গুলবাহার

=রেহেনা বীথি=

যত যাই কন আম্মা,বিলেয় মানষের সমতুল্য।
–কী যে তুমি বলো না ভুট্টুর মা,বিড়াল কখনও মানুষের সমতুল্য হয়?
–হবি না কেন আম্মা? বিলেয় কত উপকার করে মানষের।
–কিন্তু এই যে যখন তখন খাবারে মুখ দিচ্ছে। সে খাবার তো আর খেতে পারে না কেউ।–হায় আল্লাহ্,এইডা আফনে কী কলেন আম্মা, খাতি পারবে না কেন?কলাম না বিলেয় মানষের সমতুল্য? এই হলো ভুট্টুর মা। সায়েরা বেগমের কাজে সহযোগীতা করার জন্য সে আছে প্রায় সাড়ে চার বছর থেকেই। ভুট্টু নামে তার একটি পুত্র সন্তান আছে, বছর পাঁচেক বয়স। সারাবছর যার নাক দিয়ে সর্দি ঝরছে তো ঝরছেই। গায়ে ময়লা, ছেঁড়া জামা। নিম্নাঙ্গ তার অনাবৃতই থাকে। শীতকালে কখনও সখনও পরনে প্যান্টের দেখা মেলে। তবে না থাকলেও খুব একটা সমস্যা নেই। গায়ের জামাটা তার সাইজের চেয়ে বড় হওয়ায়, সেটা দিয়েই অনেকখানি লজ্জ¦া নিবারণের কাজটি চলে যায়। সায়েরা বেগম ঈদে তো বটেই, এমনিতেও অনেক জামাকাপড় কিনে দেন ওদের মা ছেলের জন্য। নিজের নাতি নাতনিদের ছোট হয়ে যাওয়াগুলো তো দেনই। তবুও কেন যে ওই ময়লা, ছেঁড়া কাপড় চোপড়গুলো ওদের এত প্রিয় কে জানে? বহুবার বলা সত্তে¦ও কোনো সংশোধন নেই। অবশ্য সায়েরা বেগমের মুখের সামনে বলে, হ্যাঁ আম্মা, কাইল থাইক্যে আর ময়লা কাপড় পইরে আফনের সামনে আসুম না। কিন্তু কোথায় কী, অবশ্য কাজে কখনও ফাঁকি দেয় না ভুট্টুর মা। প্রতিদিন ভোরবেলাতে ছেলেকে নিয়ে হাজির হয়। শরীর একটু আধটু খারাপ থাকলেও কাজ বাদ দেয় না সে। বলে, কাজে না আলি খাবো কী আম্মা? মরদটা তো নেশা করি হারাদিন মালগাড়ির মদ্দি পড়ি থাহে। আফনের বাড়িত মায়ে ছায়ে হারাদিন থাহি,খাই বইলেই না বাঁচি আছি। আবার যাওনের সম খাওন বাইন্দে দেন আফনে। ভুট্টুর বাপেরও হয়া যায়। আল্লাহ্ আফনের ভালা করুক আম্মা।
আজ কাজ থেকে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেল ভট্টুর মায়ের। শীত আসি আসি করছে। ছোট দিন, ঝুপ করেই বেলা চলে যায়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল প্রায় গড়িয়ে গেল। বাড়ি বলতে তো সেই, অব্যবহƒত রেললাইনের উপর মালগাড়ি, তারমধ্যেই পেতেছে সংসার ওরা। শুধু ভুট্টুর মা-ই নয়,ওদের মতো আরও অনেকেরই সংসার এসব জংধরা মালগাড়ির ভেতর।
–কিছুটা দূর থেকেই প্রতিবেশী শেফালী চেঁচালো, আইজ কাপড়ের টাকাটা নিয়া যাইস ভুট্টুর মা। যে পুরান কাপড়ওলার কাছে বেচসিলাম,সে আইজ টাকা দেছে। আগের মতোই আদ্দেক টাকা পাবি। মনে আছে তো? আর, নতুন কাপড় পালি কইস আমারে। তোর মালকিন যা ভালা ভালা কাপড় চোপড় দেয় তোরে বেঁইচে তো তুই বড়লোক হয়া যাবি। আইচ্ছা-বলে ভুট্টুর মা ওর দখলকৃত মালগাড়িতে ওঠে ছেলেকে নিয়ে। ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। খাবারের গামলাটা নামিয়ে রাখে। নেশাখোরটা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ইচ্ছে করছে, টেনে তুলে লাঠিপেটা করে। প্রায়ই ইচ্ছেটা করলেও কোনোদিনই পারে না ভুট্টুর মা। তার বদলে টেনে তুলে খেতে দেয়। কেমন নিশ্চিন্ত মনে খায় মানুষটা, গোগ্রাসে, ক্ষুধার্ত শেয়ালের মতো লাগে তখন স্বামীকে। অল্প আঁধারে স্বামীর চোখদুটো যেন জ্বলছে চক চক করে। একটু হাসছে কী লোকটা ওর দিকে চেয়ে? হাসছে তো, এ হাসির অর্থ বোঝে ভুট্টুর মা।সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে। ছেঁড়া চটের উপর ছেঁড়া কাঁথা গায়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ভুট্টু। ওর মায়েরও ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ। এমন সময় ডাক, গুলবাহার-বড় নরম আর আদুরে সে ডাক। মাঝে মাঝে এমন নরম সুরে ডাকে স্বামী। তখন মনে পড়ে ওর একটা নামও আছে। ভুট্টুর মা ডাকের আড়ালে যে নাম চাপা পড়ে গেছে কবেই এক মুহূর্ত মনের গভীরে কী নদীর ঢেউয়ের ছলাৎ ছল্ শব্দ শুনতে পেলো, ভুট্টুর মাওর মনটা কী আকুলি বিকুলি করে উঠলো না ময়লা ছেঁড়া কাঁথার গন্ধ ছাপিয়ে বুনো ফুলের মাতাল করা গন্ধ নাকে ওর ঝাপটা দিলো না কী দিলো। কিন্তু পর মুহূর্তে মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে গেলো। এমন ডাকের অর্থ মেটাতে হয়েছে ওকে অনেকবার। তিল তিল করে জমানো বেতন আর কাপড় বিক্রির টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কয়েকবার। মাঝে মধ্যে চুরি করেও নিয়ে গিয়ে নেশা করে ওড়ায়। সায়েরা বেগমকে বলায় সে একটা একাউন্ট খুলে দিয়েছে ব্যাংকে। নিজের কাছে আর টাকা রাখে না ভুট্টুর মা। ছেলেকে মানুষ করতে হবে না? ওর জন্যে আর নিজের বুড়ো বয়সের কথা ভেবেই তো টাকাগুলো জমাচ্ছে ও। বয়স হলে তো আর শরীর চলবে না,কাজ করেও খেতে পারবে না। ছেলেটাকেও লেখাপড়া শেখাতে চায় ও। বাপের মতো চোর আর নেশাখোর নয়। গুলবাহার-আবার স্বামীর নরম ডাক কানে এলো ওর। ও, বুঝেছে, শেফালীর দেয়া টাকার গন্ধ পৌঁছে গেছে বদমাইশটার নাকে, ঝাঁঝালো গলায় বললো ভুট্টুর মা,কী চাও?
–কয়টা ট্যাহা দিবার পারবা?
–না,পারুম না।আর কুনুদিন দিমু না।
–কী এতবড় কতা? বলে একটা লাঠি নিয়ে মারতে আসে। ধরে ফেলে ভুট্টুর মা। নেশাখোর দুর্বল হাত থেকে কেড়ে নেয় লাঠি এক ঝটকায়। ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেয় মালগাড়ি থেকে। যাও এহান থাইক্কে,আর কুনুদিন আসবা না। অকথ্য গালাগাল দিতে দিতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় গুলবাহারের স্বামী। জানে ভুট্টুর মা, ফিরে আসবে কালই। কুপির আলোয় ছেলের মুখটা আবছা দেখতে পায় ভুট্টুর মা। একটা চুমু দেয় ছেলের কপালে। নিজের মনেই বলে,কাইল বিহানে আমরা নতুন কাপড় পরি কামে যামু রে বাপ, ওই মাটির হাঁড়িডা দেখতিছিস, ওর মইদ্দে আমার, তোর আর তোর বাপের নতুন একখান করি কাপড় আছে। বেচি নাই এগুলা। দেহিস নতুন কাপড় পরি তোরে কেমন সোন্দর লাগে, এক্কেরে রাজপুত্তুরের মতো।

SHARE