৩ মাসেই ১৮০ কোটি ডলার ঘাটতি

বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বড় ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। অর্থবছরের তিন মাসেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন (১৮০ কোটি) ডলার।এই অঙ্ক গত অর্থবছরের পুরো সময়ের (১২ মাস, জুলাই-জুন) চেয়েও ২২ শতাংশ বেশি। আমদানি বাড়ায় অর্থবছরের বাকি সময়েও ঘাটতির এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত। তবে পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকায় এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখছেন না তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার লেনদেন ভারসাম্যের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর)ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ (১.৭৯ বিলিয়ন) ডলার। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এই তিন মাসে বাংলাদেশের লেনদেন ভারসাম্যে ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। তবে অর্থবছর শেষ হয় ১৪৮ কোটি ডলারের ঘাটতি নিয়ে। চলতি অর্থবছরেও সেই ঘাটতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেন ভারসাম্যে ৩৭০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষ করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে সেই উদ্বৃত্ত ১৪৮ কোটি ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ (২.৮৭ বিলিয়ন) ডলার।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, জ¦ালানি তেল, খাদ্যপণ্য, ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতি), শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়ায় আমদানি খাতে ব্যয় বেড়েছে। সে তুলনায় রপ্তানি আয় খুব একটা বাড়েনি। সে কারণে অর্থবছরের শুরুতেই লেনদেন ভারসাম্যে বড় ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। বেশ কিছু দিন বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেলের দাম কম থাকায় আমদানি খরচ কম হচ্ছিল। কিন্তু বছল খানেক ধরে তেলের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি বদলেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল (প্রায় ১৫৯ লিটার) অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ ডলার। এখন তা ৬০ ডলার ছাঁড়িয়েছে। জ¦ালানি তেল আমদানিতে খরচ বৃদ্ধি ছাড়াও পদ্মা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যস্ত্রপাতির আমদানি। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বাড়ছে। খাদ্যপণ্য (চাল ও গম) আমদানিতেও সাম্প্রতিক সময়ে খরচ বেশ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এই ঘাটতিতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই মন্তব্য করে জায়েদ বখত বলেন, ক্যাপিটাল মেশিনারি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়া মানে দেশে বিনিয়োগ বাড়া, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হওয়া। সেটাই হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন (রিজার্ভ) রয়েছে। তাই এখন আমদানি ব্যয় বাড়ায় তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়,বলেন তিনি। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে জ¦ালানি তেল আমদানি খাতে খরচ বেড়েছে ৭১ শতাংশ। খাদ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ২৫১ শতাংশ। এ ছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেড়েছে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৩৩%
আমদানি ব্যয় বাড়ায় জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি (৩.৬৫ বিলিয়ন) ডলার; যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। এই তিন মাসে ১ হাজার ২১৯ কোটি ৯০ লাখ (১২.২ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। পক্ষান্তরে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ এই সময়ে ৮৫৪ কোটি ৯০ লাখ (৮.৫৪ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ডলার।