সড়ক নির্মাণে ঠিকাদার নির্বাচনে সিন্ডিকেট পদ্ধতি প্রথায় পরিণত হয়েছে : দুদক

10

বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণে ঠিকাদার নির্বাচনে ‘সিন্ডিকেট’ পদ্ধতি প্রথায় পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে একথা জানিয়ে বলা হয়, দরপত্রের সুনির্দিষ্ট শর্ত বাস্তবায়ন হয় না, কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী-ঠিকাদারের চাপে ও পরস্পর যোগসাজশে একশ্রেণির প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে থাকে। এছাড়া নির্মাণ কাজ পেতে প্রভাবশালী, পরামর্শক সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ‘উৎকোচ’ দেওয়ার মতো অভিযোগ পাওয়ার কথাও বলেছে দুদক। দুদক সচিব মো. শামসুল আরেফিন স্বাক্ষরিত পাঠানো ওই চিঠিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দুর্নীতি বন্ধে ২১টি সুপারিশও করা হয়। সুপারিশের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতেও বলা হয় এতে। চিঠিতে দুদকের ‘সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম’ এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, নির্মাণ কাজে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, দরপত্রের প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি হয়ে থাকে। টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, নেগোসিয়েশনের নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সাপোর্টিং বা এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, বার বার নির্মাণকাজের ডিজাইন পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কার কাজের নামে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ হয়ে থাকে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা/প্রভাবশালী ব্যক্তি বেনামে বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধালাভ দুর্নীতির উৎস। এছাড়া টোল আদায়যোগ্য সেতুর ইজারা, সড়ক নির্মাণে মাটির কাজেও দুর্নীতি হয়ে থাকে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে প্রকল্প মূল্য এবং সময় বৃদ্ধি করে ‘দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করা’ হয় বলে এতে উল্লেখ রয়েছে। সুপারিশে বলা হয়- সড়ক নির্মাণে দরপত্রে পাথর বা ঝামা ইট অথবা গ্রেড-১ ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না, এ দুর্নীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। সড়ক নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের ইট বা খোয়া ব্যবহার হয়ে থাকে, এ ক্ষেত্রে দায়ী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করলে দুর্নীতি কমবে বলে মনে করে দুদক। এছাড়া সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য বুয়েট, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নির্মাণকাজে বিশেষজ্ঞ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সৎ প্রকৌশলীদের নিয়ে একাধিক মনিটরিং কমিটি গঠন কথা বলা হয় সুপারিশে। বৃষ্টিপাত, বন্যার ক্ষতি থেকে উত্তরণের জন্য কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে দুদক। নির্মাণের কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুণগত মান ঠিক থাকলেও দরপত্র অনুসারে ‘বিটুমিন’ ব্যবহার করা হয় না বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, কম বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে ক্রমাগতভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুসারে মহাসড়কে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক, তারপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার হচ্ছে। ৬০-৭০ গ্রেড মানের বিটুমিন ব্যবহারের নিশ্চিত করতে হবে। অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে সরাসরি দায়িত্বে না রেখে তাদেরকে সুপারভাইজিং ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব রাখতে বলেছে দুদক। সড়ক নির্মাণে মাটির ফেলানোর কাজে দুর্নীতি হয়ে থাকে, এ সসব কাজে মন্ত্রণালয় মনিটরিং বাড়ানো এবং প্রয়োজনে দুদকের সহযোগিতা গ্রহণ করতে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা এবং কোনো অজুহাতে প্রকল্পের সময় বাড়ানো বন্ধ করতে বলেছে দুদক। এছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল প্রদানের আগে কাজের পরিমাণগত ও গুণগতমান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মনে করে দুদক।