দেশের বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে

দেশের বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে। অথচ গুণগত পাঠদানে শিক্ষকের প্রশিক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদিও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) সর্বশেষ বিদ্যালয় শুমারির তথ্যানুযায়ী ৩০ শতাংশের বেশি অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে চলছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। বিগত ২০১৭ সালে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় সর্বমোট শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫। তার মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৮৮ জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৭১ হাজার ৫৯৭ শিক্ষক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিগত ১৫ বছরের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র ও উন্নয়ন পরিসংখ্যান ইউনেস্কো এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার মাত্র ৫৮ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী দেশ নেপালে ওই হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ৮২ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৭৮ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েই পাঠদান করেন। আর মিয়ানমারে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষকই প্রশিক্ষিত।
সূত্র জানায়, শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের অভাবে প্রাথমিক সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন : অ্যানুয়াল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে কয়েক বছর ধরেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের হার ছিল ২৩ শতাংশ আর গণিত বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৫ সালে সমাপনী পরীক্ষায় পাস করা অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই বাংলা ও গণিত বিষয়ে দুর্বলতা ছিল। ২০১৩ সালের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিত বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের হার ছিল ২৫ শতাংশ। আর ২০১১ সালে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের হার ছিল ২৫ শতাংশ ও ইংরেজিতে ৩৩ শতাংশ। অথচ শ্রেণীকক্ষে পরিকল্পিত পাঠদানের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্যই রয়েছে শিক্ষক সংস্করণ, সহায়িকা ও নির্দেশিকা। এর প্রধান লক্ষ্য শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রম সহজীকরণ ও শিক্ষার্থীদের কাক্সিক্ষত শিখনফল অর্জন। পাঠদানের ক্ষেত্রে ওই নির্দেশিকা অনুসরণে শিক্ষকদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনাও দেয়া আছে। যদিও সরকার পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের ৬৪ শতাংশই পাঠদানের ক্ষেত্রে ওই নির্দেশিকা অনুসরণ করতে পারছেন না।
সূত্র আরো জানায়, প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ পাঠদানে সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প নেই। শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা অনেক দূর এগিয়েছে। তবে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য যে অবকাঠামো ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক দরকার, তা নেই। প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠদান সহজবোধ্য করা যাচ্ছে না। তাছাড়া প্রশিক্ষণের অভাে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন শিক্ষকরাও। কারণ প্রশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের পাঠদানে অনেক তফাত রয়েছে। প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক শিক্ষকের পাঠদান শিশুদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, প্রতি বছরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। নিয়োগের বছরই ওসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে ২/৩ বছর লেগে যায়। তাই প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার কম। ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ইনস্ট্রাক্টরের সংখ্যা বাড়ানো গেলে নিয়োগের পরপরই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হবে।