লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে শারীরিক প্রতিবন্ধী তিন বোন

চেষ্টায় পারে মানুষকে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে। এমন অনেক উদাহরণ আছে আমাদের সমাজে। আর তাই আজ নারী ও পুরুষ সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন কি বর্তমানে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রতিবন্ধীরাও সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন।
প্রবাসী প্রতিদিন নামে একটি অনলাইন থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর হতে ২৫ নভেম্বর চীনের ইয়াংজু সিটিতে অনুষ্ঠিত যুব প্রতিবন্ধীদের আইসিটি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কাজী নুসরাত সিনতিয়া নামে শারীরিক প্রতিবন্ধী সুপার চ্যালেঞ্জার বেস্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর হাটের দরিদ্র পরিবারের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শাহনাজ খাতুন ও তার ভাই আব্দুল ওয়াহেদ অনেক কষ্ট করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোহিতায় লোখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। এ-বছর তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। দৃঢ়মনবল তাদের উচ্চ শিক্ষায় নিয়ে গেছে।
তাদের মতই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের ধীনগর গ্রামের তুকাজ্জেবানসহ ৩ বোনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তুকাজ্জেবান শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও নিজের প্রচেষ্টায় লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদেরকে তাচ্ছিল্যভাবে কথাবার্তা বলে অনেকেই। তারা তিন বোনই বেঁটে, হাত পা গুলো ছোট। রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় অনেকেই হাসাহাসি করে। কিন্তু কোন তাচ্ছিল্য বা অন্যের বিদ্রুপের হাসাহাসিতে মনোবল হারায়নি তুকাজ্জেবানেরা। তুকাজ্জেবান তার প্রবল প্রচেষ্টার ফলে আজ দশম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। কিন্তু সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি মুদিখানার দোকানও দিয়েছে তুকাজ্জেবান। লেখাপড়ার পাশাপাশি দোকানদারি করে যে আয় হয় তা দরিদ্র বাবা-মার সংসারে তুলে দেয়।
তুকাজ্জেবানের বাবা রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করেন তা ৯ সদস্যের অভাবের সংসারে কিছুই নয়। ফলে সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়া করানো খুব কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কখনো খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে দিন কাটাতে হয় তাদের। এত কষ্টের মধ্যেও তুকাজ্জেবান ও তার আরো দুই প্রতিবন্ধী বোন লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের স্বপ্ন লেখাপড়া করে তারা ভালো একটা চাকরি করবে।
তুকাজ্জেবান বলেন- আমরা তিন বোন প্রতিবন্ধী, তাই অনেকেই আমাদের অবহেলা করে। বিয়ে বাড়িতে গেলে খেতে দিতে চায় না। কিন্তু আমি লেখাপড়া করতে চাই এবং প্রতিবন্ধী হয়েও চাকরি করে দেখাতে চাই। আমার বাবা মায়ের সংসারে যে কষ্ট রয়েছে তা আমি দূর করতে চাই।
তুকাজ্জেবানের আরেক বোন কারিমা। সেও প্রতিবন্ধী। সে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে । তার ইচ্ছা সেও লেখাপড়া করে ভালো একটা চাকরি করার। কারিমা বলে-লেখাপড়া করতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি লেখাপড়া করে পুলিশ হতে চাই।
তুকাজ্জেবানের তানজিলা নামের বোনটিও প্রতিবন্ধী। সে ১ম শেণীতে লেখাপড়া করে। সেও চায় লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে চাকরি করতে।
প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদের খাওয়া-দাওয়া, লেখাপড়া ও চলাফেরা করতে সমস্যা হয়। তুকাজ্জেবানের এক ভাই ও এক বোনের বিয়ে হয়ে গেলে তারা আলাদা থাকে। অভাবের সংসারে কষ্ট থাকলেও তুকাজ্জেবানের মা সবসময় তাদের লেখাপড়ায় সাহায্য করেন। তুকাজ্জেবানের মা আমেনা বেগম বলেন–তুকাজ্জেবানের বাবা রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করে তা দিয়ে সংসার না চলায় কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে দিন কাটে। এত কষ্টের মধ্যেও তাদের লেখাপড়ার ইচ্ছা অনেক। তারা একা স্কুলে যেতে পারে, তবে বর্ষার দিনে কোলে করে স্কুলে দিয়ে আসি আবার নিয়ে আসি।

তুকাজ্জেবান আগে থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পেত কিন্তু বর্তমানে তার অন্য দুই বোন কারিমা ও তানজিলার প্রতিবন্ধী ভাতা করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ায় কিছুটা হলেও তাদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা হচ্ছে। তুকাজ্জেবানদের প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়ে ঝিলিম ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড প্রতিনিধি আব্দুল ওয়াহাব বলেন- আব্দুস সালামের ( তুকাজ্জেবানের বাবা) পরিবারে অভাব অনেক। তুকাজ্জেবানের প্রতিবন্ধী ভাতা আগে হলেও বর্তমানে কারিমা ও তানজিলার প্রতিবন্ধী ভাতা করে দিয়েছি। এতে তাদের উপকার হয়েছে।
তুকাজ্জেবান, কারিমা ও তানজিলার মত আমাদের সমাজে আরও অনেক প্রতিবন্ধী আছে যারা তাদের প্রচেষ্টার ফলেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নিলুফা ইয়াসমিন
ফেলো, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম