ঘুম

কিছুক্ষণ পর পর লেপের নিচ থেকে নাক বের করে শ্বাস নিয়েই আবার মাথা ঢুকিয়ে ফেলছি। দুপুরবেলা হুট করে পুকুর পাড়ে গেলে এমন করে মাথা লুকায় দক্ষিণ পুকুরের কচ্ছপেরা। মাঘের কনকনে ঠান্ডা, দরজা জানলা সব টাইট করে লাগানো কিন্তু এক ভেন্টিলেটর একাই একশ।
ফজরের নামাজ পড়ে বাবা আবার ঘুরিয়ে পড়েছেন কিন্তু বরাবরের মতো গেটও খুলে দিয়েছেন। এমন সময় জব্বারের বাপ বুড়ো ছাড়া কেউ ভিক্ষা করতে আসে না। লোকটার হুঁশটুশ পুরোটাই ঢিলা, যত বলি নয়টার পরে এসো, তত সাতটায় এসে হাজির। আমার রুমের সামনেই সেকেন্ড গেট, না খুলে উপায় নেই। যেন এই দুইমুষ্টি চাল দিয়েই তার গুষ্টি খিলাবে! একবার বেড থেকে নামলে পাগল ছাড়া কেউ লেপের নিচে ঢুকে! এই মাঘে!
আমার পেটের উপর হাত রাখেন, কোমল আঙুল আমার খোলা পেটের উপর এমন ভাবে চলে যেন ভোর বেলা বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া রাতজাগা এক চোর, যে বাড়ি ফিরবে কিন্তু কেউ জানবে না।
আজ আর বললাম না যে কানে কালা নাকি সে! বললাম গরুর মাংস আর রুমালি রুটি আছে, দেই জব্বারের বাপ? মাংস গরম করে দিচ্ছি কিন্তু রুটি ঠান্ডাই খেতে হবে।
আল্লাহ তুমারে সাত পুতর মা করউক্কা গো মাই, সাত রাজার ধন দেউ্ক্কা।
কিতা যে মাতো রে বা। রুজ রুজ এক দুয়া, ভালা লাগে না, আর কিচ্ছু পারো নায় নি?
তুমি কও গো মাই কুন দুয়া চাও?
ভালা জামাই পাইতাম দুয়া করিও।
রুটি মনো অয় বেশি ঠান্ডা? দেখি দেও চাই তুড়া গরম করে দেই।
পরেরদিন লাল চায়ে গোঁফ ভিজিয়ে খেতে খেতে সেই সাত পুত্র আর সাত রাজার ধন!
বড় গেটের বাইরে একটা বেবিটেক্সি দাঁড়ানোর শব্দ পেলাম। জব্বারের বাপ আমার মুখের দিকে তাকাল, আমার মতো সেও জানে সেই বেবিটেক্সি থেকে নামছেন আমার নানা, ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকছেন। ড্রাইভার যখন বুঝতে পারছে উনি আমাদের বাবার শ্বশুর, ভাড়া নিতে চাইবে না, নানাও বরাবরের মতো জোর করে টাকা পকেটে গুঁজে দিয়ে আসবেন। নানার একহাতে একটি টিফিন ক্যারিয়ার, তাতে শোল মাছের পোনা ভোনা। সোনালি সোনালি পোনারা মরে গেছে, রান্না হয়েছে ভাইবোন-সহ। এখন আমরা ভাই-বোনেরা তাদের আয়েস করে খাব গরম গরম ভাতে। নানার অন্যহাতে বাজারের থলে ভর্তি বাড়ির তরিতরকারী আর ফলমূল। দোয়া করে উঠে যাবার কথা জব্বারের বাপের, কিন্তু ব্যাগের ভেতরের জিনিস দ্বিতীয় দফা দোয়ার জন্য তাকে আটকে ফেলে। আমি আট টাকা হাতে দিয়ে বললাম মোড়ের দোকান থেকে এক হালি মুরগির ডিম নিয়ে আসতে। গদাই লস্করি চালে গেলে হবে না, রকেটের গতিতে যাবে আসবে। নানা সর্বোচ্চ বসবেন পঁচিশ মিনিট। পনের মাইল দূর থেকে আসছেন বলে পঁচিশ। না হলে তার হাফ ডজন কন্যার বাড়ি দূরত্ব অনুযায়ী এক থেকে এক ঘণ্টা বরাদ্দ। এই পঁচিশ মিনিটে ডিম চারটি সেদ্ধ করে নানার সামনে রাখতে পারব আমি। আম্মা ঘুম থেকে উঠে কাপড় সামলাতে সামলাতে পিতার সামনে আসতে আসতে একটি ডিম শেষ হয়ে যাবে। আমি দ্বিতীয় ডিমটি খাওয়ানোর জন্য প্রায় পায়ে পড়ে যাচ্ছি নানার।
দাদির আহাজারি ভালো লাগছে না আমার, আমি নানার দিকে ঝুঁকছি, আর এই সময়ে তার রান্নাঘরে ছাগল বাঁধল কে, কাঁসার বউলটি, যে বউলে হাত ধুতেন তিনি, সেই বউল বাল্লায় ফেলল কে! বাল্লায়? আমার চোখ আক্ষরিকই ছানাবড়া হয়ে গেল, কাঁসার বউল, তুচ্ছ তো নয়, না হয় তুচ্ছই হলো, এটা দাদির জিনিস না? আর যার ঘরে তিনখানা পাপোশ পেরিয়েও পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হয়, হুসনার মা আছে শুধু ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘর বারান্দা ঝাড়ু দেয়ার জন্য। তার রান্নাঘরে সত্যিই দেখি এক জোড়া ছাগল বাঁধা! ঘরভর্তি লেদাবেদা, গন্ধে আমি ‘আব্বা ই কিতা’ সব দোষ যেন আব্বার, তারই উচিত তার মায়ের মর্যাদা অমর রাখা।
বললাম, বিবি, ভালা করি ক্লিন করছি গ্লাস, দুধ দেই? নানায় আনছইন!
লাটি ঠুকঠুক করে দাদা হাজির।
অবায় দে গো বইন, তর বিবি আগর লাখান আর মিঠা খাইন না ঘরো গুড় আছে নি? বেয়াইয়ে দেখি কলা আনছইন, হাইল কলা নি? ভাত অই গেছে নি গো বইন? দুধো ছিটা দি দেও, গুড় কলা দি খাই।
জব্বারের বাপের কা- দেখো, ডিম কিনতে পাঠিয়েছিলাম, সে নিয়ে আসছে মিষ্টি লাউ। মুরগা মুল্লার ক্ষেতের লাউ, কিন্তু আমি এই লাউ দিয়ে করবটা কী?
দরজায় কে খটখট করে! এই ঠান্ডায় বারবার দরজা খুলব! যতবার খুলি শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে কামড়ে ধরে আমার শরীর, কে? ইয়াল্লা নানি?
দরজায় চাবি ঘোরে, ঘোরে, এই চাবি দ্রুত ঘোরাতে গিয়ে প্রায়ই আটকে যায়। আজ আটকে যাক, না খুলুক, ঘরের ভেতর না আসুক কেউ, আমার ঘুম না ভাঙুক।
নানা নানিকে নিয়ে চিড় আছে, ‘সদাই আর হেটি/ লগে লগে আটি’। প্রবাদের বঙ্গানুবাদ হচ্ছে ‘তোমায় তিলেক দ- না দেখিলে বাঁচে না পরাণ’। নানি তার সোনালি সোনালি পা ফেলে এমন ভাবে হাঁটেন যে যেন পেট ভরা ডিম নিয়ে চলা পিঁপড়াটাও না মরে। নানির দুইহাতে চার ভরি করে আট ভরির দুইগাছা বালা, গলায় পাঁচ ভরি মটরদানার হার, কানে চার আনার এক জোড়া কানপাশা। আমি নানির তুলতুলে গা ঘেঁষে বসে বললাম, মনে আছে তো নানি, তুমি মরে গেলে কানপাশা কিন্তু আমার, বালা টালা হারটার অন্যান্যের দিয়ে দিও, কানপাশা আমার নানি হাসেন, যেমন হাসেন তার ধবল স্তনের সোনানি বোঁটায় নানার কোমল স্পর্শে, সেই হাসি আমরা দেখেছিলাম তাদের ঘর পেরিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে আসায়। নানি হাসেন ও যেন সোনার কুচি মুখে মাখিয়ে মাখিয়ে। নানি আমার পেটের উপর হাত রাখেন, কোমল আঙুল আমার খোলা পেটের উপর এমন ভাবে চলে যেন ভোর বেলা বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া রাতজাগা এক চোর, যে বাড়ি ফিরবে কিন্তু কেউ জানবে না।
জব্বারের বাপ উঁকি দিয়ে দেখছে, বাতাসে পর্দা সরে গেছে জানলার। সে কি এক বাড়িতেই দিন কাভার করে দেবে নাকি। কে কে যেন তার দোয়া থেকে বাদ পড়ে গেল আজ। তার উপর কনকনে ঠান্ডা বাতাস, বললাম ঘরের ভেতরে এসে বসো জব্বারের বাপ। বলতে না বলতে নানার পাশে বিছানায় পা তুলে বসে গেল সেও।
বসলে হবে? যেতে হবে না?
দাদির এই এক অভ্যাস। ঘড়ির কাঁটা ধরে তার দিনযাপন। দাদার আবার উল্টো স্বভাব, বললেন ও বইন? মিটা দই আছে নি? বিরইন ভাত দি খাইলাম অনে নানা কপট রাগ দেখান দাদার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে, জব্বারের বাপ হেসে ফেলে, হাসলে তার ঘোলাটে শাদা পাঞ্জাবির উপর কুচি কুচি শিশির চমকায়। নানির চলন ভারি, তবু বলেন আইজ যাই গো বইন।
তখন দরজায় চাবি ঘোরে, ঘোরে, এই চাবি দ্রুত ঘোরাতে গিয়ে প্রায়ই আটকে যায়। আজ আটকে যাক, না খুলুক, ঘরের ভেতর না আসুক কেউ, আমার ঘুম না ভাঙুক, আমি চিৎকার করে কাঁদি ‘দরজা খুলবে না, দরজা খুলো না, ঘুম না ভাঙুক আমার, কেউ ঘুম না ভাঙিও আমার।

শিপা সুলতানা

SHARE