জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তোমার পৃথিবী তোমাকেই চায়।

সবুজ শ্যামলে, হরিতে হিরণে ভরা এই সুন্দর পৃথিবী। কিন্তু দূঃখ জনক হলেও সত্য যে, এই মনোরম পৃথিবীটা সম্প্রতি প্রাকৃতিক দূর্যোগের লীলাভূমি হিসেবে আখ্যায়িত। নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেন এ পৃথিবীর মানুষের নিত্যসঙ্গী, বিশেষ করে বাংলাদেশের মত অনুন্নত দেশগুলোর। বিশাল গঙ্গা-যমুনা-মেঘনার প্রবাহ মিলিয়ে প্রায় বার শত নদ নদী বয়ে গেছে এদেশের উপর দিয়ে। তার উপর এদেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে বঙ্গোপসাগর-যার আকাশ অনেকটা উল্টানো ফানেলের মত। ফলে সাগরে ঝড় উঠলেই প্রবল দক্ষিণা হাওয়ার তোড়ে সমুদ্রের লোনা পানি উচু হয়ে পড়ে উপকূল ডিঙ্গিয়ে। এতে সৃষ্টি হয় বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, টর্নেডো, সাইক্লোন; তার সঙ্গে নদী ভাঙ্গন, জমিতে লবণাক্ততার আক্রমণ, কখনোও বা খরা ইত্যাদি। এভাবেই প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে বাস করছি আমরা পৃথিবীর প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ। এমনি নানা দূর্যোগ সাথে নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে, তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে তছনছ করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

জলবায়ু পরিবর্তন কি ঃ মানুষ তার স্বীয় অস্তিত্ব্য টিকিয়ে রাখা ও নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য পৃথিবীকে নানাভাবে জখম করছে। মানুষের ধারণা প্রকৃতির উপর যে কোন উপায়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সবচাইতে জরুরী। এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বন ধ্বংস করে, নদীর প্রবাহ বন্ধ করে, পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করে মানুষ নিজেদের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। মানব জাতির জন্য ভবিষ্যতে অজানা অভূতপূর্ব এক বিপর্যয় আসছে, যার নাম জলবায়ু পরিবর্তন।

জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান লক্ষণসমূহ ঃ একদম শেষ রাতের দিকের ঝড়। দেখতে অন্ধকারের চোখের মত। রাতের সেই ঝড়ের নাম ‘সিডর’, বাংলায় অন্ধকারের চোখ। অস্তিত্বের সবটুকু নিংড়ে নেওয়া ভয়ের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সেই অন্ধকারের চোখ দেখেছিল। বয়ে গেছে ‘সুনামী’, ‘নার্গিস’, ‘বিজলী’, ‘মহসিন’, ‘রোয়ানু’ প্রভৃতি। তারই মধ্যে মানুষ জীবনের চূড়ান্ত ক্ষণ গণনা করেছে। কেউ ফিরে এসেছে, কেউ আসেনি। বাংলাদেশের আকাশ বাতাস আজ অনেক প্রশ্ন ও মৃত্যুর ভারে বিপন্ন। শক্ত সবল পরিশ্রমী ও সাহসী নারী-পুরুষদের হাহাকার ও কান্নার মাতম সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে। এখনো ত্রান পৌঁছেনা অনেক জায়গায়। অনেক জায়গায় মানুষ দাঁতে দাঁত চেপে প্রিয়জনের জন্য কবর খুঁড়ছে। আপনজনদের শুইয়ে দিচ্ছে চিরতরের শয়ানে। কাফনটুকু দেয়ার উপায়টুকু নেই অনেকের। জীবিতদের অনেকেরই এখন প্রধান চিন্তা ঝড়ে বাঁচলেও ক্ষুধা ও মহামারীর হাত থেতে বাঁচবে তো?

এ দূর্যোগ এখনোও শেষ নয়-শেষের শুরু। জাতিসংঘের আইপিসিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বৈশ্বিক উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য পৃথিবীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়ানক হারে বাড়বে। বাংলাদেশও ওই সম্ভাব্য তালিকার শীর্ষে রয়েছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার জন্য আইপিসিসি ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর পরিবেশ বিধ্বংশী কারখানা ও অতিভোগী জীবন ধারাকে দায়ী করেছে। তাছাড়া এ ঘূর্ণিঝড়ে যে মারা পড়েনি, সে পরেরটায় সাবাড় হবে। যে ঘূর্ণিঝড়ে বা পানিতে ডুবে মারা যাবে না, সে মরবে রোগে ও ক্ষুধায় কিংবা স্বল্প সম্পদের কামড়া কামড়িতে। মহাভারতের যুদ্ধেও মানুষ হত্যায় কাতর অর্জুন অস্বীকৃতি জানালে ভগবান শীকৃষ্ণ বলেছিলেন-‘তুমি ওদের কী মারবে, আমি নিয়তি, আমি তো ওদের আগেই মেরে রেখেছি।’ উন্নত বিশ্বের আগ্রাসী পুঁজিবাদ ও ভোগী জীবন আমাদের এভাবেই মেরে রেখেছে। আমাদের জন্য জীবন থেকে জীবন নয়, এক মৃত্যু থেকে আরেক মৃত্যুই বরাদ্দ।

জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, আহাওয়া নিচ্ছে চরম রূপ ঃ পৃথিবীতে কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাতের হার ও তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। ঝড়, তাপ, খরা, শৈত্যপ্রবাহ, বজ্রপাত ও সুনামির মত দুর্যোগ ঘন ঘন বাংলাদেশের উপর হানা দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে নি¤œচাপের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। আগে নি¤œচাপ হলে ১ বা ২ নম্বর সর্তক সংকেত বেশি দেখনো হত। এখন সরাসরি ৫ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখানো হচ্ছে। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ায় প্রায়ই বঙ্গোপসাগর থেকে জেলেদের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যমগুলোতে আসছে। আইপিসিসি প্রতিবেদন বলছে-‘এ প্রবণতা সামনের দিকে আরও বাড়বে।’ বন্য মোকাবেলার জন্য তৈরী করা অবকাঠামোগুলোর সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবককেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৯৫ সালের ৪ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রা ছিল ৪ সে.। ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি তা বেড়ে ৬.২ সে. এ দাঁড়িয়েছে। এভাবে তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ১৯৯৫ সালে ১মে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ছিল ৪৩.৫ সে., সম্প্রতি যশোরে ৪২.৮ সে. তাপমাত্রা প্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০০৬-০৭ সালে শৈত্যপ্রবাহের কারণে মারা গেছে ২০০ জন। মৃতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর ০.০০৩৭ সে. বাড়ছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় তাপমাত্রা ৪০ সে. পর্যন্ত উঠছে। সরকারি হিসেবে গত ১০০ বছরে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ০.৫ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পক্ষান্তরে ভুল জলকাঠামোর সমস্যার উপরে খাঁড়ার ঘা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। শুকিয়ে যাচ্ছে জীবন ও নদী। ১৭টি নদী মরে গেছে, ৮টি মৃতপ্রায়। জলবায়ু পরিবর্তনে আরও নদী বিপন্ন।

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ও খেসারত ঃ ভাটার সময় শান্ত দেখালেও জোয়ারের সময় নদীর দুই পাশের অধিবাসীরা আতঙ্কে থাকে। সকালে গ্রামবাসীরা ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতে পান বাঁধ ভাঙ্গা পানি গ্রামে ঢুকে পড়ছে। তলিয়ে যাচ্ছে ফসলের জমি, চিংড়ি ঘের ও বসতভিটা। এখন চেনা নদী চেনা আবহাওয়ায় অচেনা আচরণ করছে। কিন্তু আমাদের সবার ভাগ্য একই সুতায় গাঁথা হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাতœক প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনের উপর। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র। ঝড়, বন্যা, ও সুনামির মত দুর্যোগের হার আগের চেয়ে বাড়তে থাকায় মিলছে বিপর্যয়ের আলামত।

বিশেষজ্ঞদের মতে- জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ৃ পরিবর্তনের ফলে সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এ দেশগুলোর দায় সবচেয়ে কম। এ যেন উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও চীন বলছে- তারা এ মুহুর্তে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন রোধ সংক্রান্ত কিয়োটা প্রটোকলে স্বাক্ষর করতে রাজি নয়। অথচ তৎকালীন আইপিসিসি চেয়ারম্যান রাজেন্দ্র পাচৌরী বলেছেন-‘জলবায়ু পরিবর্তনে দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। তাদের দায়িত্ব গোটা বিশ্বকেই নিতে হবে।’

জলবায়ু বিপর্যয় বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসে নতুন পদ্ধতি দরকার ঃ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল এরই মধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। সুপেয় পানির সংকট যেখানে নিত্যদিন। গত কয়েক বছর বন্যা, ঝড়, অতিবৃষ্টি কখনোও বা অনাবৃষ্টিসহ নানা ধরণের দুর্যোগ কেবল বাড়েইনি- এসবের ধরণও বদলে যাচ্ছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ২১৫ কি.মি. বেগে সিডর এসেছে উপকূলীয় রাষ্ট্র ওমান থেকে। তাছাড়া এনসো চক্র (এল নিনো ও লা নিনো) পৃথিবীসহ বাংলাদেশে সাইক্লোনের ঝুঁকি বাড়ায়। এনসো চক্রের পূর্বাভাস পাই আমরা বেশ কয়েক বছর আগে থেকে।

১৯৬৩ সালের ২৮-২৯ মে ঘূর্ণিঝড়ে মারা গেছে ১১ হাজার ৫২০ জন, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ২২২ কি.মি. বেগে ঝড় হয়, সঙ্গে ১০-১২ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস, মৃতের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ১৯৮৫ সালে ২৪-২৫ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়, সঙ্গে ১০-১২ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস; মৃতের সংখ্যা ১১ হাজার ৬৯ জন। ১৯৯১ সালে ২৯-৩০ এপ্রিল সাইক্লোনের বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২২৫ কি.মি., মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার। ১৯৯৭ সালে ২৯-৩০ নভেম্বর এল নিনো কার্যকর নিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ২২৪ কি.মি.। তাছাড়া এনসো হল পৃথিবীর জলবায়ু প্রাকৃতিক অংশ আর বর্তমান ধরণের জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে মনুষ্য সৃষ্ট কারণে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায় প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত সমুদ্রের বেলায়। ১৯৫০-১৯৭৫ এর তুলনায় ১৯৭৬-২০০০ মেয়াদে এনসো বছরের হার উল্লেখ্যযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে চরম আবহাওয়া বিপর্যয় এখন থেকে ঘন ঘন ঘটবে এবং তা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। এমতাবস্থায় নিত্য নৈমিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি এড়াতে আবহাওয়া পূর্বাভাসের নতুন পদ্ধতির দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কর্মসূচি ঃ আমরা যদি স্থানীয় পর্যায়ের মানুষদের জন্য সেফটি নেট কর্মসূচি তৈরী করতে পারতাম বা মানুষের দূঃসময়ে যদি স্থানীয় পর্যায়ে কাজ তৈরী করতে পারতাম, বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করতে পারতাম, তাহলে তারা পরিবেশ উদ্বাস্তু হতে পারতো না। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় মানুষের নিজেদের অনেক উদ্যোগ রয়েছে। যেগুলো তারা প্রকৃতির কাছ হতে শিখেছে। একটি হচ্ছে কোপিং, আরেকটি এডাপটেশন। কোপিং হচ্ছে মানিয়ে নেওয়া এর এডাপটেশন হচ্ছে অভিযোজন। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখন ডিজাস্টার কম্পোনেন্ট রয়েছে। যারা ঝুঁকি প্রশমনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাছাড়া সিডিএমপি রয়েছে। আমাদের নাপা ডকুমেন্ট রয়েছে। আমাদের এখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লাইমেট চেঞ্জ সেল কাজ করছে। বিভিন্ন ডোনাররা কাজ করছে। আগের চেয়ে সরকারি মহলেও কিন্তু সচেতনতা অনেক বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল ও সচেতন হয়ে উঠেছে।

সরকারি, স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও এবং কমিউনিটি বেজ্ড অর্গানাইজেশনগুলোর সমন্বয়ে জনগণের আস্থাটা অর্জন করতে হবে। আমাদের স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে, স্থানীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। তাছাড়া ঋঅঙ, টঘওঈঊঋ, টঘউচ, ডঋচ, ডঐঙ, টঘঐঈজ-সহ বিভিন্ন দেশের প্রায় দু’শো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দুর্যোগ পরবর্তী পূনর্বাসন কাজে জাতিসংঘকে সহযোগিতা করে থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিপূরণ বিষয়ে অক্সফামের অবস্থান ও আহ্বান ঃ জলবায়ু পরিবর্তন যাদের জীবনকে সরাসরি আঘাত করছে, অক্সফাম এ রকম প্রায় ১০০টি দেশে তাদের মধ্যে সরাসরি কাজ করে। অক্সফাম প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়- জলবায়ু পরিবর্তনের অনিষ্টকর প্রভাব ঠেকাতে উন্নয়নশীল বছরে যে ৫০ বিলিয়ন ডলার দরকার তার ৮০ শতাংশ জি-৮ ভুক্ত ধনী দেশগুলোর কাছে পাওনা। এটা কোন সাহায্য নয়, এটা হল ধনী দেশগুলোর দ্বারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অপূরনীয় ক্ষতি হওয়ার খেসারত। জাতিসংঘের স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী তাদের জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ ব্যয় করা ও ২০১০ সালের মধ্যে এ পরিমান অর্থ পরিশোধ করার কথা ছিল। অন্যদিকে এখনই যদি কার্বন নিঃসরণ রাতারাতি কমিয়ে আনা না যায় তাহলে এ ব্যয় ওই ৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে আরও ছাড়িয়ে যাবে।

জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক অনুসরণ করে অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী এই দায়ের হার হল- যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ শতাংশ, জাপানের ১৩ শতাংশ, জার্মানির ৭ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ৫ শতাংশ, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা প্রত্যেকের ৪-৫ শতাংশ করে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) বলেছে- বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে কঠিন শিকার হবে আফ্রিকার মানুষ। ২০২০ সালের মধ্যে আড়াই কোটি মানুষ গুরুতর পানির অভাবে ভূগবে। বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে এ বিপদ মোকাবেলায় সহায়তার চ্যালেঞ্জ আজ অক্সফাম এবং অন্যান্য এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট সবার সামনে। বালি বৈঠকে বাংলাদেশের অনমনীয়তাই হতে পারে সমগ্র বিশ্বের অনুন্নত দেশের সরকারের সবল ভূমিকা রাখার মোক্ষম সুযোগ।

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আইপিসিসির চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন ঃ জলবায়ু পরিবর্তন পর্যক্ষেণের জন্য ১৯৮৮ সালে আইপিসিসি গঠিত হয়। ২০০৭ সালের ৬ এপ্রিল আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের ১৪শ পৃষ্ঠার চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরপরই বিশ্ববাসীর টনক নড়ে, সবার দৃষ্টি পড়ে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের দিকে। আইপিসিসির চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেল্সে। এতে বলা হয় গ্লোবাল ওয়ার্মিং অব্যহত থাকলে এ শতাব্দীতে জীবজগতের বেশির ভাগ প্রজাতির জন্য চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে। গ্রীন হাউজ গ্যাসের কারণে জলবায়ুর ধরণের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য মানুষই দায়ী। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ৯০ শতাংশ ঘটাচ্ছে মানুষ। (এএফপি, সিএনএন, বিবিসি)।

পৃথিবীর ৬টি মহাদেশের ২০০ জন বিশেষজ্ঞর ৪ বছরের কাজের ফসল এ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি তিনটি ওয়ার্কিং গ্রুপ মিলে তিনটি খন্ডে প্রকাশ করেছে। প্রথম খন্ডে দেয়া হয়েছে-জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। দ্বিতীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণের উপায় আলোকপাত করেছে। জাতিসংঘের রিপোর্টে উল্লেখ্য করা হয়- এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের ১০০ কোটিরও বেশি লোক ২০৫০ সালের মধ্যে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় সেচ ব্যাহত হবে।

যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তন সব সেক্টরকে আঘাত করছে তাই এটি নিয়ন্ত্রণ অতি জরুরী। সেই লক্ষে ১৯৯২, ২০০২ এবং ২০১২ সালে ধরিত্রী সম্মেলন হয়েছিল। বালিতে এরই ১৩তম সেশন হল ২০০৭এর ডিসেম্বরে। প্রচুর আলোচনা ও কাজ চলছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭ জাতিসংঘের বৈঠকে আমাদের সরকার প্রধান বলেছেন- ‘আমরা ডুবে যাচ্ছি, খরায় পুড়ছি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি; অথচ এর জন্য আমরা দায়ী না।’ আইপিসিসিতে মার্কিন প্রতিনিধি শ্যারন হেজ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যেহেতু এই পৃথিবী আমাদের-আমার সুতরাং এতটুকু সচেতনতায় অদূর ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের অবনতি রোধ করতে পারে। তবে সেই অদূরটা কত দূর সেটাই আমাদের সকলের দেখার বিষয়।

সাঈদ কামরুল
নয়াগোলা মোড়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

SHARE