুবেদার ছিলেন আব্দুর রশিদ। মুজাহিদ ট্রেনিং প্রথম শুরু হয় বর্তমান জেলা প্রশাসন বিভাগের উপর তলায়। কোর্ট আমবাগানে, সিক্স উইং ইপিআরের মাঠে চলতো হাড়ভাঙ্গা সামরিক প্রশিক্ষণ। বেঙ্গল রেজিমেন্টের জেসিও আব্দুল জলিল, পাঞ্জাবী জেসিও আব্দুল গণি খান ও এফ এফ রেজিমেন্টের সুবেদার আসলাম বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন। গেরিলা প্রশিক্ষণ দিতেন গেরিলা সুবেদার আবুল হোসেন। পাঞ্জাবী হাবিলদার মঞ্জুর এলাহী, সারোয়ার জাহান বেলুচ ও বাঙালি ইপিআর ওস্তাদগণ মুজাহিদদের দক্ষ লাইন ফোর্স হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ দিতেন। এ বাহিনীর সদস্যরা ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাত মার্চের ভাষণের পর স্ব-স্ব এলাকায় যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। ঢাকার পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাকা- শুরুর পর সারা দেশে শুরু হয় বাঙালি ইপিআরদের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর প্রতিরোধ আন্দোলন সারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে দলের দল ইপিআর ও পুলিশ স্ব-স্ব এলাকায় এসে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিক্স উইং এ চলছে অস্থিরতা। এ সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক ছিলেন ইমতিয়াজ মাশরুর। সিক্স উইং কমান্ডার ছিলেন পাঞ্জাবী। সুবেদার মেজর ছিলেন পাঠান। তারা দেশের অবস্থা বিবেচনা করে ছেলে মেয়ে নিয়ে রাজশাহী পালিয়ে যাওয়ার জন্য গোপনে গোপনে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ঘটনার দিন নৈশকালীন হাজিরায় লাইন করা হয়। এ সময় পান্না মিয়া সহ কয়েকজন ইপিআর জোয়ান কৌশলে সিক্স উইং এর কোথখানা বা অস্ত্রগার দখল করে। শুরু হয় প্রচ- গোলাগুলি। তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছেড়ে রাজশাহী অভিমুখে পালিয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় মাইকিং। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী, ইপিআর, আনসার ও মুজাহিদ সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করে। এলাকায় এলাকায় গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। সংগ্রহ হতে থাকে চাউল, ডাল তেল লবন সিগারেট, কেডস, থালা, বাসন, মগ প্রভৃতি। রাণীহাটি থেকে সংগ্রহ করা চাউল-ডালের বস্তাভর্তি করে টমটম গাড়িতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মুজাহিদদের জন্য কমলাকান্তপুর গ্রামের মহসীন আলী, অনুমিয়া, ফজলার রহমান এবং ময়েজউদ্দিন মাষ্টার পাঠাতেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের আমবাগানে পৃথকভাবে চালু করা হয় মুজাহিদ ক্যাম্প। মুজাহিদদের অফিস ছিলো নবাবগঞ্জ কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল শহিদ মুনিমুল হক স্যারের একটি কক্ষে। রান্না চলতো কলেজের আমবাগানে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ইপিআরদের নেতৃত্বে মুজাহিদরা রাজশাহী অভিমুখে এ্যাডভান্স করে। অপর একটি দল গোদাগাড়িতে পজিশনে যায়। এইদিনের একটি স্মরণীয় ঘটনা- একজন ভুয়া বাঙালি মেজর, বাঙালি ড্রাইভারকে নিয়ে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আসার পথে গোদাগাড়ি থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পে মুজাহিদদের ফিরিয়ে নেয়া হয়। তাদের বলা হয় রাজশাহী এখন মুক্তিবাহিনীর দখলে। সন্ধ্যানাগাদ রাজশাহী বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটি। এটি আমাদের জাতীয় সংগীত। গানটি শোনার জন্য উৎগ্রীব ১নং গেটের সামনে ইপিআর মুজাহিদে ঠাসা। সময় গড়িয়ে যায় কিন্তু গান আর বাজেনা। হঠাৎ একটি জীপ এসে ১নং গেট দিয়ে ক্যাম্পে ঢুকলো। এ সংবাদটি দেয়া হলো ডা. মেশবাহুল হক বাচ্চুকে। কারণ পুরো দেশটায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। এ সময় এম.এন.এ ছিলেন বর্ষীয়ান নেতা আলহাজ্ব এ্যাডভোকেট রইশউদ্দিন আহম্মেদ, ডা, মঈন উদ্দিন আহম্মেদ মন্টু, এম.এল.এ খালেদ মিয়া সহ আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ। ডা. মেশবাহুল বাচ্চু সংবাদ পাওয়ার পর ক্যাম্পে ছুটে এলেন। ইপিআর মুজাহিদ যোদ্ধারা অপেক্ষা করছিলেন তাদের কথা শোনার জন্য। ইংরেজিতে কথোপোকথন। চারদিকে শুরু হয়েছে মৃদ গুঞ্জন। বাঙালির মায়ের ভাষা বাংলা, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য শুরু হয়েছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম। অথচ আওয়ামীলীগের ডা. বাচ্চুর কথোপোকথন ইংরেজিতে হওয়ায় স্বাধীনতা সংগ্রামী যোদ্ধারা বিরক্তবোধ করছিলো। ভুয়া মেজরকে বহনকারী বাঙালি ড্রাইভার গোপনে খবর দিলো, তিনি ভুয়া মেজর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী সড়কে স্থানে স্থানে বেরিকেড দেয়া ছিলো সেগুলো সরিয়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইপিআর ক্যাম্পে আসেন। রাজশাহীর অবস্থা ভাল নয়। সেই জীপে মুজাহিদের এক ল্যান্সনায়েক হুমায়ুনকে সাথে নিয়ে গোদাগাড়ির রাস্তায় আবার বেরিকেড দেয়া হয়। সেনা ছাউনির নিয়মকানুন অনুযায়ী অস্ত্রগুলি, গাড়ির চাবি, এম.টি গ্যারেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত‘র কাছে জমা দিতে হয়। সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে দাড়ি সেভ করতে হয়। এম.টি গ্যারেজের হাবিলদার বিষয়টি ইপিআর বাহিনীর নিকট প্রকাশ করলে সকালে ভুয়া মেজরকে আটক করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলখানায় (পুরাতন) বন্দি করা হয়। ছাত্র সংগ্রাম কমিটির সহায়তায় ভুয়া মেজরকে গ্রেফতার ছিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রথম ঘটনা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ইপিআরদের সঙ্গে মুজাহিদবাহিনী রাজশাহী পর্যন্ত অগ্রসর হয়। কাশিয়াডাঙ্গায় ছিলো মুজাহিদবাহিনীর ক্যাম্প। ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী এখান থেকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই পরিচালনা করতেন। এসময় মাঝে মাঝে এয়ার সেলিং করতো রাজশাহীর উপর পাকিস্তানী জেট ফাইটার। কুস্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথপুর আমবাগানে বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর যুদ্ধের সুবিদার্থে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিলো ৭নং সেক্টরের অধীন। বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া ও দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ৭নং সেক্টর। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিলো দিনাজপুরের তরঙ্গপুর। এই সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর কাজী নুরুজ্জামান। পরে তিনি বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত হোন।
শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর খাসেরহাট ছিলো একটি সাব-সেক্টর। এর অধীনে ছিলো শ্যামপুর, দুর্লভপুর ও রাধাকান্তপুর। এই সাব-সেক্টরের দায়িত্ব পালন করতেন ইনচার্জ কমান্ডিং অফিসার মো. মঈনউদ্দিন আহম্মেদ মন্টু। নিয়মিত সেনাবাহিনীর কোন কমান্ডিং অফিসার ছিলোনা। ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী ভারতের লালগোলার সাব-সেক্টরের দায়িত্ব নিলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকার দায়িত্ব নেননি। স্বাভাবিকভাবে স্বল্পকালীন সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডা. মন্টু কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। মুজাহিদ তসলিমউদ্দিন ক্যাম্পে টো-আইসি হিসেবে এই সাব-সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। শ্যামপুর, দুর্লভপুর ও রাধাকান্তপুর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়মিত রেশন, অস্ত্র, গোলাবারুদ পাঠানো এবং এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করাই ছিলো রুটিন ওয়ার্ক। ডা. মন্টু অধিকাংশ সময় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদদ্ধাদের নিয়মিত রেশন সরবরাহ, গুলিগোলা ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে মুক্তিবাহিনীর উর্দ্ধতন কমান্ডিং অফিসার ও মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ভারতের মহদিপুর ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রানজিট ক্যাম্প। ডা. মন্টুর লিখিত নির্দেশ ছাড়া কোন কিছু সরবরাহ করা হতো না। ধোবড়ার পালানু মেম্বারের বাড়ি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাগার। এর দায়িত্ব পালন করতেন ইপিআরের একজন হাবিলদার। পালানু মেম্বারের বাড়ির পশ্চিমে ছিলো সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির অফিস। এ্যাডভোকেট নজরুল, এ্যাডভোকেট বায়রন সহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এ বাড়িতে থাকতেন। ধোবড়ার কলাবাড়ি ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্স। পাগলানদী ও জোহরপুর দাড়ার কারণে শিবগঞ্জ থানা ছিলো বিছিন্ন। অপরদিকে পাগলা নদীর তীর বরাবর সুদীর্ঘ চরাঞ্চল ছিলো একটি স্বাধীন এলাকা।

তদানিন্তন নবাবগঞ্জ মহকুমা শহর মহানন্দা নদীর তেির অবস্থিত।এই মহানন্দা স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি ট্রাজিক স্থান। এই নদীর তীরে রেহাইচর নামক স্থানে শহিদ হোন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। মহানন্দা, পাগলা, পূণর্ভবা, জোহরপুর দাঁড়া, পুঠিমারী বিল, আর্মি স্ট্যাটেজি অনুযায়ী শিবগঞ্জ থানা ছিলো নয়মাসের অধিকাংশ সময় শত্রুমুক্ত এলাকা। তবে মাঝে মধ্যে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিবাহিনীর সহায়তায় ‘মারনা অর ভাগনা ’ পদ্ধতিতে নিরীহ মানুষ হত্যা ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসতো। তারা স্থায়ীভাবে কোন ক্যাম্প স্থাপন করতে পারেনি। সামরিক শক্তিতে বলিয়ান পাকিস্থানী সৈনিকরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট ছিলো অসহায়। চোরা-গোপ্তা হামলার ভয়ে থাকতো তটস্থ। তাই মাঝে মধ্যে রুটিন ডিউটি হিসেবে আতংক সৃষ্টি করতো। ধোবড়ার পতন ঘটলে ও সোনামসজিদ থেকে দাখিল দরওয়াজার জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ছিলো মুক্ত। ধোবড়ার যুদ্ধে ডা. মন্টু এইদিন অল্পের জন্য হানাদার বাহিনীর বুলেটের াাঘাত থেকে প্রাণে বেঁচে যান। বেঁচে যায় জীপের ড্রাইভার আব্দুস শুকুর। ডা. মন্টু তৎক্ষণাত গৌড়বাগানের ভারতীয় আর্টিলারীকে হুকুম দেন ধোবড়ার উপর সেলিং করতে। মুহূর্তের মধ্যে সেলিং শুরু হয়। চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার। উইথড্রো হয়ে চলে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ সময় যদি মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো তবে কানসার্ট থেকে বারোঘরিয়া পর্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ম্যাসাকার হয়ে যেতো। গটতো প্রাণহানি ও ক্ষতি হতো সহায় সম্পদের। প্রতক্ষদর্শীদের সঙ্গে আলাপকালে এর সত্যতা পাওয়া যায়।
আমি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুজাহিদ ট্রেনিংপ্রাপ্ত সেকেন্ড লাইন ফোর্সের একজন সৈনিক। যুদ্ধের মাঠের অভিজ্ঞতার বর্ণনা একজন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য যে ত্যাগ এ ত্যাগই তাদের আজ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম মুখের কথা নয়। পরাধীন দেশগুলির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়লেই বোঝা যায় স্বাধীনতার স্বাদ কী? বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। শষ্য-শ্যামলে ভরা, ফলে-ফসলে সাজানো, গোয়ালের দুধের গায়, নদীতে-পুকুরে মাছ, গরু-মহিষের গাড়ি পালতোলা নৌকা। শ্যামল প্রান্তরে রক্তিম সূর্যতারই প্রতিক এদেশের লাখো মুক্তিযোদ্ধা দেশের ও জাতির গর্ব।

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ শহরে পুঁড়াটুলির ন্যাপের অফিসে ঝাড়-বাতির মতো ঝোলানো বুট-জুতা, খাঁকি পোশাক, রাবার বালিশ, গ্রাউন্ড সীট, আড়াইহাত বিস্তরের মশারী। কখনো কখনো ছোট ছোট মাছ অথবা মহিলা ছাগলের মাংস দু-এক টুকরা। সার্ভিস ল্যাটরিন। শুয়োরের গুঁতোয় পায়খানার টিন উল্টে পরিবেশ বিপর্যয়। সেল্ফ সার্ভিস। যে দেখবে তাকে লম্বা ডা-া দিয়ে পায়খানার টিন ঠিক রাখতে হবে। বাড়ির মায়ের হাতের খানার মত নয়। সবাইকে ক্যাম্পে খানা পাক করতে হতো। সবজির মধ্যে মেশানো ছোট ট্যাংরা বা খুচরা মাছ। পাতের কোণায় ‘ম্যাজিক পাথরের’ মত রাখা হতো। পাত চাটার পরে হজমী বড়ির মতো খাওয়া হতো। ভারতে ঐ সময় তরি-তরকারির মূল্য ছিলো খুবই কড়া ও চড়া। খাসির মাংসের নাম ছিলো মাদি খাসির মাংস। দামের দিক দিয়ে আকাশ ছোঁয়া। হঠাৎ মনে পড়লো অভয় ব্রীজের কাহিনী। দলের দল লোক আসছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বলে পায়ে হাঁটা। অভয় ব্রীজের নিকট ওয়াপদার ঘরে মুজাহিদদের ক্যাম্প ছিলো। যারা আসছে তাদের মধ্যে সন্দেহভাজনকে আটক করা হতো। মুজাহিদ হাবিলদার এজাবুলের ভাই তাজেবুল ছিলো এ ক্যাম্পের চার্জে। বালতিসহ এক ভদ্রলোকের ছেলেকে আটক করা হয়। সম্ভবত এমরান মিয়ার ছেলে। পাকিস্থান হানাদার বাহিনীর একজন গোয়েন্দা। বালতিতে ছিলো ডাল-রুটি, ঘোড়ার খাবারের মতো। মুজাহিদের হাতে ধরা পড়া সেই দালাল লোকটির মতো বহু দালাল, শান্তিবাহিনী, রাজাকার, আলবদর, আলশামস অনেক াাছে। বাঙালি চরিত্র বোঝা বড় মুস্কিল। দশলা চরিত্রের মতো বাঙালির চরিত্র।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ডাকে পঙ্গপালের মতো মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধে। যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো এদেশের আপামর জনতা। অথচ স্বাধীনতার পর ঘটে গেলো বিভৎস ঘটনা। খুন হলেন স্ব-পরিবারে বঙ্গবন্ধু। হত্যা করা হলো জাতীয় চার নেতাকে। খড়গধারী জামায়াত এলো পাকিস্তানীদের প্রেতাত্মা হয়ে। আজও ফণা তুলে দংশিতে উদ্যত। চলছে ভারত বিরোধী প্রচারণা। ভাইফোটা ও রাখিবন্ধন ছিলো ভারতীয়দের আত্মার বন্ধনের আর্শীবাদ। রাস্তার দুধারে চন্দন কাঠের সুগন্ধী ভাইফোটা এবং হাতের কব্জিতে রাখীবন্ধন অটুট থাকুক এই কামনা।

পাকিস্তান একটি আনরেস্ট কান্ট্রি। তাদের চব্বিশ বছরের শাসন শোষণে জর্জরিত বাঙালি আজও বোঝেনি সেই আনরেস্টকান্ট্রির ইতিহাস। ১৯৭১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার শেষ মহকুমা প্রশাসক ছিলেন ইমতিয়াজ মাশরুর। ইপিআর ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার উনিও ছিলেন পাঠান পাঞ্জাবী। ইপিআরের গোয়েন্দা ছিলো তাদের গোত্রীয়। সঙ্গে বাঙালি জোয়ানও থাকতো। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর শুরু হয় দেশের মানুষের মধ্যে অস্থিরতা। জোয়ান জোয়ান দামড়া ছেলেরা পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় ডা-া হাতে গ্রহণ করে প্রশিক্ষণ। লেফট্ রাইট লেফট॥ বাঁশের লাঠি বেওনেট ফাইটিং। অথচ দেশে তখন চলছে পাকিস্তানী শাসন। এ অবস্থায় স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ততো সহজ ছিলোনা। আগুনে পুড়বো তবুও স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়বোনা। ঘরে আছে স্ত্রী, আছে মা ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন। পাকিস্তানের করাচী থেকে ছুটিতে বাড়ি এসে জোটে বাড়ির কাছেই চাকরি।

আমার স্ত্রী চাকরি করেন প্রাইমারীতে। ছোট সংসার। বঙ্গবন্ধুর ডাকে কোমরে গামছা বেঁধে মুজাহিদের দলবল নিয়ে ইপিআর ক্যাম্পে হাযির। যাদুপুর দুর্গাপুরের পানের বরজ এবং সেরিকালচার বোর্ড এলাকা থেকে পাকিস্তানী ইপিআরদের ধরে নিয়ে এসেছে জনতা। অনেক পাঠান পাঞ্জাবী পালিয়ে যায় অথবা জনতা পিটিয়ে মেরেছে। ইপিআর ক্যাম্পে অফিসের সামনে হাজির করা হলো কয়েকজন পাঠান পাঞ্জাবীকে। এর মধ্যে দুজন ছিলেন আমার মুজাহিদ ট্রেনিং এর ওস্তাদ। চোখে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলাম। চোখ অন্যদিকে ঘুড়িয়ে নিলাম। হঠাৎ কানে এলো ‘ইয়ে তসলিম সাব, মুঝে মাফ কারনা – এ পলিটিক্যাল মামলা হায়- আপ হাম ভাই ভাই হায়- হাম সাব মুসলমান হায়।
আজ সেই দেশের পাঠান, পাঞ্জাবী, বেলুচ পাকিস্তানের বাসিন্দা। জ্বলছে পুড়ছে। পাকিস্তান এখন একটি আনরেস্টকান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। শ্যামল প্রান্তে লাল রক্তিম সূর্যের দেশ বাংলাদেশ-মাতৃভূমি। এই মাতৃভূমিতে জন্ম নিয়েছিলো দেশ কুলাঙ্গার শান্তিবাহিনী, রাজাকার, আলবদর, আলশামস। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় আমাকে রাণীহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। যুদ্ধ শেষে আবার সেই স্কুলেই যোগদান করি। শিক্ষকতার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ি দেশ মাতৃকার সেবায় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মফস্বল সাংবাদিক হিসেবে।

আজ আমি এই পৌঢ় বয়সে সেই দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে পথ বেয়ে চলেছি।

মো. তসলিমউদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা প্রতিনিধি দৈনিক ইত্তেফাক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ০১৭১৮২১৯৬৩৪