মহান মুক্তিযুদ্ধের দুটি স্মরণীয় ঘটনা

<মোহা: ইব্রাহিম>

মহান মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর বিচিত্র অভিজ্ঞতার স্মৃতি রোমন্থন করে অনেক সময় দু:খ ও আনন্দে মনপ্রাণ ভারাক্রান্ত ও চঞ্চল হয়ে উঠে। সেই বিচিত্র ও অসংখ্য স্মৃতিমালার দুটি ঘটনা এখানে ব্যক্ত করা হলো।
১৯৭১ সালের জুন-জুলাই এর কথা। আমি তখন মালদা জেলার গৌড় বাগান ইয়থ ক্যাম্পে Political Motivator and Security Officer   হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ক্যাম্পের Administrator ক্যাপ্টেন পানওয়ার (ভারতীয় অফিসার)আমাকে ও আমার বন্দু মইন উদ্দীন মন্ডল (জেলা পরিষদ প্রশাসক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ) কে এবং জনাব আব্দুর রাজ্জাক (প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, তালন্দ হাই স্কুল, তানোর) এই তিনজনকে Political Motivator হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আমার সমসাময়িক ও বন্ধু জনাব আব্দুস সালাম (প্রাক্তন স্বাস্থ্য বিভাগীয় অফিসার) আমাদের সহকর্মী হিসেবে যোগদান করেন। ক্যাম্পে সেই সময় পর্যায়ক্রমে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সমাগত মুক্তিযোদ্ধা প্রাথমিক ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। এই সকল মুক্তিযোদ্ধাদের ০৩টি কখনো কখনো ০৪টি দলে ভাগ করে দিনের বিশেষ একটি সময়ে (সাধারণত সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে) আমরা ৩/৪ জন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তথা কারণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষন করে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও আত্মপ্রত্যয়ী করে সংগঠিত করতাম। তাদের অভাব, অভিযোগ, অসুবিধা ও সমস্যাগুলি তদারক ও চিহ্নিত করে সেগুলি পূরণ করবার জন্য ক্যাপ্টেন পানওয়ারের সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগ ও আলোচনা করতে হতো।
কিছু পাকিস্থানি গোয়েন্দা মুক্তিযোদ্ধা বেশে ক্যাম্পে অবস্থান নিতে পারে সন্দেহে ক্যাপ্টেন পানওয়ার আমাকে সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেন। আমি সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ করতে থাকি। সেখানে একটি ছেলে ছিলো লালচে রঙয়ের সুন্দর। বয়স ১৫/১৬ হবে, নামটি স্মরণে আনতে পারছিনা। বাড়ি সোনামসজিদের ধোবড়া অঞ্চলে। একদিন সেই অঞ্চলের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা (ক্যাম্পে অবস্থানকারী) আমার কাছে ছেলেটি সম্পর্কে রিপোর্ট করল পাকিস্তানি চর বা গোয়েন্দা হিসেবে। ছেলেগুলি সবাই বয়সে সবাই আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট তাই ¯েœহভাজনও বটে। ২/৩ দিন ধরে আমরা তার প্রতি খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখলাম। সেই অঞ্চলের বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও (ক্যাম্পে অবস্থানকারী) তাকে সন্দেহ করলো। ছেলেটা কিছুটা টের পেয়ে একদিন ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আমাদের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সহযোদ্ধা দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেললো এবং আমার কাছে হাজির করে। তারা বাঁশের লাঠি আমার হাতে তুলে দেয় এবং তাকে বেদম প্রহার করার অনুরোধ জানায়। মি. পানোয়ার আমাকে প্রয়োজন বোধে চরম ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা জানিয়েছিলেন। এমন কি ২/৪ জন ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধা (পাকিস্তানি গোয়েন্দা) কে প্রাণে মারলেও কিছু যায় আসেনা বলে আমাকে ক্ষমতার সাহস দিয়েছিলেন। আমি ছেলেটিকে মারতে মারতে রক্তাক্ত করে দিই পাকিস্তানিদের খবর নেওয়ার জন্য। কিন্তু সে আমার হাত পা ধরে এমন মিনতি জানায় যে সে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তাকে কয়েকদিন ক্যাম্পে রেখে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকদিন পর্যবেক্ষণের পরে তার প্রতি আমাদের বিশ্বাস ফিরে আসে। বিধায় অস্ত্র ট্রেনিং-এ পাঠানো হয়। ট্রেনিং শেষে সে যথাযথ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। অবশ্য তার সাথে এ পর্যন্ত সাক্ষাত হয়নি আমার। কিন্তু তাকে যে আমাকে ভুল ভাবে পরিচালিত হয়ে অন্যায় ভাবে প্রহার করতে হয়েছে অনেক সময় এই কথা মনে হলে কী এক গভীর বেদনা বুকে বড় বাজে।

আরও একটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিলো আমার নিজ গ্রাম দোরশিয়ায়। সেখানে অমানবিক হত্যাযজ্ঞ হয়েছিলো অক্টোবর মাসের ১০ তারিখ। দোরশিয়া শিবগঞ্জ থানার/উপজেলার ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের চর অঞ্চলের একটি মাঝারি দোসারি লম্বা গ্রাম। গ্রামটিতে শিক্ষাগত ঔজ্জ্বল্য না থাকলে আমরা প্রায় ১৪/১৫ জন যুবক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম। একদিন গ্রামের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর হিং¯্র দৃষ্টি পড়ে। তারা অক্টোবর মাসের ১০ তারিখ রাত প্রায় ২টা থেকে সেই গ্রামে অতর্কিত গোলাগুলি আরম্ভ করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা গোলাগুলির বিনিময়ে ও সার্বিক প্রতিরোধে তাদের আক্রমন বিলম্বিত হয়। দীর্ঘ সময় গোলাগুলি বিনিময়ের পর ফজরের সময় মুক্তিযোদ্ধারা পিছনে হটতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানী বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। তারা দোরশিয়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রাম রাধাকান্তপুর, বাবরাবোনা, মোল্লাটোলা, গঙ্গাধরপুর গ্রামে কিছু সাধারণ মানুষকেও বিচ্ছিন্নভাবে হত্যা করে।
ঐ রাতে গ্রামের সাধারণ মানুস গ্রাম সংলগ্ন বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। তাঁরা মাছ ধরা শেষ করে ত্রস্ততার সাথে ঘরে ফিরছিলেন। তাঁদের সবাইকে গ্রামের উত্তর মোড়ে একত্রিত করে সারিবদ্ধ করে পাকিস্তানি সেনারা। সেখানে এই সমস্ত মানুষকে শারীরিক নির্যাতন ক’রে গুলি করার জন্য উদ্যত হয়। এই সময় আমাদের গ্রামে মাওঃ সোলাইমান যিনি ভারতের দেওবান্দ মাদ্রাসা থেকে শিক্ষালাভ করে আমাদের মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি ভয়াবহ প্রতিবাদ মুখর হয়ে পড়েন। কারণ মাওঃ সোলাইমান পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে পাকিস্তানি বাহিনীকে জানিয়ে আসতেন। গ্রামের মানুষরা তাঁকে ভয়ঙ্কর শত্রু হিসেবে জানতেন। বস্তুত তাঁর ভূমিকা ও কার্যকারিতা ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী তথা পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু মাওলানার হঠাৎ এ অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন সকলকেই বিস্মিত করে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তিনি প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত নন বরং লাইনের সর্বাগ্রে দাাঁড়িয়ে উর্দ্দূ ভাষায় যে করজোড়ে অনুরোধ করতে লাগলেন তার অর্থ হলো এইসব লোক কোন মুক্তিফৌজ নয় এরা সাধারণ খেটে খাওয়া অশিক্ষিত নিরীহ মানুষ। এদের প্রাণে মারলে সর্বপ্রথমে তাঁকে (মাওলানাকে) মারতে হবে। নইলে একটি গুলিও চালাতে দেবে না। আর গুলি চালাতে হলে তাঁর (মাওলানার) বুকে গুলি চালাতে হবে। এই কথা বলেই তিনি বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন লাইনের সর্বপ্রথমে। তাঁকে পাকিস্তানি সেনারা কয়েকবার এই বুড্ডা হট যাও গুরি মারদেংগা ইত্যাদি বলে চিৎকার করে। কিন্তু সোলাইমান অনড়। শেষ পর্যন্ত সর্বপ্রথম মাওলানা সোলাইমানের বুক বিদীর্ন করেগুলি বেরিয়ে গেল এবং সেই সাথে লাইনে দাঁড়ানো সকলেরই প্রাণ কেড়ে নিলো বর্বর পাকিস্তানি হানাদান বাহিনী।
এই হত্যাযজ্ঞে মোট ৩৯ জন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ শহীদান বরণ করেন। যদিও অনেক দেরিতে তাঁদের স্মরণে গ্রামের উত্তর মোড়ে যেখানে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিলো সেখানে একটি স্মৃতিফলক নির্মান করা হয় ১৯৯৩ সালে। সেই স্মৃতিফলকে ৩৯ জন শহীদের নাম লিখিত ছিলো। ১নং এ উল্লেখ ছিলো মাওঃ সোলাইমানের নাম। প্রসংগত উল্লেখ্য আমাদের অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা আমার অনুজপ্রতিম অবসরপ্রাপ্ত জেলা রেজিস্ট্রার হযরত আলীর আর্তিক আনুকূল্যে শহীদ স্মৃতিফলকটি নির্মিত হয়েছিলো। ১৯৯৩ সালের ১০ অক্টোবর আমার সভাপতিত্বে অনাড়াম্বর কিন্তু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা যথা-রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র দুরুল হুদা, সেরাজুল হক সনি মিয়া, অধ্যাপক এনামুল হক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান সেন্টু প্রমুখের উপস্থিতি প্রয়াত ডাঃ মেসবাহুল হক (বাচ্চু ডাক্তার) ফলকটি উন্মোচন করেন। পদ্মার ভাঙ্গনে ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় স্মৃতিফলক তথা দোরশিয়া গ্রামসহ দিয়াড় (চর) অঞ্চল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শহীদ মাওলানা সোলাইমানসহ গ্রামের শ্রদ্ধেয় শহীদদের বুকের ফলকে ধারণ করা ছাড়া আর কোন স্মৃতি চিহ্ন নেই।
মহান আল্লাহ তাঁদের আত্মাকে শান্তির সাথে হেফাজত করূণ এই কামনা করি।
মোহাঃ ইব্রাহিম-বীর মুক্তিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক, প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ, চাঁপাইবাবগঞ্জ ও সভাপতি, বঙ্গবন্ধু তরুণ লেখক পরিষদ, বাংলাদেশ, চাঁপাইবাবগঞ্জ জেলা শাখা।