মাটির হাঁড়ি পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ

<সাহিনা আক্তার>

বাংলাদেশের মৃৎ শিল্পের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সে ঐতিহ্যের রূপকার হলেন কুমোর বা কুমারেরা। কুমারদের মাটি দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহের ইতিহাস হাজার বছরের। এ দেশে কুমার শ্রেণী সাধারণত হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত, তারা ‘পাল’ নামে পরিচিত। বংশপরম্পরায় তারা এ কাজ করে আসছেন। নরম এঁটেল মাটি দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করেন রান্নাঘরের বিভিন্ন তৈজষপত্র ও গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহার্য সামগ্রী। কুমাররা হাঁড়ি, কলসি, ঘড়া, ঘাগড়া, সানকি, প্রদীপ, পাঁজাল বা ধুপচি, পিঠার সাজ, সরা, বাটি, ফুলের টব, প্রতিমা ইত্যাদি তৈরি করেন। কুমাররা এসব সামগ্রী তৈরি করতে চাকা ব্যবহার করে থাকেন। অতীতে নৌকা বোঝাই করে এসব সামগ্রী নিয়ে পালেরা বেশ কয়েক দিনের জন্য বেরিয়ে পড়তেন বিভিন্ন এলাকায়। নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে সেগুলো বিক্রি করতেন। কাঁচা মাটি দিয়ে এসব সামগ্রী বানানোর পর পুড়িয়ে এবং রঙ করে সেগুলো বাজারে বা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করতেন। বর্তমানে ধাতব তৈজসপত্র বাজারে সহজলভ্য হওয়ায় মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা কমে গেছে। তার পরও জীবন জীবিকার তাগিদে তারা বাপদাদার পেশা আঁকড়ে রেখেছেন বহুপরিবার। এ পেশায় থেকে অনেকেই স্বাবলম্বীও হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে একদিকে ধাতব তৈজসপত্রের বাজার দখল অন্যদিকে মাটির অভাবে এ শিল্পটি হুমকির মুখে পড়েছে।
জেলার মৃৎশিল্পের সাতে জড়িতরা বলছেন, এক সময় জমি থেকে মাটি তুলে এনে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। আর এখন অন্য জায়গা থেকে মাটি কিনে এনে বানাতে হয়। তাও আবার মাটি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফলে মৃৎ শিল্পীরা তাদের উৎপাদনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এমনটাই বলছিলেন বারঘরিয়া এলাকার মৃৎ শিল্পী দেবনাথ। তিনি বলেন, আমি মাটির যাবতীয় কাজ করি। যেমন মাটির হাঁড়ি, সানকি, খোলা, ঢাকুন, টব ইত্যাদি। মাটির দাম অনেক বেশি। বিডিআর ক্যাম্প এলাকা থেকে মাটি আনি। আগে ছিল ১০ টাকা নৌকা। এখন ২০০টাকা রিকশা ভ্যান। বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে শুকানোর পর পুড়াই, রং করি, তারপর বিক্রি করি। প্রত্যেকটা ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। আগে মাটির হাড়ির ওপর সকলেরই চাহিদা ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন স্টিল ও প্লাস্টিকের সামগ্রীর কারণে চাহিদা কমে গেছে। আর মাটির দাম বেড়ে যাওয়াই অনেক কুমার এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। তবুও তারা আশা করছেন বাজারের যতই স্টীল ও প্লাস্টিকের হাঁড়ি থাকুক তাদের ঐতিহ্যবাহী এ পেশাটা থাকবে। বৈশাখ মাস হল তাদের মলো মাস, এ মাসে তারা কোনো মাটির জিনিস তৈরি করেন না, শুধু বিক্রি করেন। তারা চৈত্র মাসে মাটি তুলে রাখেন, সে মাটি দিয়ে এক বছর কাজ করেন বলে জানান মৃৎ শিল্পী দেবনাথের স্ত্রী কুমারী রানী। তিনি বলেন-আমার স্বামী হাঁড়ি পাতিল বানায় আমি তাকে সাহায্য করি। কাজটা সকালে শুরু করে দুপুর ১ টা পর্যন্ত করি। আমরা যখন ব্যাবসাটা শুরু করি তখন ব্যাংক থেকে ২০ হাজার টাকা নিই। মাটির কাজ করে সংসার চালিয়েছি, ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছি, ৪ ছেলে মেয়ের লেখাপড়া করিয়েছি। আমার সব মাল বিক্রি হয়ে যায়। চৈত্র মাসে মাটি তুলে নিই কারণ বর্ষাতে মাটি পাওয়া যায় না। আর ওই মাটি দিয়ে ১ বছর কাজ করি।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ৬ নং ইউনিটের ইউনিট ব্যবস্থাপক সাব্বির হোসেন মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, প্রয়াসের কিছু সদস্য আছে যারা কুমারের কাজ করে থাকে। তারা যখন কাজ করে তখন তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, তারা মাটি পায় না, মাটির দাম অনেক। আর যেগুলো তারা তৈরি করে সেগুলোতে তারা দাম পায় না। কিন্তু বর্তমানে আমরা তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করছি, আমরা প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছি, তারা যেন ঠিক মতো কাজটি করতে পারে। তবে এই মৃৎশিল্পীদের তৈরি দৃষ্টিনন্দন দ্রব্য তৈরি করে রফতানি করা গেলে এই পেশায় জড়িত শিল্পীরা মানবেতর জীবন থেকে সচ্ছলতা ফিরে আসবে।

ফেলো
রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম