মৃৎ শিল্পের দৃষ্টি নন্দন কারুকার্যই আনবে কুমার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা

শিরিন জাহান নিঝুম : বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সে ঐতিহ্যের রূপকার হলেন মৃৎশিল্পী বা কুমার শ্রেণির পেশাজীবীরা। কুমাররা মাটি দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করেন। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলার মানুষ মাটির তৈরী বিভিন্ন সামাগ্রী সংসারের নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার করে আসছে। তবে ধাতব, ম্যালামাইন ও প্লাস্টিকের তৈজসপত্রের সহজলভ্যতা অনেকটায় হুমকিতে ফেলেছে কুমার পরিবার গুলোকে, চাহিদা কমে যাওয়ায় কমেছে তাদের আয়, অভাব অনটনে অনেকেই ধরে রেখেছেন বাপ দাদার এ পেশা।
তবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও একটু প্রশিক্ষণ পেলে এ কুমার পরিবারে ফিরতে পারে সুদিন। মাটির কাজের শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য ও সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনাই পারে ফেরাতে সে সুদিন। শুধু দরকার একটু খানি উদ্যোগ।
কদিন আগে গিয়েছিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার নামো রাজারামপুর কুমার পাড়ায়। কুমোরদের বাস ছিল তাই নাম হয়ে গেছে কুমোর পাড়া। আগে এখানে অনেকই মাটির হাঁড়িপাতিলসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরী করেই সংসার চালাতেন। এখনো অনেকেই ধরে রেখেছেন বাপদাদার সে পেশা, তবে এখন কাজ অনেকটায় কম।
কুমার পাড়ার প্রফুল্ল পালের বাড়িতে যেতেই দেখা গেল, রোদে শুকানোর জন্য সাজিয়ে রাখা সারি সারি মাটির সরা (দই রাখার জন্য ব্যবহৃত মাটির পাত্র)। বাড়ির উঠানে আপন মনে নিপুন হাতে সরা তৈরীর কাজ করে যাচ্ছিলেন প্রফুল্ল পালের স্ত্রী দিপালী পাল। কথা হয় তার সাথে, জানালেন ছোট থেকেই তিনি মাটির বিভিন্ন হাঁড়ি পাতিল তৈরীর কাজ শিখেছেন বাবার কাছে। তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এখন সংসারের আয় বাড়াতে তিনিসহ পরিবারের সবাই মাটির কাজ করেন।
কথায় কথায় জানালেন তার পাঁচ মেয়ে এবং এক ছেলে সকলেই পড়াশুনা করে। মাটির তৈরি এসব জিনিস বিক্রি করে যে আয় তা দিয়েই চলে সংসার ও ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া। এক মেয়ে নার্সিংয়ে পড়ালেখা করছে।
কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বলছিলেন দিপালী, আগে পাল বংশের সবার যে কদর ছিল তা দিনে দিনে ফিকে হয়ে গেছে। তবে প্রশ্ন করেছিলাম, হাঁড়ি পাতিলের চাহিদা কমলেও মাটির বিভিন্ন শৈল্পিক জিনিসের কদর কিন্তু কমেনি, ঢাকাসহ সারা দেশেই এর চাহিদা রয়েছে, এমনকি বিদেশেও এর কদর কম নয়। আপনারাও তো সেসব বানাতে পারেন, প্রশ্ন শুনে খানিকক্ষণ নিরব থাকার পর জানালেন, হ্যাঁ টিভিতে দেখি, একটু শিখিয়ে, দেখিয়ে দিলে বানাতে পারব না কেনো। কিন্তু কে কিনবে, কার কাছে বিক্রি করব এসব তো আমরা বুঝি না। আমাদের পক্ষে সেই সব বড় বড় শহরে জিনিস পাঠানো সম্ভব না। তাই আয় কম হলেও একসাথে বিক্রি করার সুযোগ পাইনা বলেই কাতারি তৈরী করি।
দিপালী পালের বড় মেয়ে সুস্মিতা পাল বলেন মাটির তৈরি তৈজসপত্রের প্রচলন কমে যাওয়ায় পরিবারের স্বচ্ছলতা কমেছে, তবে তিনিও মনে করেন সরকারি সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে তাদের মৃৎশিল্পের সুদিন।
বাড়ির কর্তা প্রফুল্ল পাল জানান, বাপ দাদার পেশা তাই ছাড়তে পারি না, দিনে দিনে আয় কমছে। সরকার এ শিল্পকে বাঁচাতে একটু সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কুমার পরিবার গুলোর পাশে দাঁড়াবে-এমনটাই প্রত্যাশা প্রফুল্ল কুমার পালের।