মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ও মানসিক স্বাস্থ্য

<মহুয়া কাওসার>

আজ “বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস” প্রথমেই আমরা জেনে নেই এই দিবস কখন কিভাবে ও কেন সৃষ্টি হলো ?
আমেরিকান একিউভিষ্ট বা সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনকারী ডোরেনিয়া লিন্ডে ডিফক (১৮০২-১৮৮৭), তিনিই প্রথম উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি মানসিক স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনিই প্রথম মানসিক সেবা প্রতিষ্ঠান American mental Asylum গড়ে তোলেন। পরে উইলিয়াম সুইস্টার মানসিক সুস্থতার এ আন্দোলন কে মানসিক স্বাস্থ্য বা Mental Hygiene নামকরণ করেন। তবে মানসিক স্বাস্থ্য আন্দোলনের মূল পথিকৃত বা জনক হিসাবে ক্লিফোর্ড বিয়াস (১৮৭৬-১৯৪৩) কে বিবেচনা করা হয়। ১৯০৮ সালে তিনি তার আত্মজীবনী মূলক বিখ্যাত গ্রন্থ “A mind that found it itself” রচনা করেন এবং ১৯০৯ সালে National Committee for Mental Hygiene প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে Mental Health American নামে পরিচিত। পরবর্তীতে WHO এবং UNESCO নামক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ১০ই অক্টোবর World Federation for Mental Health এর উদ্দ্যোগে প্রথমবার একটি সম্মেলন করা হয়। এ সম্মেলনে বিশ্বের ১৫০টি দেশ যোগ দেয় এবং তখন থেকেই এই দিনটিকে মানসিক স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

এবার আসা যাক মানসিক স্বাস্থ্য কি ?
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে মানসিকভাবে ব্যক্তির সুস্থতাকে বোঝায়। একজন ব্যক্তি যখন চারপাশের সকল সুশৃঙ্খলতা বা বিশৃঙ্খলতা দেখার পর নিজেকে সুন্দর সুস্থ ও দেশের সুনাগরিক হিসেবে পরিচিতি করাতে পারে তখন তাকে আমরা একনজ সুস্থ মানুষ হিসেবে গণ্য করি। যখন একজন মানুষ সুস্থ থাকে তখন পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মক্ষেত্রে সে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির সাথে সাথে সকলের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে এবং সকলের আস্থাভাজন হতে পারে। অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক মানসিক ও নৈতিক এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মিথক্রিয়ায় আত্মোন্বয়নমূলক জীবনের প্রতিশ্রুতি হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য।

শারীরিক সুস্থতার কথা এ কারণেই আসছে যে, শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। শারীরিক সুস্থতার জন্য আমাদের নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত খেলাধুলা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি প্রয়োজন। আবার মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন বিনোদনমূলক খেলাধুলা, আনন্দদায়ক বই পড়া, সামাজিক রীতিনীতি মূল্যবোধ এসব সম্পর্কে সচেতন থাকা, যেকোনো নেশা জাতীয় দ্রব্যের ধারে কাছে না ঘেষা ইত্যাদি। আর এসব বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমুলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে মানুষ যখন নিজেকে নিয়োজিত করে তখন তার মনে এক ধরনের ঐশ্বরিক প্রশান্তির সৃষ্টি হয় এবং মানবীয় গুণাবলীসহ নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটে। আর যতবেশি নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটে ততবেশি মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠি।

এবার আসি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে আমাদের কি করা উচিত?
মূলতঃ মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের ব্যাপারটি সৃষ্টি হয় পরিবার থেকে। কারণ একটি শিশুর প্রথম বিকাশ হয় তার পরিবারে। সুতরাং পরিবারের সদস্যগণের আচরণ শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতি আদর, অবহেলা, অতিশাসন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে যেমন ব্যহত করে-তেমনি পরিমিত আদর, ভালোবাসা, শাসন, মর্যাদা ও কাজের স্বীকৃতি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করে। সুতরাং পরিবার গুলোকে সুগঠিত হতে হবে আন্তরিকতার সাথে।
সন্তানদের সাথে বন্ধু সুলভ আচরণ করতে হবে, যাতে তারা তাদের ভূল ঠিক সব বলার সাহস পিতা-মাতার কাছে পায়। একজন মানুষ যে সব সময় ঠিক হবে বা ঠিক কাজটি করবে তা নয়, কিন্তু যখন সন্তান কোনো ভূল করবে তখন যদি সে তা বাবা মার কাছে বলতে পারে তাহলে তার শুধরানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। গড়ে ওঠে তার মানসিক ভিত্তি, সুগঠিত হয় তার মানসিক স্বাস্থ্য।
এছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ এখান থেকেই শিশু সহযোগিতা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, আত্মোপলব্ধি ইত্যাদি শিখে থাকে। এরপর সমাজ সংস্কৃতির প্রভাবও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ তাকে যদি তার সামাজিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির সাথে সঠিকভাবে পরিচিত হতে পারে তবে নিশ্চিতভাবে সে একজন উন্নত মনের মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে পারবে।

এবার একটু কন্যা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলি।
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে গেলে আমাদের একটু কন্যা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশি সচেতন হওয়া উচিত। যদিও তুলনামূলকভাবে শহরের সমাজ ব্যবস্থায় নানা এনজিও কাজ করছে বিধায় সচেতনতা একটু বেড়েছে কিন্তু গ্রামের অবস্থার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়েছে বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে বাবা মাকে আরও সচেতন হতে হবে। তার চারপাশের বন্ধু-বান্ধব বা অন্যকারো দ্বারা সে প্রতারিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়টি লক্ষ্য করতে হবে। তবে বয়:বৃদ্ধির সাথে সাথে তার শারীরিক ও মানসিক যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে সেটা নিয়ে অন্তত: মাকে বেশ সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে কন্যা শিশুর উপর আন্তরিকভাবে। বাল্যবিবাহের বিষয়টি রুখতে হবে আরও দৃঢ়ভাবে। বর্তমানে আবার দেখা যায় পুলিশ প্রশাসন বাল্য বিবাহ রুখে আসে যখন, তার এক সপ্তাহ পর পর বাবা মা কোর্টে এসে এভিডেভিট করে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে বিয়েটা ঠিকই দেয়।

এ বিষয়গুলোতে পরিবারকে সচেতন হওয়ায় বিকল্প নেই। এমনকি বিয়ের পরেই সে মানসিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে কিনা সেটিও কিন্তু লক্ষ্যনীয়। বর্তমানে কন্যা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুগঠিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য সুগঠিত হবে। মূলত: একজন নারী তার পারিবারিক শক্ত অবকাঠামা থেকে তৈরি করতে পারে মানসিক ভাবে স্বাস্থ্যবান সুস্থ সন্তান ও সুনাগরিক।