কিশোর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জানা প্রয়োজন

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল : একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন রকমের পরিবর্তনের মধ্যে বড় হতে থাকে। এক সময় তার দাঁত গজায়, সে হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে। একজন শিশু যখন কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করে তখন তার শারীরিক বা মানসিক নানা ধরনের পরিবর্তন হয়ে থাকে। তবে পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া শুরু হয় সাধারণত ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই। জীবনের যে সময়টাতে কিশোর-কিশোরীরা যৌবনে প্রবেশ করে সেটাই হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকাল। এসময়ে কিশোর-কিশোরীর শারীরিক বা মানসিক পরিবর্তন হয়। মানসিক পরিবর্তনের ফলে তারা আবেগপ্রবণ হয়, আবেগ তাড়িত হয়ে কাজ করতে চায়। বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কৌতুহল বা আকর্ষণ বোধ করে। মনের মধ্যে অজানা একটা ভালবাসার আবেগ তৈরি হয়। এই ভাললাগাটা অনেক সময় ভালবাসার মোহতে পরিণত হয় যা অনেক সময় মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিশোর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের রওশন আরা বেগম বলেন-বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েদের বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন হয়, দ্রুত উচ্চতা বাড়ে, ওজন বাড়ে, চামড়া তেলতেলে হয়, সব স্থায়ী দাঁত উঠতে শুরু করে। দাড়ি গোঁফ উঠতে শুরু করে, হাত পা বগল বা লিঙ্গে/জারায়ুর চারপাশে অর্থাৎ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চুল গজানো শুরু হয়। ঘাম বেশী হতে থাকে, বুক ও কাঁধ বড় হয়, মেয়েদের স্তন বড় হয়, স্বপ্নদোষ হয়, মেয়েদের মাসিক শুরু হয়। শারীরিক এ পরিবর্তনগুলো খুব স্বাভাবিক। এ-সময়ে আমাদের মগজে অর্থাৎ মস্তিস্কে কিছু হরমোন তৈরি হয়। সেই হরমোন রক্তের সাথে মিশে এসব পরিবর্তন ঘটায়। আসলে কিশোর বয়সে ছেলে মেয়েরা মন খুলে কথা বলতে পারে না। শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি তাদের কিছু অসুবিধার সম্মুখিন হতে হয়। সেগুলো যদি মা-বাবা, ভাই-বোন বা নিকট আত্বীয়রা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলেন, তাহলে ছেলে-মেয়েরা এই শারীরিক পরিবর্তনগুলো ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।

বারোঘরিয়া এলাকার আশিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমি প্রজনন স্বাস্থসেবা বিষয়ে সচেতন, আমার কোনো সমস্যা হলে আমার পাশের কমিউিনিটি ক্লিনিকে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকি। সেখানে আমাকে বলে, মাসিক হওয়ার সময় পরিষ্কার কাপড় পরিধান করতে এবং প্যাড ব্যবহার করতে। আমি তাদের কথা মতো প্যাড ব্যবহার করি এবং এসময়ে আমি আয়রণ জাতীয় খাবার খেয়ে থাকি।
সবার আগে মা-বাবাকে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। যাতে তারা সব বিষয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে পারে। কিশোর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

এবিষয়ে বারোঘরিয়া পরিবার পরিকল্পনার পরিদর্শক পান্ডব কুমার সিংহ বলেন, মেয়েদের মাসিক হওয়ার সময় তাদেরকে আমরা প্যাড ব্যাবহার করতে পরামর্শ দিই। যাদের প্যাড ব্যবহার করার সামর্থ নেই তাদেরকে বলি তারা যেন একটা কাপড় ব্যবহার করার পর সেই কাপড় ভালো করে গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করে, তাহলে তাতে কোনো রোগজীবাণু থাকবে না। সেই কাপড় ব্যবহার করলে কোনো সমস্যা হবেনা।

মেয়েদের মাসিকের সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবিষয়ে আরো বলছিলেন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির স্বাস্থ্য সমৃদ্ধি কর্মসূচি শরিফুল ইসলাম সোহেল। তিনি বলেন কিশোর কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালে যে দৈহিক পরিবর্তন হয়, এসময় তাদের বেশি জ্ঞান থাকে না, সে জন্য পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোনের উচিত প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবহিত করা। এই সময়ে দৈহিক বা মানসিক পরিবর্তন ঘটে এই জন্য তাদের পুষ্টিকর বা সুষম খাবার খাওয়া দরকার। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে আয়রণ জাতীয় খাবার খেতে হবে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদেরকে জানাতে হবে। প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে তাদের সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়তে পারবে। এজন্য বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের প্রতি প্রত্যেক মা-বাবার উচিত তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করা।

আজ যারা কিশোর কিশোরী পরবর্তীতে তারাই হবে দম্পতি, তাই পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সকলের জানা উচিত। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুস সালাম বলেন, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে তার মধ্যে থেকে দম্পতিরা তাদের পছন্দমতো যেকোনো পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন। তিনি বলেন-বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে যখন একটি স্বচ্ছ ধারণা হবে, তখন তার মধ্যে থেকে যেকোন একটি পদ্ধতি বেছে নেওয়া সহজ হবে। দীর্ঘ মেয়াদি পদ্ধতির মধ্যে একটি হচ্ছে ইমপ্লান্ট যেটি ১ রড বিশিষ্ট সেটির মেয়াদ থাকে ৩ বছর, যেটি ২ রড বিশিষ্ট সেটির মেয়াদ থাকে ৫ বছর। আরেকটি হলো আইইউডি এটি একটি ছোট ইংরেজী টি আকৃতির মতো যা রুপা, তামা ও প্লাষ্টিকের হয়ে থাকে। যা মেয়েদের জরায়ুর মধ্যে পরানো হয়ে থাকে। আইইউডির মেয়াদ দীর্ঘ ১০ বছর। এই পদ্ধতিতে প্রতিদিন কনডম বা বড়ি খাওয়ার ঝামেলা নাই। তাই দম্পতিরা তাদের পছন্দমত যেকোন পদ্ধতি বেছে নিয়ে সুখী জীবন যাপন করতে পারবে। তবে অবশ্যই যেকোন পদ্ধতি গ্রহণ করার সময় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করবেন। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিবার পরিকল্পনার হার বেড়েছে, এখন অনেকে সচেতন। সরকারি কর্মসূচীর পাশাপাশি কিশোর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে এখন কাজ করছে কমিউনিটি রেডিওগুলো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের একমাত্র কমিউনিটি রেডিও-রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম। পরিবার পরিকল্পনা ও কিশোর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে টকশো, ম্যাগজিন ও সচেতনতামূলক প্রোমো বাজিয়ে থাকে। গণমাধ্যম হিসেবে জেলা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ও রেডিওতে পরিবার পরিকল্পনার সুফল সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আসছে। পরিবারে এমন অনুকুল পরিবেশ তৈরী করতে হবে যাতে তারা সকল বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে। একজন কিশোর কিশোরীর স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবনের যে শিক্ষা পায় তা পরবর্তী জীবনে তা প্রতিফলিত হয়। বয়ঃসন্ধিকালে একটি ভুল সারাজীবনের জন্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং একটু পদস্থলন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেহেতু বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা বিশেষ করে প্রজনন কালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা একটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী