কলা বিক্রি করে দুই বৃদ্ধ নারীর জীবিকা নির্বাহ

ডি এম কপোত নবী :

শ্রম দিলে জীবিকা নির্বাহ সম্ভব। আর তাই বারঘোরিয়া দৃষ্টি নন্দন পার্কে বৃদ্ধ বয়সেও কলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ২ নারী।
জীবন-জীবিকার তাগিদে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দরিদ্র নারীরা নানা রকম কাজ করে থাকেন। নারীরা এখন অতীতের তুলনায় অনেক কর্মমুখী এবং স্বাবলম্বী। সামাজিক অবস্থার কারণে নারীরা এক সময় তেমন ঘরের বাইরে বের হতো না। শুধু বাড়ির মধ্যেই ছিল তাদের কর্মক্ষেত্র। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা এখন আর নেই। দৈনন্দিন জীবন-যাপনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কেবল পুরুষদের আয়ে অনেক পরিবারে এখন আর সংসার চলে না। তাই সংসারে আয় বৃদ্ধির জন্য এবং জীবন যাত্রার মানোন্নয়নে গ্রামের দরিদ্র নারীরা বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালনসহ কুটির শিল্প, মাছ চাষ, খাল খনন, রাস্তা মেরামত, নির্মাণ কাজ, ইট-পাথর ভাঙা, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ কৃষি কাজের মতো কঠিন পরিশ্রমও করছে।


কাক ডাকা ভোরেই পান্তাভাত খেয়ে নিত্যদিনের কাজে ছুটছেন তারা। ক্লান্তহীন দেহে রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে পুরুষদের পাশাপাশি রুটি রুজির সৎ ও পরিশ্রমের পথ বেছে নিয়েছে জেলার অসংখ্য নারী। এদের অধিকাংশ স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা অথবা অসচ্ছল পরিবারের। স্বামীর যৌতুকের বলি, শাশুড়ি, ননদের নির্যাতন প্রভৃতি কারণে ঘর সংসার করতে না পেরে দরিদ্র পিতা ও ভাইদের সংসারের বোঝা না হয়ে নারীরা এখন আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এদের ভূমিকা যথেষ্ট বিদ্যমান। তা ছাড়া এ সব গ্রামীণ হতদরিদ্র নারীরা আর্থিক সচ্ছলতার জন্য এ অঞ্চলের প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটিসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে স্বল্প মেয়াদে ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করছেন। নারীরা এখন ধর্মীয় অনুশাসন ভেঙে বেরিয়ে পড়েছেন কর্মক্ষেত্রে। জীবন জীবিকার তাগিদে এ সব নারীদের হাত হয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতিয়ার।

শ্রমতী রানী ও শ্রীমতী বিশকা রানী প্রায় ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে কলা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। দুজনেরি স্বামী ১৮-২০ বছর আগেই গত হয়েছেন। তাই কলা বিক্রি করেই ছেলে মেয়েকে করেছেন স্বাবলম্বী। বিয়ে দিয়ে এখন ছেলেমেয়েরা যে যার মতো সংসার করছেন। কারও উপর ভরসা কিংবা ভিক্ষার ঝুলি হাতে না নিয়ে কাজ করে বেঁচে আছেন তাঁরা।


শনিবার বিকেলে বারঘোরিয়া বাজারে গেলে দেখা যায়, চার পাঁচটা ডালিতে ভর্তি পাকা কলা। কলার দামের রয়েছে তারতম্য। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শ্রীমতী রানী দৈনিক গৌড় বাংলাকে জানান, সেই কবে আমার স্বামী মারা গেছে। সে মারা যাবার পর ৪ ছেলে ও ১ মেয়েকে মানুষ করেছি। সবার বিয়ে দিয়েছি। যে যার মতো সকলেই ভালো আছে। ছেলেরা মতো ব্যস্ত, আমার কোনো খোঁজ খবর নেয় না। অপর দিকে শ্রীমতী বিশকা রানী দৈনিক গৌড় বাংলাকে জানান, আমারও স্বামী ২০ বছর আগে মারা গেছে। আমিও বহু কষ্টে ১ ছেলে ও ১ মেয়েকে বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। ওরা সকলে ভালো আছে। যতদিন বেঁচে আছি কাজ করেই বাঁচতে চাই। তিনি আরও জানান, একেক দিন একেক রকম বেচাকেনা হয়। কোনদিন ২ হাজার টাকা বিক্রি হয় আবার কোন দিন ১ হাজার টাকারও কলা বিক্রি হয় না। আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের রেল স্টেশন এর কাছে কলা পট্টি থেকে কলা এনে এখানে কিক্রি করি। আমি আর শ্রীমতী রানী পাশাপাশি একই স্থানে বসে কলা বিক্রি করি।

প্রায় ষাট বছরের এই কর্মজীবী নারীদ্বয় উচ্চস্বরে বলেন ভিক্ষার ঝুলি হাতে না নিয়ে কাজ করে বেঁচে থাকাটাকেই ভালো মনে করি।