দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, পঞ্চগড়ে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে চলা তীব্র শৈত্য প্রবাহের মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার তাপমাত্রা দেশের সব রেকর্ড ভেঙে নেমে এসেছে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গতকাল সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তেঁতুলিয়ার ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসই ছিল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি, ডিমলায় ছিল ৩ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩ দশমিক ১, দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল টেকনাফে ২৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রার রেকর্ড আছে। বাংলাদেশে তাপমাত্রা এত কমে যাওয়ার নজির সেখানে আর নেই। তিনি জানান, এর আগে ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটাই ছিল এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। ২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি সৈয়দপুরের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছিল; কিন্তু সম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের কোথাও থার্মোমিটারের পারদ ৩ ডিগ্রির নিচে নামেনি। পৌষের দ্বিতীয়ার্ধে এসে গত ৪ জানুয়ারি থেকে দেশের ছয় বিভাগের ওপর দিয়ে এই শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শুরুতে এর মাত্রা মৃদু (৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থেকে মাঝারি (৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) হলেও শনিবার রাজশাহী ও চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে। তাপমাত্রা ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এলে আবহাওয়াবিদরা একে বলেন তীব্র শৈত্য প্রবাহ। আবহাওয়া অফিস বলছে, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ওপর দিয়ে এখন তীব্র শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আর শ্রীমঙ্গল ও সীতাকু- অঞ্চলসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগ এবং রাজশাহী, রংপুর খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ। আবদুল মান্নান বলেন, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই বলয়ের নিম্ন স্তরে বায়ু প্রবাহ বেশি থাকায় শীতের তীব্রতা এবার বেশি। বাংলাদেশে শীত যে এবার গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি অনুভূত হবে- সে পূর্বাভাস আগেই দিয়েছি আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যে রেকর্ড ছাড়িয়ে নেমে যাবে, তা তারাও আঁচ করতে পারেননি বলে জানান মান্নান। আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমান বলেন, গতকাল সোমবার সারা দেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকবে। এ সপ্তাহের শেষ দিকে রাতের তাপমাত্রা বেড়ে শীতের প্রকোপ কিছুটা কমে আসতে পারে। শীত মৌসুমে প্রতিদিনই মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশা থাকে। সোমবারের আবহাওয়ার বুলেটিনে বলা হয়েছে, দেশের কোথাও কোথাও কুয়াশার দাপট দুপুর পর্যন্ত চলতে পারে। এদিকে টানা পাঁচ দিনের শৈত্য প্রবাহে দেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাড় কাঁপানো শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। আমাদের নীলফামারি, দিনাজপুর, পাবনা ও রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সকালের দিকে ঘর থেকে বের হচ্ছে না মানুষ। বেলা ১১টা পর্যন্ত রাস্তা-ঘাট ফাঁকাই দেখা যাচ্ছে। স্কুল কলেজেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে মহাসড়কে দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ¦ালিয়ে ধীরগতিতে চলছে যানবাহন। শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশু ও বৃদ্ধদের ভিড় বেড়েছে উত্তরের জেলাগুলোর হাসপাতালে। নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতাল ও পাবনা সদর হাসপাতালে দুই শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্ককাইটিস ও কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। এদিকে, গত এক সপ্তাহ ধরে তেঁতুলিয়ায় হিমেল বাতাসের সঙ্গে আবছা আবছা কুয়াশায় চাদরে পথ-ঘাট ছিল ঢাকা। তেঁতুলিয়ার আকাশে দিনে কোথাও সূর্য্যরে মুখ দেখা যায়নি। তীব্র শীতের কারণে নিত্যান্ত প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষ ঘরের বাহিরে বের হয়নি। ঠান্ডার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল থেকে দুপুর গড়ার সংগে সংগে ছুটি দেয়া হয়েছে। অফিস আদালত ও পথ-ঘাট ছিল জনশূন্য। এদিকে তীব্র শীতে মহানন্দার বরফ শীতল পানিতে পাথর শ্রমিকরা নুড়ি পাথর সংগে নামতে পারেনি। শীতের তীব্রতা নিবারণে গ্রামের গরীব দুখী মানুষজনকে খরকুটা জ¦ালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা গেছে। শীতের প্রকৌপ বাড়ার সংগে সংগে পুরাতন মোটা কাপড়ের দোকানে গরীব মানুষের ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এখনো উপজেলার গরীব দুখী মানুষের মাঝে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে তেমন শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়নি। এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস বলেন-সরকারি শীতবস্ত্র যা ছিলো ইতোমধ্যে তা বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে রিজার্ভে কোন শীতবস্ত্র নাই। বাড়তি শীতবস্ত্র চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম (শাহীন) বলেন- আমি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে কিছু গরীব দুখী ছিন্নমুল মানুুষ ও এতিমখানায় বিচ্ছিন্নভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি; তবে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। তবে বাড়তি শীতবস্ত্র চেয়ে জেলাপ্রশাসক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বরাবরে আবেদনপত্র পাঠানো হয়েছে।
কুড়িগ্রামে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা: কুড়িগ্রামে তীব্র শীতের কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারুল হক প্রামাণিক বলেন, গত এক সপ্তাহে তাদের হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজনের হার্টের অসুখ ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। অন্য নয়জন শিশু। তাদের লোবাকোয়েট, নিউমেনিয়া ও জন্মের সময় সমস্যা ছিল। এসব রোগে তারা মারা গেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই মৃত্যুর পেছনে শীতের প্রভাব রয়েছে এটা বলা যেতে পারে। নিহতরা হলেন – আমেনা (৬৫), জাহানারা (৩০), চার দিন বয়সী সাবিহা, দেড় বছরের মিম, এক দিনের নয়নমনি, দুই মাসের জিতিয়া, পাঁচ দিনের মিরাজ, খাদিজার মেয়ে (এক দিন), জাহানারার ছেলে (১৫ দিন), মাজেদার মেয়ে (এক দিন) ও শিউলির ছেলে (পাঁচ দিন)। হাসপাতালের চিকিৎসক শাহিনুর রহমান সরদার শিপন বলেন, শীতজনিত কারণে এ হাসপাতালে এখনও ১৮০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ৪৯ জনই শিশু। শীতের কারণে শিশু, বৃদ্ধ ও নারী রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, হিম ঠা-ায় কাবু হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের জনজীবন। বিশেষত নদীতীরবর্তী দরিদ্ররা কনকনে শীতে বেশি কাহিল হচ্ছে। ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে লোকজন ঘর থেকে বের হতে পারছে না। জেলা আবহাওয়া সহকারী নজরুল ইসলাম জানান, গতকাল সোমবার সকালে রাজারহাট আবহাওয়া অফিসে এ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে শীত মোকাবিলায় এ জেলায় ৫৭ হাজার কম্বল সরবরাহ করা হলেও তা এখনও বিতরণ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আমিনুল বলেন, সরকারের সরবরাহ করা ৫৭ হাজার কম্বল বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।