উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি পেলো বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠতে যে শর্ত দরকার, তা পূরণ করায় আবেদন করার যোগ্য হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। এর মধ্য দিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের পথে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হল। আগামি ২০২৪ সালে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটবে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এই ঘোষণা সংক্রান্ত চিঠি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের কাছে হস্তান্তর করেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতের হাতে চিঠিটি তুলে দেন সিপিডি সেক্রেটারিয়েটের প্রধান রোলান্ড মোলেরাস। বিশ্ব ব্যাংকের বিবেচনায় বাংলাদেশ ২০১৫ সালের জুলাই মাসে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। এখন জাতিসং ঘের মাপকাঠিতেও বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটছে। জাতিসংঘ সদস্য দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত (এলডিসি), উন্নয়নশীল ও উন্নত এ তিন পর্যায়ে বিবেচনা করে। ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই) এই তিন শর্ত পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন যোগ্যতা অর্জন করল, ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। স্বীকৃতিপত্র দেওয়ার অনুষ্ঠানে সিডিপি এক্সপার্ট গ্রুপের চেয়ার প্রফেসর হোসে অ্যান্তোনিও ওকাম্পো, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ফেকিতামইলোয়া কাতোয়া উটইকামানু, জাতিসংঘে বেলজিয়ামের স্থায়ী প্রতিনিধি মার্ক পিস্টিন, তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধি ফেরিদূন হাদী সিনিরলিওলু, ইউএনডিপির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক ও জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হাওলিয়াং ঝু এবং ইউএনডিপির মানবিক উন্নয়ন রিপোর্ট অফিসের পরিচালক সেলিম জাহান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার উপর একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে অর্থনীতির অগ্রযাত্রা দেখানো হয় এতে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কীভাবে দেশ এগিয়ে চলছে এবং কৃত্রিম উপগ্রহও মহাকাশে পাঠাচ্ছে, তা দেখানো হয় ভিডিওচিত্রে। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বলেন, আমাদের সকলের জন্য আজ এক ঐতিহাসিক দিন। অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনাদের জানাচ্ছি যে বাংলাদেশ এই প্রথম এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের সকল শর্ত পূরণ করেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসক) এর মানদ- অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১২৭৪ ডলার। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, মাথাপিছু আয় এখন ১৬১০ ডলার। ইকোসকের মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে ৬৪ পয়েন্টের প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের আছে ৭২। অর্থনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ২৫ দশমিক ২। এই পয়েন্ট ৩৬ এর বেশি হলে এলডিসিভুক্ত হয়, ৩২ এ আনার পর উন্নয়নশীল দেশে যোগ্যতা অর্জন হয়। মাসুদ বিন মোমেন বলেন, এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে। কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না -এই প্রতিশ্রুতি ধারণ করে আমরা শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের জন্য শুধু একটি স্লোগানই নয়, সারা দেশের মানুষ আজ এর সুবিধা পাচ্ছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উঠতে বাংলাদেশ সচেষ্ট বলে জানান তিনি। বাংলাদেশকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য জাতিসংঘসহ বাংলাদেশের সব উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান মাসুদ বিন মোমেন। চিঠি হস্তান্তরের পর সিপিডি সেক্রেটারিয়েটের প্রধান রোলান্ড মোলেরাস বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের কাক্সিক্ষত বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সামাজিক খাতগুলোর ব্যাপক উন্নয়ন এই উত্তরণের ক্ষেত্রে কমিটির সুপারিশ করাকে সহজ করেছে। সিপিডি এক্সপার্ট গ্রুপের চেয়ার হোসে অ্যান্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশের গতিশীল রপ্তানি খাত, মানবিক সম্পদ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের ব্যাপক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। জাতিসংঘের এলডিসি, এলএলডিসি ও সিডস্ সংক্রান্ত কার্যালয়ের প্রতিনিধি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল উটইকামানু বলেন, দ্রারিদ্র্য হ্রাস ও উন্নয়নের অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্যে অন্য দেশগুলোর কূটনীতিকরাও বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে জনগণ ও সরকারকে অভিনন্দন জানান।