প্রণীত হতে যাচ্ছে দেশের নতুন রফতানি নীতিমালা : দীর্ঘায়িত হচ্ছে দেশের রফতানি খাত

আমদানিমুখী অর্থনীতি রফতানিমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হওয়ায় বদলে যাচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। এক সময় শুধু পোশাক শিল্প ছিল পণ্য রফতানির একমাত্র উপাদান। এই পোশাক শিল্পের সাথে রফতানি খাতকে সমৃদ্ধ  করার জন্য পাশে পাওয়া যেত চামড়া শিল্পকে। কিন্তু বর্তমানে দিন বদলের পথে হাঁটছে দেশ। এখন শুধুমাত্র পোশাক শিল্পের উপর দেশের রফতানি খাত নির্ভর করে না। বিশ্ববাজারে ভোক্তাচাহিদার কথা মাথায় রেখে পোশাক শিল্পের উন্নতিকরণ করা হয়েছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে আরো অনেক যুগোপযোগি পণ্য। যার চাহিদা রয়েছে বিশ্বব্যাপী।

দেশে রফতানিযোগ্য পণ্যের কাতারে নতুন সংযুক্ত হয়েছে কাঁকড়া ও কাজু বাদাম। বিশ্ববাজারে কাঁকড়া ও কাজু বাদামের চাহিদা বেশ আগে থেকেই রয়েছে। সামুদ্রিক খাবার হিসেবে কাঁকড়ার জুড়ি নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর চাহিদাও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রকম আরও অনেক খাত যুক্ত করা হবে রফতানি নীতিতে।

দিন দিন দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে প্লাস্টিকের তৈরী পণ্য। টেকসই, আকর্ষণীয় ও সুলভ মূল্যের জন্য সহজেই ক্রেতা সাধারণের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে প্লাস্টিকের তৈরী নানা ধরণের পণ্য। এজন্য প্লাস্টিকের পণ্য তৈরীর কারখানার মালিকগণ তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও যাতে রফতানি করা যায় সে লক্ষ্যে দেশের তৈরী এই প্লাস্টিক পণ্যের জন্য নতুন নীতিমালা আসছে।

রফতানিমুখী পণ্য উৎপাদনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, প্লাস্টিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা, কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নসহ রফতানিমুখী শিল্পের জন্য নানা ধরনের সুবিধার কথা উল্লেখ থাকবে ‘নতুন রফতানি নীতিমালা’তে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, নতুন নীতিতে রফতানি পণ্যে উৎসাহব্যঞ্জক সুবিধার জন্য মূল্য সংযোজন হার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও রফতানি খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে পোশাক খাতকে। নতুন করে এই খাতে সংযোজন করা হবে ডেনিম শিল্প। নতুন করে আরও থাকছে একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট, চামড়াজাত পণ্য, চামড়াজাত জুতা ও সিনথেটিক জুতা। খাতভিত্তিক সুবিধার বিষয়ে নতুন রফতানি নীতিতে তৈরি পোশাক খাতের জন্য বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জে শান্তির চরে গড়ে ওঠা ‘নীটপল্লী’সহ অন্য সকল বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠা ‘পোশাকপল্লী’র অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ইউটিলিটি সুবিধাসহ বর্জ্য বা দূষিত পানি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশ এখনও তুলা আমদানি নির্ভর। এই আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য দেশে তুলার উৎপাদন বাড়ানো হবে। এছাড়াও তুলার বিকল্প পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত হিসেবে চামড়া খাতের জন্য তৈরি পোশাক শিল্পের মতোই সুবিধা দেয়া হবে। চামড়া শিল্পের কাঁচামাল সহজলভ্যকরণ এবং উল্লেখযোগ্যভাবে লিড টাইম কমানোর লক্ষ্যে ‘সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যার হাউস’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। কমপ্লায়েন্ট পাদুকা ও চামড়াজাত শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোকে সবুজ রং শ্রেণিভুক্তকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে বর্জ্য পরিশোধনাগারের (ইটিপি) মাধ্যমে তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিবেশবান্ধব উপায়ে আমদানীকৃত চামড়া প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতি অনুযায়ী পুনঃরফতানির জন্য অনুমতি দেওয়া হবে।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে প্লাস্টিক শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে ইন্টার বন্ড ট্রান্সফার ফ্যাসিলিটিজ প্রদানের লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। প্লাস্টিক খাতের প্রচ্ছন্ন রফতানিকারক ও সাধারণ রফতানিকারক উভয়ের জন্য ইডিএফ (রফতানি উন্নয়ন) তহবিলের মাধ্যমে অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

রফতানি নীতিমালা থেকে বাদ যাবে না দেশের হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পও। শতভাগ রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে এর কারখানা স্থাপনের জন্য সব ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে যুক্তি সংগতভাবে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে। ঔষধ শিল্পের জন্য প্রণীত ‘জাতীয় এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট) ও ল্যাবরেটরি বিকারক উৎপাদন ও রফতানি-সংক্রান্ত নীতি’ বাস্তবায়নে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তথ্য-প্রযুক্তি খাতকে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আইসিটি সেক্টরে কর্মরত মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এছাড়া সার্বিক রফতানিতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ঢাকা শহরের বাইরে উপযুক্ত কোনো জায়গায় একটি আধুনিক অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি সম্প্রসারণ, কনটেইনার টার্মিনালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনপূর্বক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে। রফতানি শিল্পের ফেব্রিকস, স্যাম্পল, কাঁচামাল দ্রুত আমদানি বা পাঠানোর জন্য পোর্টে বা বিমানবন্দরে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ অথবা পৃথক উইন্ডো স্থাপনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

পণ্য রফতানি নীতিকে ‘ব্লু-ইকোনমি’ নীতিতে সংযোজন করা হবে। সরকারের বাস্তবায়নাধীন ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকায় রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি বরাদ্দসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কমপ্লায়েন্স প্রতিপালনে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে।

দেশের রফতানির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৮তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াকে অতিক্রম করে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সকলে।