এসএসসির উত্তরপত্র দেখায় অবহেলায় শাস্তির মুখোমুখি বিপুলসংখ্যক শিক্ষক

সারাদেশে শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষক। বিগত ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার খাতা দেখায় অবহেলার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওসব শিক্ষকদের কারণ দর্শাও নোটিশ দিতে যাচ্ছে। শিক্ষকদের তরফ থেকে সন্তোষজনক জবাব না মিললে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। খাতা দেখায় ভুলত্রুটি থাকলে এর আগে সংশ্নিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোই শিক্ষকদের সতর্ক করতো বা কারণ দর্শাও নোটিশ দিতো। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এবারই প্রথম খাতা মূল্যায়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সম্প্রতি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে বাংলাদেশ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের (বেদু) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় যেনতেনভাবে খাতা দেখা সর্বমোট ১ হাজার ১০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। তারপরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। কারণ দৈবচয়নের ভিত্তিতে খাতা পরীক্ষা করে দেখা যায়- কিছু কিছু পরীক্ষকের দেখা খাতায় গুরুতর ত্রুটি ছিল। কোনো কোনো শিক্ষক নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তরে কোনো নম্বর না দিয়েই পরবর্তী প্রশ্নে চলে গেছেন। আবার উত্তর মোটামুটি সঠিক হলেও নম্বর অতিরিক্ত কমিয়ে দিয়েছেন। কোনো কোনো শিক্ষক সম্পূর্ণ ভুল উত্তরেও পূর্ণ নম্বর বসিয়ে দিয়েছেন। ওসব ঘটনা প্রমাণ করে, খাতা দেখার ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট শিক্ষকরা মনোযোগী ছিলেন না। তারা সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। শতভাগ ভুল উত্তরে নম্বর দেয়ার ঘটনায় প্রমাণ হয় শিক্ষক নিজে হয়তো খাতা মূল্যায়ন করেননি। অন্য কারো দ্বারা খাতা মূল্যায়ন করানোর কারণেই এমনটি হয়েছে। যা দায়িত্বশীল এই কাজের ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটি ও গাফিলাতি হিসেবেই চিহ্নিত হয়। তারপরই ওসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্র জানায়, প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের উদাসীনতা ও অবহেলার ঘটনা ধরা পড়ছে। তাতে পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। গত বছর থেকে খাতা দেখায় নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রয়োগও শিক্ষকদের অবহেলাকে ঠেকাতে পারেনি। বাধ্য হয়ে সংশ্নিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে সরকার। বিগত ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার খাতা দেখায় অবহেলার কারণে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এর আগে ৭২ জন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। তারা প্রত্যেকের শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত তুলে ত্রুটির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে ভবিষ্যতে আর এমনটি হবে না বলে তারা অঙ্গীকার করেছেন। আর শিক্ষকরা বলছেন-খাতা মূল্যায়ন করতে হয় যথেষ্ট তড়িঘড়ি করে। সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষকদের একই অবস্থা। ৪০০ খাতা মূল্যায়নে সময় পাওয়া যায় মাত্র ১৪ দিন। আর ৩০০ খাতা দেখার জন্য সময় মাত্র ১২ দিন। ওই সময়ের মধ্যে খাতা দেখে তাদের শেষ করতে হয়। গড়ে প্রতিদিন তাদের খাতা দেখতে হয় ২৯টি করে। একদিনে ২৯টি খাতা দেখা হয়তো তেমন কঠিন কিছু নয়। তবে মনে রাখতে হবে, শিক্ষকরা নিরবচ্ছিন্ন সময় নিয়ে খাতা দেখেন না। সকাল থেকে দুপুর এমনকি বিকেল পর্যস্ত স্কুলে ক্লাস নেন। কোনো কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কোচিং করান। প্রতিষ্ঠানের নানা কাজ এবং এরপর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নানা কাজও তাদের করতে হয়। সূত্র আরো জানায়, কেবল এসএসসি নয়, গতবছর জেএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন না করেই মনগড়া ভিত্তিতে নম্বর দেন ময়মনসিংহের ৩ শিক্ষক। পুনর্নিরীক্ষণে বিষয়টি নজরে আসে বোর্ড কর্তৃপক্ষের। তদন্ত করে এর প্রমাণও পায় বোর্ড। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই তিন পরীক্ষককে বোর্ডের সব কার্যক্রম থেকে বহিস্কার করার পাশাপাশি তাদের বেতনের সরকারি অংশ (এমপিও) স্থগিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তাছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে দিয়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করান রাজশাহী বোর্ডের একজন পরীক্ষক। বিষয়টি পত্রিকায় আসার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় বোর্ড। তাছাড়া আরো নানা ধরনের অনিয়ম, অবহেলার দায়ে বিভিন্ন সময় পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিভিন্ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এদিকে এ প্রসঙ্গে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এ কে এম গোলাম কিবরিয়া তাপাদার জানান, একশ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে গুরুতর অবহেলার প্রমাণ বরাবরই পাওয়া যায়। দু’একজনের বিরুদ্ধে কঠোর সাজামূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে দৃষ্টান্ত তৈরি হতো। তাতে অন্যরা সতর্ক হয়ে যেত।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ জানান, পাবলিক পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়নের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এ কাজে কেউ গাফিলতি করলে শিক্ষার্থীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা কাম্য নয়। আইনের বাইরে কেউ কাজ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় পিছপা হবে না।