পাগলা নদী খননে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ

39

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিতে পাগলা নদী খননে ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ডিপিপি প্রস্তুতও করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কার্যালয়ে প্রেরণ করা হবে।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের নামোচাকপাড়া মৌজার সোনামসজিদ এলাকা দিয়ে পাগলা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর এলাকায় মহানন্দা নদীর সাথে মিলিত হয়। ৪১ কি.মি. দৈর্ঘ পাগলা নদীটি এককালে খর¯্রােতা নদী নামে পরিচিত ছিল। এই নদীটি ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধারক ও বাহক। এই নদীতে বড় বড় নৌকা ও ট্রলারে কৃষিপণ্য পরিবহন করা হতো। দাঁড় টেনে ও পাল উড়িয়ে মাঝিরা মালামাল পরিবহন করত। এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল রামচন্দ্রপুর হাটে বৃটিশদের নীল কুঠি, কানসাটে কুঁজে রাজার রাজবাড়ি। বাণিজ্যিক এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল রামচন্দ্রপুর বাজার, কালিনগর বাজার, রানীহাটি বাজার, শিবগঞ্জ বাজার ও কানসাট বাজার। শিবগঞ্জ ও কানসাটসহ পাগলা নদী এলাকায় উৎপাদিত আমসহ অন্যান্য ফসলাদি বড়-বড় নৌকায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হতো। জনসাধারণের যাতায়াতের আরও একটি মাধ্যম ছিল লঞ্চ। পাগলা নদীর পানিতেই এলাকার সমগ্র বিল-অঞ্চলও ছিল পানিতে ভরপুর এবং সেই পানিতে মৎস চাষ ও জমির চাষাবাদ করা হতো। প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত সুস্বাদু মাছ। পাগলা নদীর তীরে অবস্থিত কানসাট ও তত্তিপুর। যা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত। প্রতিবছর তর্ত্তিপুর ও কানসাট গঙ্গাশ্রম ঘাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের জাহ্নুমণির দশহরা গঙ্গাস্নান উৎসবে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ আসেন। পূণ্য লাভের আশায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গঙ্গাস্নানে অংশ নেন। কিন্তু কালের গহবরে নদীটি আজ পানি শূন্য।
পদ্মা নদীর ভাঙনরোধে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ ও ভারত অংশে বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীটি আজ তার নাব্য হারিয়েছে। পানি প্রবাহ না থাকায় নদীতীরবর্তী লাখ লাখ মানুষ পড়েছে পানি সংকটে, কৃষিকাজসহ অন্যান্যকাজে এসেছে স্থবিরতা। যে যার মতো নদীটি ব্যবহার করছে। ধানসহ অন্যান্য ফসলি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পাগলা নদী। জীববৈচিত্র আজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এমন অবস্থায় ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতির সাবেক সভাপতি সাবেক ছাত্র নেতা ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব উদ্দিনের উদ্যোগে নদীটি খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে আবেদন জানানো হলে মহানন্দার মিলনস্থল হতে কানসাট পর্যন্ত ২১ কি.মি. নদী পুন:খননের জন্য ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ শাহিদুল আলম বলেন-পাগলা নদী সংলগ্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে জীব-বৈচিত্রের উন্নয়ন, ভূ-গর্ভস্থ পানি পূনর্ভরণের মাধ্যেমে পানির স্তর বৃদ্ধি,কৃষি ও মৎস্য চাষের উন্নয়ন, সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, নদীর মূল প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন রোধ করে নদীর উভয় তীর সুদৃঢ় করার লক্ষে প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রামচন্দ্রপুর বাজার, কালিনগর বাজার,রানীহাটি বাজার, শিবগঞ্জ বাজার ও কানসাট বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকায় নদীর নাব্যতা বৃদ্ধিসহ নদী এলাকার জনসাধারণের কৃষি, মৎস ও আম উৎপাদন অধিক পরিমানে বৃদ্ধি পাবে ও আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা আরও বলেন-প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে ফলে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার ২০৫ মে.টন অতিরিক্ত ফসল উৎপন্ন হবে এবং প্রায় ২১০ মে.টন অতিরিক্ত মাছ উৎপন্ন হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে কৃষিভিত্তিক নানারকম ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে এলাকার জনগণের অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাবে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার কাজে অবদান রাখবে।