ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধু

“আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান-একবার মরে, দুইবার মরে না”
উল্লেখিত উক্তিটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, ১৯৭১ সালে যার মোহন বাঁশিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুর বেজে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুকে আটকে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে ফাঁসির মধ্যে দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল পাকিস্তানিরা। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে দেখিয়ে তাঁর সেলের পাশেই কবর খুঁড়েছিলো পাকিস্তানিরা। তখন পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে উক্ত উক্তিটি করেন বঙ্গবন্ধু। ফাঁসির পর তার লাশটি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার আবেদনও জানিয়েছিলেন যেন বাঙালিরা তার লাশটি যথাযথ মর্যাদা ও ইসলামী নিয়মে তাঁকে দাফন করার সুযোগ পায়। অবিশাস্য মনে হলেও সত্য এই রকম একজন ধর্মপ্রাণ মহান মানুষের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় ইসলাম ধর্ম বিরোধিতার অভিযোগ এনে অপদস্থ করার চেষ্টা হয়েছে অসংখ্যবার। এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যার ৩৩ বছর পরেও বর্তমানে তথাকথিত ইসলামীভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন নেতাকর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মবিরোধীতার অভিযোগ এনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগকে অপমানের অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। অথচ বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার চেতনার অধিকারী একজন খাঁটি ঈমানদার মুসলমান। তিনি কখনও ইসলামকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি। বাংলাদেশকে সকল ধর্মের সকল মানুষের জন্য শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন সদা সচেস্ট। বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও স্বাধীনতা বিরোধীরা বিভিন্ন ধরণের কুৎসা রটানোতে লিপ্ত আছে। অথচ ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষদের একজন ছিলেন দরবেশ শেখ আউয়াল, যিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ:)-এর প্রিয় সঙ্গী ছিলেন। ১৪৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি বাগদাদ থেকে বঙ্গে আগমন করেন। পরবর্তীকালে তাঁরই উত্তর-পুরুষেরা আধুনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। জাতির জনক হচ্ছেন, ইসলাম প্রচারক শেখ আউয়ালের সপ্তম অধঃস্তন বংশধর। ইসলাম ধর্ম সহ অন্যান্য ধর্মের পৃষ্টপোষকতায় অসংখ্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনার জন্য আয়োজিত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ দৃঢ়কন্ঠে ঘোষণা করেন: “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার স্ব-স্ব অধিকার অব্যাহত থাকবে। আমরা আইন করে ধর্ম চর্চা বন্ধ করতে চাইনা এবং তা করবওনা। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের কারো নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না, বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। আমাদের আপত্তি হলো এইযে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবেনা। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব,ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে”। ১৯৭৫ সালে ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা, প্রচার-প্রসার ও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামগ্রিক জীবনকে মহান ইসলামের কল্যাণময় স্রোতধারায় সঞ্জীবিত করার মহান লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। এছাড়াও ইসলামের পৃষ্টপোষকতায় নেওয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ সমূহ হচ্ছে, সীরাত মজলিশ প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুণর্গঠন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:), শব-ই কদর,শব-ই বরাত উপলক্ষে সরকারী ছুটি ঘোষণা, বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গিতে সরকারী জায়গা বরাদ্দ দান,রাশিয়াতে প্রথম তাবলীগ জামায়াত প্রেরণের ব্যবস্থা,আরব-ইসরাঈল যুদ্ধে আরব বিশ্বের পক্ষ সমর্থন ও সাহায্য প্রেরণ,ও আই সি সম্মেলনে যোগদান ও মুসলিম বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি। ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যুগান্তকারী অবদানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বঙ্গবন্ধু তাঁর সাড়ে তিন বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামল ইসলামের খেদমতে যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন গোটা পৃথিবীতে তার দৃষ্টান্ত বিরল। তবুও ইসলামের লেবাসধারী একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম-বিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছিল যা এখনও চলছে নানা কৌশলে, নানা আঙ্গিকে।