বাদল আছে গাজল নেই

<জাহাঙ্গীর সেলিম>


শীতের শুষ্কতার পর চৈত-বোশেখ-জ্যৈষ্ঠের খরতাপে ধরণী তপ্ত কড়াই-এর মত তেতে ওঠে। বোশেখে দমকা বাতাস ও ঝড় আঘাত হানে। আকাশে কালমেঘের আনাগোণা দেখে আমজনতা উল্লসিত হয়। ঝড়ের সাথে বৃষ্টি নামবে, আবালবৃদ্ধবনিতা সে রকমই আশা করে। গাছে ছোট ছোট আম ঝুলে থাকে। ছোট বড়, কিষাণ-গেরস্থ বধু সকলে কচি আম কুড়ানোর প্রত্যাশায় আম বাগানে ছুটে যায়। ঝড়ের সাথে প্রায় সময় হালকা-মাঝারি বা ভারী বৃষ্টি নামে। ছেলে-ছোকরা, কিশোর-কিশোরীদের আম কুড়ানোর চেয়ে বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ বেশি। মেঘের বর্ষণের সাথে গর্জন ও শীলাবৃষ্টি আনন্দটা আরও বাড়িয়ে দেয়। শীল কুড়িয়ে জমা করে, মুখে পুরে স্বাদ গ্রহণ করত অনেকে। ছোট ছেলেমেয়েদের দাপাদাপি বাড়ে, জমে থাকা বৃষ্টির ওপর গড়াগড়ি করে। অন্যরা ভিজে জবুথবু, বৃষ্টি থামলে ঘরে ফেরে। জ্যৈষ্ঠি মাসে কখনও অনাবৃষ্টি, কখনও মাঝারি বৃষ্টি স্বস্তি বয়ে আনে।
বহু প্রতীক্ষিত বর্ষণ আষাঢ়ে শুরু হয়, তবে কোনো বছর দেরিতে। আবার কোনো বছর কম, সে প্রসঙ্গ আলাদা। আষাঢ়েই কালমেঘের ঘনঘটা, বিদ্যুতের ঘন ঘন ঝিলিক এবং আকাশ ফুটো করে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। দুপুরে বৃষ্টি নামলে আনন্দের সীমা বেড়ে যায়, কিশোর-কিশোরীরা দল বেঁধে আঙ্গিনায় গোসল ও দাপাদাপী করতে নামে। ঘরের চালা বেয়ে ঝর্নার মত পানি গড়ায় এবং আঙ্গিনায় অল্প জমা হয়, তার ওপর নাচন কুদ্দন ও আছড়ে পড়া। ৭-৮ বছর বয়সীরা পা পিছলে কে কত দূর যেতে পারে, এ নিয়ে প্রতিযোগিতা। মা-চাচীরা বার বার তাগাদা দেয়Ñ অনেক হয়েছে বাবা, এবার ওঠ, মাথা মুছে জামা গায়ে দে, ঠা-া লেগে যাবে। কিন্তু কে কার কথা শুনে।
আষাঢ়-শাওন ঘনঘোর বাদলের মাস। সে কী বাদল, দিন নেই-রাত নেই, ঝরছে তো ঝরছেই, কোনো বিরাম ছাড়া। বছরে দু-তিন বার টানা ৫-৭ দিন ধরে গাজল লাগত। গাজলে কিষাণ, মজুর, রাখাল সকলের অফুরন্ত সময়, শুধু ঘরে বসে থাকা। বৌসহ দু-চার ছেলে মেয়ে নিয়ে সবেধন একটাই ঘর। কারও অবশ্য ঘরের সাথে একটা চালা সংযুক্ত। সেখানে একটা খাটিয়া অথবা চৌকির ওপর গাদাগাদি করে বসে থেকে উথাল পাতাল বাদলের খেলা দেখা। কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির ঝাপটায় বসে থাকা যায় না। ঘর থেকে বাহির হবার উপায় থাকে না, ঘরেও মন বসে না। অদূরে গেরস্থ বা মোড়লের বৈঠকখানা মূল বাড়ি থেকে আলাদা, সেখানে বড়দের মনটা পড়ে থাকে। অনেকে সেখানে বাদল উপেক্ষা করে জমা হয়ে খোস গল্প করে। দু‘একটা বিড়ির টান অথবা তামুক সাজিয়ে গুড় গুড় শব্দে হুক্কায় টান দেয়। দু-এক জন অলস বসে থাকার সময়টা কাজে লাগায়। খুঁটিতে পাটের গোছা ঝুলিয়ে ঢ্যারা ঘুরিয়ে দড়ি পাকায়। গোয়াল ঘর থেকে গরু হাম্বা হাম্বা হাঁক দেয়। হাঁকের অর্থ গেরস্থ বুঝে, ভুষিঘর থেকে ভুষি বা খড় দেবার জন্য বেরিয়ে যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকজন থাকে, কেউ যায় আবার কেউ আসে, কিন্তু খালি থাকে না। কেউ আবার পুঁথি পড়তে শুরু করে। বৃষ্টিতে গেরস্থ ও কৃষকের মন ভরে ওঠে। বৃষ্টিতে ভিজে বরেন্দ্র এলাকায় রোপা লাগানোর জন্য জমি চাষ ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত সময় কাটে।
শৈশবে স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের কাছে বাদল আনন্দদায়ক হলেও বিঘœ সৃষ্টি করত স্কুল যাওয়া। ষাটের দশকের কথা, বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে হতো অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে ভিজে বই খাতা বগলে দেবে রওনা স্কুল যাত্রা। পথে জোরে শুরু হলে আম বাগানের কুঁড়ে ঘরে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে হতো। সে সময় কয়েকজন ছাত্র ছাতি মাথায় দিয়ে আসত, তার পাশে দু-একজন ছাতির তলায় যোগ দিত। শিক্ষকরা নিরুপায়, কাদা প্যাঁক মাড়িয়ে লুঙ্গী হাঁটু বরাবর তুলে ছাতা মাথায় দিয়ে সন্তর্পণে স্কুলে উপস্থিত হতেন। প্রধান শিক্ষক খুব নিয়ম কানুন মেনে চলতেন। ছাত্রদের ফাঁকি দেবার উপায় ছিল না। তবুও ছাত্রছাত্রী উপস্থিতি অর্ধেকে নেমে আসত। কিন্তু আনন্দের কমতি থাকত না। খড়ের ছাউনি, শ্রেণিকক্ষের ভেতর কয়েক জায়গায় টপ টপ করে বৃষ্টি পড়ে বেঞ্চ ভিজে একাকার, এ অবস্থা আমাদের বাড়তি আনন্দ যোগাত। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক উপস্থিত হওয়া মাত্র কয়েক সহপাঠী কৌতুক জুড়ে দিত, স্যার ক্লাশ করা যাবে না-বসার জায়গা নেই। শিক্ষক ধমক দিয়ে ঠাঁসাঠাঁসি করে বসতে বলতেন। ছাত্ররা ছুটি ঘোষণা করার জন্য আব্দার করত। ছুটি দেয়া যাবে না, ছুটি চাইলে প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে বল। এ কথা শুনে সবাই চুপ, তাঁর কাছে বলার মত সাহস কারও ছিল না। তবে অবস্থা বেগতিক অর্থাৎ বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ দেখা না গেলে দু-চার ক্লাশ পরে ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠত। স্কুলের নিকটে যাদের বাড়ি তারা বই-খাতা ভিজিয়ে গোল্লাছুটের দৌড় দিত। ছাত্র ও শিক্ষক উপস্থিতি কমে গেলে রেনি ডে হিসেবে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হতো।
টানা গাজলে মেঠো পথগুলোর ওপর দিয়ে পানির ঢল নামত, ছোট বড় গর্ত বা খাল ডোবা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠত। রাস্তা খাল ডোবা পানিতে থৈ থৈ করত। জেলা বোর্ডের প্রশস্ত রাস্তা ডুবত না, রাস্তার পাশে লম্বা খালে পানি জমা হতো। রাস্তায় লোক চলাচল সীমিত হয়ে পড়ত। মাথাল মাথায় সারা শরীর ভিজে জবুথুবু হয়ে দু-চার জন কাদা পানি মাড়িয়ে চলাচল করে। রাস্তার অবশ্য বেহাল দশা, খানাখন্দকে পূর্ণ। পণ্যবাহী কিছু টোপরযুক্ত গরু গাড়ি চলাচল করে।
গেরস্থ ও সাধারণ পরিবারে দুর্গতি নানা ধরনের । গ্রামে দু-চারটি পাকা, বাকি আমজনতার খড়ের ঘর, ২-৩ বছর পর পর নতুন ছাউনি দিতে হয়। ছাওনি পুরানো হলে চালা ফুটো হয়ে বাদলের কিছু অংশ ঘরের মধ্যে চুঁইয়ে পড়ে। গাজলের কী দোষ, সময়মত ঘর ছাওয়া হয়নি। চৌকি-খাটিয়া সরানোর কোনো জায়গা থাকে না। ফলে দিনের মত রাতও নির্ঘুম প্রহর কাটে। দিনে খেটে খাওয়া মজুরদের কাজকর্ম থাকে না, অর্দ্ধাহারে অনাহারে দিন কাটে। গেরস্থ বাড়িতে সমস্যা অন্য রকম, চালের অভাব। গেরস্থ বৌ ধান সিদ্ধ করে শুকাতে না পারার কারণে ঢেঁকি অলস পড়ে থাকে, যদিও ঘরে ধান মজুদ রয়েছে। কারও খড়ির অভাব অথবা পানি চুঁইয়ে খড়ি ভিজে একাকার। চুঙ্গি ফুঁকতে ফুঁকতে গৃহবধূর চোখমুখ লাল হয়ে ওঠেÑ কিন্তু আগুন জ্বলে না। গাজল লাগলেই খিঁচুড়ি খাবার হিড়িক পড়ে যেত। তরিতরকারি ও খড়ির অভাবে খিঁচুড়ি ছিল অনন্য ও সহজ খাদ্য। তবুও কৃষি নির্ভর অর্থনীতির গণজীবনে বর্ষা-বাদলে মুখে হাসি লেগে থাকত। অঝর বৃষ্টির প্রত্যাশা করত সকলেই।
সাম্প্রতিক কালে প্রকৃতিতে বিস্তর পরিবর্তন। বর্ষার সেই পরিবেশ এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবর্তন হয়েছে গণমানুষের জীবনযাত্রায়। তবে জীবনযাত্রার মান অনেক বেড়েছে, দারিদ্রতা হ্রাস পেয়েছে, অবকাঠামোর আমূল উন্নতি, কৃষি উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষির বহুমুখীকরণের পাশাপাশি যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। প্রকৃতির মাঝে বাদলের দেখা যায়, কিন্তু গাজল হারিয়ে গেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মাত্র ৩০ শতাংশ সেচ নির্ভর, বাকী ৭০শতাংশ এখনও প্রকৃতি নির্ভর। সেচ নির্ভর জমিতে ভূগর্ভস্থ অতিরিক্ত পানি উত্তলনের বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান। প্রথম স্তরের পানি অনেক আগে শেষ এবং দ্বিতীয় স্তরের পানির মজুদও অনেক এলাকায় নিঃশেষের পথে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার আরও বাড়তে থাকলে মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। কেননা দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় এ এলাকা এখনও পশ্চাৎপদ এবং কৃষি নির্ভর অর্থনীতি। উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি অশণি সংকেত হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে। কেননা বরেন্দ্র অঞ্চল আবহমান কাল থেকে বন্যামুক্ত উচ্চ ভূমি, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম এবং প্রাকৃতিক উপায়ে পানি রিচার্জ হবার মত ভৌগলিক অবস্থানের বাইরে। যদিও প্রকৃতির আনুকূল্যে এ এলাকা খাদ্যে উদবৃত্ত যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রেখে চলেছে।
খেয়ালি প্রকৃতির চলতি বছরের কথা বিবেচনা করা যাকÑ বছরের শুরুর দিকে কম-বেশি বৃষ্টিপাত হলেও মাঝে দীর্ঘ খরা। মধ্য আষাঢ়ের পর পর্যাপ্ত বৃষ্টি গণমানুষের জন্য সাময়িক স্বস্তি বয়ে আনে, বরেন্দ্র অঞ্চলে রোপা আমন লাগানোর ধূম পড়ে। তারপরে প্রায় মাসখানেকের ব্যবধানে শ্রাবণে কিছুটা বৃষ্টি রোপার সহায়ক হিসেবে দেখা দেয়। কিন্তু ভাল ফলনের জন্য রোপাক্ষেতে নির্দিষ্ট ব্যবধানে আরও কয়েকবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির প্রয়োজন, যদিও ভাদ্রমাস শেষ। কিন্তু কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাত হয়নি। কিন্তু বিগত বছরের (২০১৭) চিত্র ছিল বিপরীতমুখী। বছরজুড়ে অতিরিক্ত বর্ষণ সে সাথে পাহাড়ি ঢল এবং অকাল বন্যার পাশাপাশি ব্যাপক ফসলহানী। হাওর অঞ্চলে তিনবার পর পর বন্যা। ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা যা তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। চলতি বছরের আমন ধানের উৎপাদন কেমন হবে তা নির্ভর করছে প্রকৃতির কৃপার ওপর এবং এজন্য আরও দু‘মাস অপেক্ষা করতে হবে। তবে এ বছর দেশ বন্যার কবল থেকে মুক্ত ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাতের অভাব রয়ে গেছে। তবে বৃষ্টিপাতের সময় এখনও বিদ্যমান রয়েছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রকৃতি নির্ভর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা শতাব্দী পেরিয়ে সহশ্রাব্দ বছর ধরে বিরাজমান। আবহমান কাল ধরে বিবেচিত শস্যভা-ার হিসেবে বরেন্দ্র অঞ্চলে উৎপাদন ব্যবস্থায় কিছু ইন্টারভেনশন দৃশ্যমান, কিন্তু প্রধান ফসল ধান গবেষণায় কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্থাৎ খরা সহিষ্ণু ধান উৎপাদন এখনও দেখা যায় না । এলাকায় সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব বরেন্দ্র অঞ্চলে বেশি করে অনুভূত এবং একইসাথে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে এলাকা বিশেষে অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভারি বর্ষণ, অসময়ে বৃষ্টি জনজীবনে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। শৈশবের বাদল/গাজলের মধুর স্মৃতি নস্টালজিক করে নাগরিক জীবনের বারান্দায় বসে বৃষ্টির খেলা এবং ঝাপটায় বৃষ্টিকণার পরশ গায়ে মেখে। ইদানিং কালে একটু ক্ষণিকের বৃষ্টি নাগরিক জীবনযাত্রাকে ব্যহত করছে ও অশেষ ভোগান্তিতে ঠেলে দিচ্ছে যা শত শত বছর ধরে গ্রামীণ সমাজকে দিয়েছে স্বস্থি এবং জীবন-জীবিকার অন্বেষণ।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

SHARE