চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে মাসকলায়ের চাষ >গাছ বাড়লেও কমেছে ফলন,ক্ষতির মুখে কৃষক

36

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিচিতিতে যে বিষয়গুলো উঠে আসে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে মাস-কলায়ের রুটি (স্থানীয়ভাবে কালাই রুটি বলা হয়)। মাস-কলায়ের আটা দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি এ রুটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ মানুষ সকালের খাবার হিসাবেই খেয়ে থাকেন। বাড়ির সে রুটি এখন বড় বড় হোটেল রেস্টেুরেন্টেও জায়গা করে নিয়েছে। অনেকেরই কলায়ের রুটি খেয়ে তৃপ্ত হলেও মন ভালো নেই মাস কলাই চাষ করা কৃষক পরিবার গুলোর।
সাধারণত কম পরিচর্ষায় এ-ফসলটি ঘরে তোলা যায়, এ কারণে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চরাঞ্চালে মাস কলায়ের চাষ করে আসছেন কৃষকরা। তবে গত কয়েক বছর থেকে যেন লাভের মুখ দেখতে পান নি তারা। কৃষক পরিবার গুলোর সাথে কথা বলে এমন হতাশার কথা উঠে আসে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শাহাজাহানপুর ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক ইউসুফ আলী এবার তিন বিঘা জমিতে মাস-কলায়ের চাষ করেছিলেন। তিন বিঘায় তিনি মোট সাড়ে চার মন মাস-কলাই ঘরে তুলেছেন। তিনি বলেন,‘‘কালাইয়ের গাছ বাড়ছে, দুই আড়াই হাত লম্বা হচ্ছে, কিন্তু আগালের দিকে কয়টা ফল থাকছে মাত্র, এতে করে ফলন বেশি হচ্ছে না’’। কেন এমনটা হচ্ছে? এ প্রশ্নে এ কৃষক বলেন, ধানের জমিতে যে পরিমান সার দেয়া হয়, ধান কাটার পরও জমিতে থাকা সারের গুণাগুণ পরের ফসল কলাইয়ের গাছের বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। কলাইয়ের গাছ ছোট থাকলেই ফল বেশি আসে।
শনিবার সকালে শাহজাহান পুর ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে জড়ো করে রাখা মাস-কলাই মাড়াইয়ের কাজ করছেন অনেকেই। পরিবারের নারী সদস্যরা মাড়াইয়ের পর কলাই পরিস্কারের কাজ করছেন। এ সময় কথা হয় ৬০ বছর বয়সী সুকরাতা বেগমের সাথে। তিনি জানালেন, ‘জমিতো আর পতিত থুতে পারবে না, তাই ব্যাটারা কালাই বুন্যাছিল, গত বছরও ভালো ফলন হয় নি, এবারও বিঘাতে দেড়মন-দুমন কর‌্যা কালাই পাছি, এত কম কালাই হয়্যাছে যে প্যাইঠেরা (শ্রমিকরা) কালাই কাটে না।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চল শাহাজাহানপুর ইউনিয়নে আরেক কৃষক গোলাম মোস্তফা জানান, গত কয়েক বছর আগেও বিঘা প্রতি তাদের ৪-৫ মণ কলাই এর ফলন হতো, কিন্তু এখন তা দেড় থেকে দু মণে নেমে এসেছে। তিনি জানান আমরা নিরুপাই হয়েই কলাই বুনি, রাস্তার ব্যবস্থা একটু ভালো হলে সবজি চাষ করতাম। কিন্তু সে সুযোগও নাই। বাদরুজ্জামান নামে একজন জানান, এক বিঘা জমিতে কলাইয়ের চাষ করতে ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ১ শ টাকা খরচ হয়, আর উৎপাদিত কলাই বিক্রি করে প্রতি মণে ১ হাজার ২ শ টাকা থেকে ১ হাজার ৫ শ টাকা বড়জোর পাওয়া যাচ্ছে, এতে কোন লাভ হচ্ছে না।
জুলফিকার আলী ভুট্টু নামে আরেক কৃষক অভিযোগের সুরেই বলেন, জমিতে কোন ফসল করলে ভালো হবে, মাটি পরীক্ষা করে যদি কৃষি অফিসাররা বলে দেয়, তাহলে আমাদের উপকারে আসে, কিন্তু তারা তো মাঠে আসেই না।
মাস-কলায়ের ফলন কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে চাঁপাইনাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মঞ্জুরুল হুদা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এ বছর ২৬ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে মাস কলায়ের আবাদ হলেও, গত অক্টোবর মাসের ২০ ও ২১ তারিখে প্রায় ১৫ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত হয়, এ বৃষ্টিতে মাস-কলাই গাছের দৈহিক বৃদ্ধি বেশি হয়ে যায়, এতে ফল কমে যায়। প্রাকৃতিক কারণেই এবার ফলন কমে গেছে।
তিনি আরো বলেন, এখানে কৃষকরা স্থানীয় জাতগুলো চাষাবাদ করে। তবে, আমরা বারি মাস-কলাই ২ ও ৩ উন্নত জাত সম্প্রসারণে কাজ করছি। এ জাত গুলোতে ফলন অনেক ভালো পাবেন কৃষকরা।
কৃষকের জমির মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে কখন কোন ফসল, বা কোন জাত লাগানো উচিত, বিষয়গুলো নিয়ে কৃষক পর্যায়ে খুব বেশি সেবা দিতে না পারার কথা খানিকটা স্বীকার করে তিনি বলেন, কৃষকদের বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে আমরা পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করে থাকি, তবে প্রতিটি কৃষকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়না। আমরা আমাদের কৃষি কর্মকর্তাদের নাম্বার বিভিন্ন স্থানে দিয়ে রাখি যাতে, কোন কৃষক তার সমস্যার কথা মোবাইলে আমাদের জানাতে পারেন। আমরা তার সমাধান দেয়ারও চেষ্টা করি।