কমানো যায় জনসংখ্যা জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহণে

17

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

নারী ও পুরুষ উভয়ের সিদ্ধান্তে গঠিত হয় একটি পরিকল্পিত পরিবার। আর এই পরিকল্পিত পরিবার হচ্ছে সুখে শান্তিতে জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। পরিবার পরিকল্পনা মানে শুধু জনসংখ্যা কমানো নয়, সামগ্রিক জীবনকে পরিকল্পিতভাবে চালানোর পরিকল্পনাই পরিবার পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সুদৃঢ়ভাবে পরিকল্পিত পারিবারিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার দ্বারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা গর্ভবিরতি করণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। অনেক ধরনের নিরাপদ এবং কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। তবে এখনো সচেতনতার অভাবে সঠিক সময়ে অনেক দম্পতি সঠিক পদ্ধতি নিতে পারে না বলে পড়তে হয় নানান জটিলতায়। পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতিগুলো গ্রহণের মধ্যে আমাদের দেশের বেশীরভাগ নারীরা খাবার বড়ি এবং পুরুষরা কনডম বেশি ব্যবহার করে থাকেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন কনডম কিংবা বড়ির থেকে স্থায়ী বা অস্থায়ী পদ্ধতি নেয়া ভালো। কারণ হিসেবে তারা বলছেন যদি বড়িখান তাহলে অনেক সময় খেতে ভুলে যান। ফলে না চায়লেও অনাকাঙ্খিতভাবে গর্ভধারণ হয়ে যায়। আর যদি একদিন কোন কারণে বড়ি খেতে ভুলে যান তাহলে পরের দিন যখনই মনে পড়বে তখনই বড়িটি খেতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে ওই দিনের বড়িটিও খেতে হবে। পরপর দুদিন বড়ি খেতে ভুলে গেলে পরের দুদিন ২টি করে বড়ি খেতে হবে এবং ওই বড়ির পাতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড়ির পাশাপাশি কনডম ব্যবহার করতে হবে। অনেকই আয়রণ বড়ি সেবন করেন না, ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। অথচ আয়রণ বড়িগুলো সেবন করলে রক্তস্বল্পতা হ্রাস পায়। আরো একটি সমস্যা হচ্ছে পুরুষরা সহজে স্থায়ী কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে চান না। তবে তারা কনডম ব্যবহার করেন। কনডম ব্যবহারের ফলে জন্মনিরোধের পাশাপাশি যৌনবাহিত রোগ ও এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে সহায়তা করে এটির কোন পার্শ^-প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। এটি পুরুষ পদ্ধতি বিধায় স্ত্রীকে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয় না। মহিলাদরে জন্য একটি ক্লিনিক্যাল ও অস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি হচ্ছে ইনজেকশন। যাদের একটি জীবিত সন্তান আছে তারা ইনজেকশন নিতে পারবে। মাসিক শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকে ৭ দিনের মধ্যে এবং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে ৬ সপ্তাহ পর আর বুকের দুধ না খাওয়ালে ৪ সপ্তাহ পর ইনজেকশন নেয়া যায়। প্রতিদিন পদ্ধতি ব্যবহারের ঝামেলা নেই। তবে কেবলমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী দ্বারা সময়সূচি অনুযায়ী নিতে হবে। যারা নব-দম্পতি সন্তান দেরিতে নিতে চান তারা দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি ইমপ্লান্ট নিতে পারেন। মহিলাদের জন্য অস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি হচ্ছে ইমপ্লান্ট যা একটি বা দুটি নরম চিকন ক্যাপসুল (দিয়াশলাই-এর কাঠির চেয়ে ছোট) মহিলাদের হাতের কনুইয়ের উপরে ভিতরের দিকে চামড়ার নিচে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। যে কোন সক্ষম দম্পতি এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। মাসিকের প্রথম ৫-৭ দিনের মধ্যে ইমপ্লান্ট নিতে হয়, শুধুমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তারের কাছে ইমপ্লান্ট নেয়া যায়। এই পদ্ধতিটি ৩/৫ বছরের জন্য কার্যকর, এতে কোনো পার্শ^-প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। এটি প্রসব পরবর্তী পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন হলে এটি দ্রুত খুলে সন্তান ধারণ করা যায়। তবে এটি ব্যবহারের ফলে কারো কারো ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। মাসিক বন্ধ হলে গর্ভসঞ্চার হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এই বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনার উপ-পরিচালক ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন ইমপ্লান্ট পদ্ধতিটা অনেক ভালো এবং ইমপ্লান্ট পদ্ধতিটাই এখন বেশি ব্যবহার করছেন। এই পদ্ধতিটা আগে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স বা উপজেলা সদর দপ্তর ছাড়া দেওয়া হতো না। এখন যেহেতু মানুষ এটা ব্যবহার করছে তাই মানুষের কাছে সহজলভ্য করার জন্য প্রতিটি উপজেলার কমপক্ষে ২টি করে ইউনিয়নে প্রতিমাসে একবার করে ক্যাম্পেইন করা হয় এবং এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যেমে মায়েদের অর্থাৎ যারা গ্রহণ করতে চান বা যারা গ্রহণ করার উপযুক্ত তাদেরকে এই সেবাটা দেয়া হয়। ইমপ্লান্ট পদ্ধতিটা নব-দম্পতিদেরকে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে যেহেতু বাল্যবিয়ের হার বেশি তাই আমরা এই দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতিগুলো দিয়ে থাকি। বেলেপুকুর এলাকার তোহমিনা বলেন তিনি তাঁর স্বামীর সাথে কথা বলে ৫ বছর মেয়াদী ইমপ্লান্ট পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। তার একটি সন্তান আছে। তিনি এখন আর সন্তান নিবেন না বলে এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছেন। তিনি আরো বলেন যে, এই পদ্ধতিটি অনেক ভালো এতে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমনুরা স্টেশন বাজার এলাকার নব-বিবাহিত সুফিয়া, ১ মাস হয়েছে বিয়ে করা। সুফিয়া বলেন তারা দীর্ঘমেয়াদী কোন পদ্ধতি ব্যবহার করেন না, তারা অস্থায়ী জন্মনিরোধক পদ্ধতি কনডম ব্যবহার করেন। সুফিয়া আরো বলেন পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি সম্পর্কে তেমনটা জানেন না। তার সাথে আরেকজন তাসলিমা খাতুন তারও বিয়ে হয়েছে ৬ মাস হল তবে এখন তারা সন্তান নিবেন না আর এ জন্য কোনো পদ্ধতিও গ্রহণ করেন নি। জেলা পরিবার পরিকল্পনার উপ-পরিচালক ডা. মো. আব্দুস সালাম আরো বলেন কোনো মহিলা যদি আইইউডি গ্রহণ করেন তাহলে তিনি দশ বছর পর্যন্ত সন্তান না নিয়ে থাকতে পারবেন এবং সে সম্পূর্ণ ঝুঁকি ছাড়াই যৌন জীবনযাপন করবেন কিন্তু তার গর্ভধারণ হবে না। তাই অবশ্যই বিয়ের পরপরই যে কোন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার বলে জানান পরিবার পরিকল্পনার উপ-পরিচালক। তিনি জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জে আগের থেকে অনেক বেশি দম্পতি সচেতন হচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে পদ্ধতি গ্রহণে এগিয়ে আসছেন। তিনি আরো বলেন, মহিলাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, অস্থায়ী ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি হচ্ছে আইইউডি। এটি মহিলাদের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে কপার-টি ৩৮০ অ ব্যবহার করা হয়। আইইউডি একটানা দশ বছরের জন্য কার্যকর। স্বাভাবিক প্রসবের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে অথবা সিজারিয়ান অপারেশনের সময় আইইউডি গ্রহণ করা যায়। আইইউডি ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা মনে হলে যেকোন সময়ে ক্লিনিকে/স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে খুলে নেয়া যায়। তবে আইইউডি প্রয়োগের পর কখনো কখনো কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথম কয়েক মাস তলপেটে ব্যথা হতে পারে, মাসিকের পর নিয়মিত সুতা পরীক্ষা করতে ও এটি খোলা, ফলো-আপ এর জন্য ক্লিনিকে যেতে হবে। পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সেবা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্যাটেলাইট ক্লিনিকে এ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনার উপপরিচালক ও সূর্যের হাসি ক্লিনিকের ক্লিনিক ম্যানেজার শামিমা আক্তার বলেন, তবে কোনো পদ্ধতি গ্রহন করার আগে বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রহীতাদের যখন একটা স্বচ্ছ ধারণা হবে, তখনই তাদের পক্ষে একটি পদ্ধতি বেছে নেয়া সহজ হবে বলে জানান তারা। পরিবার পরিকল্পনা করা নারী পুরুষ উভয়েরই দায়িত্ব। যদিও পদ্ধতিগুলো বেশির ভাগই নারীদের জন্য ব্যবহার্য। তবে একজন পুরুষও তার জন্য যেসব পদ্ধতি প্রযোজ্য সেগুলো ব্যবহার করতে পারে এবং একজন নারীকে পদ্ধতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমর্থন ও সহযোগিতা করতে পারে। তাহলেই একটা সুখী পরিবার গড়ে উঠবে।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী