প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে জনসচেতনতা জরুরি

শাহরিয়ার হোসেন শিমুল

প্রজনন স্বাস্থ্যের ধারণা শুধুমাত্র মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রজনন স্বাস্থ্যের পরিচর্যা যে কোন বয়সের নারী ও পুরুষের জন্য প্রযোজ্য। প্রজনন স্বাস্থ্য যতœ গর্ভবতী মায়েদের চাহিদা পূরণ করলেও যারা গর্ভধারণ করতে চান বা চান না তারাও এর আওতাভুক্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রজনন স্বাস্থ্যের সংজ্ঞাকে এভাবে উপস্থাপন করেছে ‘প্রজনন স্বাস্থ্য শুধুমাত্র প্রজননতন্ত্রের কার্য এবং প্রজনন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত রোগ বা অসুস্থতার অনুপস্থিতিকেই বোঝায় না, এটা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক কল্যাণকর এক পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পাদনের একটি অবস্থাকে বোঝায়’। ১৯৯৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়হভবৎবহপব ড়হ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওঈচউ এর ঘোষণা অনুসারে প্রজনন স্বাস্থ্যের আওতাভূক্ত কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। জনগণের সন্তোষজক ও নিরাপদ যৌনজীবন এবং যৌনস্বাস্থ্য রক্ষা প্রয়োজন এবং নারী ও পুরুষের সমান অধিকার। প্রজনন স্বাস্থ্যের মধ্যে যৌন স্বাস্থ্য অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা এবং কখন, কতবার এই ক্ষমতা একজন ব্যক্তি প্রয়োগ করবেন তার স্বাধীনতা। সন্তান উৎপাদনের স্বাধীনতা কয়েকটি অধিকারের সাথে সম্পর্কিত পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে নারী ও পুরুষের জেনে নেয়ার অধিকার পছন্দ অনুযায়ী নিরাপদ, কার্যকর, সাধ্যায়াত্ব এবং গ্রহণযোগ্য পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের অধিকার। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মনে করা হয় যে, মহিলাদের বিশেষ যতœ শুধুমাত্র গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তী সময়েই নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু একটি শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রতিটি স্তরেই প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়টি জড়িত। অর্থাৎ, শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের সকল নারী-পুরুষই প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় পড়ে। প্রজনন স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলোকে প্রতিরোধ ও সমাধান করার জন্য কিছু পদ্ধতি, কৌশল ও সেবাসমূহের সমাহার যা প্রজনন স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য সহায়ক’। এই সেবার আওতায় যৌন স্বাস্থ্যও অন্তর্ভূক্ত। যার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র প্রজনন এবং যৌনবাহিত রোগসমূহের পরামর্শ দান এবং সেবাই নয়, মানবজীবন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নয়নও। প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা শুরু হয়, সাধারণত জন্মের পরপরই, শিশু বয়সেও বিশেষ যতœ নিতে হয়, এই সেবা বয়:সন্ধিকালে বাড়াতে হয়, প্রজননক্ষম বয়সে এই সেবার গুরুত্ব অপরিসীম, পরবর্তী জীবনেও এ সেবার গুরুত্ব অনেক।
সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে কাজ করছে এখন কমিউনিটি রেডিওগুলো। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও, রেডিও মহানন্দা পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে টক শো, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ও সচেতনতা বিষয়ে প্রমো বাজিয়ে থাকে। শুধু যে অনুষ্ঠান তাই নয় মাসে ২ টি করে উঠান বৈঠক করছে। গণমাধ্যম হিসেবে জেলা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ও রেডিওতে পরিবার পরিকল্পনার সুফল সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে চলেছে। মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্যাটেলাইট ক্লিনিকে এ সেবা প্রদান করা হয়।
গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে পরিবার পরিকল্পনার উপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বারঘরিয়ায় উঠান বৈঠকের আয়োজন রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম। উঠান বৈঠকে উপস্থিত রিমা বেগম জানান “আমি আমার প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে উপদেশ নিয়ে তাদের কথা মতো আমি পরিস্কার কাপড় পরিধান করি এবং স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে থাকি। তারপরও যদি সমস্য মনে হয় তাহলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে আয়রন ট্যাবলেট নিই। সেখানে গেলে তারা বিভিন্ন ধরনের উপদেশ দিয়ে থাকেন”।
বারোঘরিয়া ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক পান্ডব কুমার সিংহ জানান আমরা নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিয়ে থাকি বিশেষ করে কিশোরীদের। যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তাদেরকে প্যাড ব্যবহার করতে বলি। তারপরও যদি কোন সমস্যা হয়, তাহলে আমরা তাদেরকে আয়রণ ট্যাবলেট দিয়ে থাকি এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কথা বলি। এছাড়াও যারা মাসিক নিয়মিতকরণ করে তাদেরকে ১৫ দিন স্বামীর কাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ প্রদান করি এবং ১ বছর বাচ্চা না নিতে, এক মাস কোনো ভারী কাজ না করার জন্যও পরামর্শ দেওয়া হয়।
একজন নারীর গর্ভধারণের পর যথাযথ পরিচর্যার উপর নির্ভর করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য। গর্ভবতী মায়ের সঠিক যতেœর ফলে একদিকে যেমন মায়ের মৃত্যু রোধ হয়, অন্যদিকে নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যায়। নারী কিশোর কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করার কাজটি করছে রেডিও মহানন্দা।